প্রতিনিধির জন্য নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়া জায়েয?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1880
Questioner: Abdul Latif
Question Asked: 21 Jun 2026, 04:25 PM
Reviewed & Published: 21 Jun 2026, 04:32 PM
Views: 89
Tokens: 5,522
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

আমার হাসবেন্ড কুয়েতে একটি মন্ত্রণালয়ে জব করেন আলহামদুলিল্লাহ। ওই মন্ত্রণালয়ের একজন অফিসারের সাথে ভালো সম্পর্ক (বারাকাল্লাহ) হওয়ার সুবাদে ওই অফিসার তার নতুন একটি কোম্পানিতে কিছু লোক নিয়োগের জন্য আমার হাসবেন্ডকে দায়িত্ব দেন। মানে ১০টা ভিসা আমার হাসবেন্ডকে দেন। এখন ভিসার কথা বলার সময় তিনি বলেন "আমি জানি তোকে যে দাম বলবো ভিসার তুই সেই দামেই লোক নিয়ে আসবি, তাই তোকে বিশ্বাস করে দায়িত্ব দিয়েছি।" এই কথা বলেন তিনি

কিন্তু এখানে কথা হচ্ছে আমার হাসবেন্ড বাংলাদেশ থেকে ভিসা দিয়ে মানুষ নিতে তার অবশ্যই কিছু খাটাখাটনি হবে। এখন সে তার পারিশ্রমিক হিসেবে ভিসা প্রদানকারীকে কিছু না জানিয়ে যাকে ভিসা দিবে তাকে ভিসার দাম একটু বাড়িয়ে বলতে পারবে কিনা?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ: আপনার স্বামী কুয়েতের একটি মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। সেখানকার একজন অফিসার (যিনি মন্ত্রণালয়ের বাইরে একটি নতুন কোম্পানিও পরিচালনা করেন) আপনার স্বামীকে ১০টি ভিসা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়োগের দায়িত্ব দিয়েছেন। অফিসার স্পষ্টভাবে বলেছেন, "আমি যে দাম বলব, তুমি সেই দামেই লোক নিয়ে আসবে।" কিন্তু আপনার স্বামী ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছু খরচ ও পরিশ্রম করবেন (যোগাযোগ, সময়, শ্রম ইত্যাদি)। প্রশ্ন হলো: আপনার স্বামী কি অফিসারকে না জানিয়ে ভিসা প্রার্থীদের কাছে দাম বাড়িয়ে বলতে পারবেন, এবং বাড়তি টাকা নিজের পারিশ্রমিক হিসেবে রাখতে পারবেন?

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার:

ইসলামী শরীয়তে আমানত, বিশ্বাস ও প্রতারণা (খিয়ানাত)-এর ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। নিম্নোক্ত দিকগুলো বিবেচনা করা জরুরি:

১. অফিসারের সাথে চুক্তি ও শর্ত: যেহেতু অফিসার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "আমি যে দাম বলব, তুমি সেই দামেই লোক নিয়ে আসবে", এটি একটি সুস্পষ্ট শর্ত ও নির্দেশনা। আপনার স্বামী এই শর্ত মেনে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন এই শর্ত ভঙ্গ করে দাম বাড়িয়ে বলা সরাসরি বিশ্বাসভঙ্গের (খিয়ানাত) শামিল।

২. খিয়ানাত (গোপনে আত্মসাৎ) নিষিদ্ধ: আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খিয়ানাত করো না, এবং নিজেদের মধ্যে আমানতের (প্রতারণার) সাথে খিয়ানাত করো না, অথচ তোমরা জানো।" (সূরা আল-আনফাল: ২৭)

হাদীসে এসেছে:

"مَنْ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ" "যে ব্যক্তি কোনো মজদুর (কর্মচারী/প্রতিনিধি) নিয়োগ করে, তাকে তার পারিশ্রমিক জানিয়ে দেবে।" (সুনান বায়হাকী, হাদীস: ১০৫৯৬)

এখানে অফিসার আপনার স্বামীকে প্রতিনিধি (وكيل) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। প্রতিনিধির জন্য মূল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়া জায়েয নয়, যদি না নিয়োগকর্তা অনুমতি দেন।

৩. শ্রম ও পরিশ্রমের মূল্য নেওয়ার সুযোগ: আপনার স্বামী যে খাটাখাটনি করবেন (ফোন, সময়, শ্রম, ব্যবস্থাপনা), সেটির জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয, তবে তা অবশ্যই অফিসারের জানা ও সম্মতি সাপেক্ষে হতে হবে। অর্থাৎ, আপনার স্বামী অফিসারকে স্পষ্টভাবে বলতে পারেন:

"আমি ভিসা প্রক্রিয়ায় সময় ও শ্রম দিচ্ছি। আপনি যদি আমাকে কিছু কমিশন বা পারিশ্রমিক দেওয়ার অনুমতি দেন, তবেই আমি নিতে পারি। অথবা আপনি নিজেই আমার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিন।"

৪. গোপনে দাম বাড়িয়ে বলা প্রতারণা: ইসলামে প্রতারণা (غش) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي" "যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০২)

ভিসা প্রার্থীদের কাছে অফিসার নির্ধারিত দাম গোপন রেখে বাড়িয়ে বলা সরাসরি প্রতারণা। কারণ:

  • ভিসা প্রার্থী মনে করবেন ওই মূল্যই প্রকৃত দাম, যা আদতে অতিরিক্ত।
  • অফিসারও ধরে নেবেন আপনার স্বামী নির্ধারিত দামেই কাজ করছেন।

৫. সমাধান ও বৈধ পথ: আপনার স্বামী নিম্নোক্ত বৈধ পথ অবলম্বন করতে পারেন:

ক. অফিসারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন:

"আমি আপনার নির্ধারিত দামে লোক নিয়ে আসতে পারি, তবে আমার কিছু সময় ও শ্রম লাগবে। আপনি কি আমাকে এর জন্য কিছু পারিশ্রমিক বা কমিশন দেওয়ার অনুমতি দেবেন? অথবা আপনি আমার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিন।"

  • যদি অফিসার অনুমতি দেন, তাহলে আপনি ভিসা প্রার্থীদের কাছে বাড়তি দাম বলতে পারবেন, তবে শর্ত হলো অফিসার জানবেন যে আপনি বাড়তি নিচ্ছেন এবং তিনি সেটাতে রাজি আছেন।

খ. অফিসারকে প্রস্তাব দিন:

"আমি যদি লোক নিয়ে আসি, তবে জনপ্রতি আমার কিছু খরচ ও শ্রম হয়। আপনি কি জনপ্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ (যেমন ৫০০০ টাকা) আমাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন? তাহলে আমি লোকের কাছ থেকে নির্ধারিত দামই নেব।"

গ. যদি অফিসার অনুমতি না দেন: তাহলে আপনার স্বামী শুধু নিয়মিত দামেই ভিসা দেবেন এবং নিজের শ্রমকে সওয়াবের নিয়তে বা অফিসারের সন্তুষ্টির জন্য বিনামূল্যে করবেন। কোনো অবস্থাতেই গোপনে দাম বাড়িয়ে নেওয়া জায়েয হবে না।

ফতোয়া ও আলেমদের বক্তব্য:

  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: "প্রতিনিধির জন্য নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়া জায়েয নয়, যদি না নিয়োগকারী অনুমতি দেয়। আর যদি প্রতিনিধি নিজের শ্রমের জন্য কিছু নিতে চায়, তবে তাকে নিয়োগকারীর সাথে চুক্তি করতে হবে।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৯)

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ এসেছে: "কোনো কাজের মধ্যস্থতা করলে যদি কোনো নির্দিষ্ট মূল্য ধার্য করা থাকে, তবে তার বেশি নেওয়া আমানতে খিয়ানাত। তবে যদি মালিক অনুমতি দেয়, তাহলে জায়েয।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯৪)

  • রদ্দুল মুহতার (আলাউদ্দিন হাসকাফী ও ইবনে আবেদীন রহ.)-এ বলা হয়েছে: "وكيل এর জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের সময় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মূল্য নির্ধারিত থাকলে, তার বেশি নেওয়া অনুমোদিত নয়। তবে যদি মালিক তাকে পারিশ্রমিক দেওয়ার শর্ত দেয়, তাহলে পৃথকভাবে নিতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৫৩)

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

আপনার স্বামীর জন্য অফিসারকে না জানিয়ে ভিসার দাম বাড়িয়ে নেওয়া জায়েয নয়। এটি খিয়ানাত ও প্রতারণার শামিল। এতে করে ইহকালীন ও পরকালীন উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা হতে পারে। বরং নিম্নোক্ত পথ অবলম্বন করুন:

  1. অফিসারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং তাঁর অনুমতি নিন।
  2. অনুমতি পেলে ভিসা প্রার্থীদের জানিয়ে দিন যে, "এটি নির্ধারিত দাম + আমার সার্ভিস চার্জ।"
  3. অফিসার যদি অনুমতি না দেন, তবে নিজের শ্রমকে আল্লাহর ওয়াস্তে বা ভবিষ্যতে ভালো সম্পর্কের জন্য বিনামূল্যে করুন, আর সওয়াবের আশা রাখুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে রিযিকের হালাল পথ দেখান। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.