টাকা জমানর উদ্দেশ্যে সুদি ব্যাংকে ডিপিএস করার হুকুম।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1855
Questioner: Raihan Ali
Question Asked: 21 Jun 2026, 12:43 AM
Reviewed & Published: 21 Jun 2026, 12:49 AM
Views: 88
Tokens: 6,507
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমি এর আগে বিভিন্ন ফাতওয়াতে পড়েছি যে, টাকা জমানোর নিয়তে বাংলাদেশে প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকে টাকা জমানো বা ডিপিএস খোলা জায়েজ। শর্ত হচ্ছে সোয়াবের আশা ছাড়া সেখানথেকে প্রাপ্ত সুদের টাকা দান করে দিতে হবে।

এখন সমস্যা হচ্ছে যেটা, বিভিন্ন সরকারের আমলে ইসলামি ব্যাংক নিয়ে নানারকমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেকেই সে ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করছে না। আর প্রতি মাসে কষ্ট করে টাকা জমাতে হচ্ছে, অর্থের সিকিউরিটি ছাড়া ব্যাংকে রাখা রিক্স মনে হচ্ছে।
দেশের অনান্য ইসলামি ব্যাংক গুলির অবস্থা আরো খারাপ। অন্যদিকে দেশের আইন শৃঙ্খলা এত ভালো না যে নগদ টাকা বাড়ীতে রাখা যাবে অথবা সঙ্গে বহণ করা যাবে।

এখন এই অবস্থায়, যেখানে কোন উপযুক্ত ইসলামি ব্যাংক পাওয়া যাচ্ছে না সেই কারনে টাকা জমানোর উদ্দেশ্যে অনান্য সুদি ব্যাংকে ডিপিএস খোলা বা একাউন্ট খোলা কি জায়েজ হবে? জাযাকাল্লাহু খাইর।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার বর্তমান অবস্থায় সুদি ব্যাংকে ডিপিএস বা সেভিংস একাউন্ট খোলার বিধান জানতে চেয়েছেন, যখন কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামি ব্যাংক নেই এবং নগদ টাকা ঘরে রাখাও নিরাপদ নয়।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, প্রচলিত সুদি ব্যাংক সম্পূর্ণরূপে সুদের (রিবা) ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সুদি লেনদেন কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্টভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)

সুদের কাজে সহযোগিতা করাও হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষীদ্বয়কে লানত করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)

সুতরাং সুদি ব্যাংকে টাকা জমা করা, এমনকি সেই টাকা দান করার নিয়ত থাকলেও, মূল লেনদেনটি সুদের ভিত্তিতে হওয়ার কারণে তা বৈধ নয়। কেননা ব্যাংক আপনার টাকা ব্যবহার করে সুদি কারবার করে, এবং আপনি নিষ্ক্রিয়ভাবে সেই কাজের অংশীদার হন।

ইসলামি ব্যাংক ও সুদি ব্যাংকের পার্থক্য

ইসলামি ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা ইত্যাদি বৈধ পদ্ধতিতে লেনদেন করে। তাদের দেওয়া লাভ বা উদ্বৃত্ত বৈধ। সেখানে ডিপিএস জমা করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো কোনো প্রকার সুদের আস্থা না রাখা এবং ভুলবশত সুদ এলে তা দান করে দেওয়া। কিন্তু যখন ইসলামি ব্যাংকই অবিশ্বস্ত বা সমস্যাগ্রস্ত, তখন সেখানে টাকা রাখাও অনুচিত। অন্যদিকে সুদি ব্যাংক সম্পূর্ণ অবৈধ প্রতিষ্ঠান, তাই সেখানে কোনো সুদিভিত্তিক হিসাব (সেভিংস, ডিপিএস, এফডিআর) খোলা জায়েজ নয়।

আপনার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ

আপনি বলেছেন:

  • দেশে নির্ভরযোগ্য কোনো ইসলামি ব্যাংক নেই।
  • আইনশৃঙ্খলার কারণে নগদ টাকা ঘরে রাখা বা সঙ্গে বহন করা ঝুঁকিপূর্ণ।
  • আপনি টাকা জমানোর (সঞ্চয়ের) উদ্দেশ্যে ডিপিএস বা সেভিংস একাউন্ট খুলতে চান।

এই অবস্থায় সুদি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খোলার অনুমতি নেই, কারণ এটি সুদের সাথে জড়িত। তবে প্রয়োজনীয়তার (যরূরত) ভিত্তিতে ব্যতিক্রম হতে পারে। হানাফি ফিকহে "যরূরত" বলতে এমন অবস্থা বোঝায় যেখানে কোনো বৈধ উপায় না থাকায় হারাম কাজ করতে বাধ্য হওয়া যায়। কিন্তু এখানে আপনার উদ্দেশ্য টাকা সঞ্চয় করা, যা প্রাণহানির মতো জরুরি অবস্থা নয়। তাই সুদি ব্যাংকে ডিপিএস খোলা যরূরতের আওতায় পড়ে না।

সম্ভাব্য বৈধ বিকল্প

১. কারেন্ট অ্যাকাউন্ট (সুদবিহীন হিসাব) – যদি কোনো প্রচলিত ব্যাংকে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট চালু থাকে যেখানে কোনো সুদ দেওয়া হয় না (শুধু লেনদেনের জন্য), তাহলে সেটি জায়েজ। তবে শর্ত হলো, আপনার টাকা যেন সুদি কারবারে ব্যবহৃত না হয়। বাস্তবে ব্যাংক সব টাকা একসাথে পুল করে, তাই সুদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা কঠিন। তবে প্রয়োজনে কিছু হানাফি ফুকাহা শুধু নিরাপত্তার জন্য কারেন্ট অ্যাকাউন্টকে অনুমতি দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৪:১৮৭)

২. নিরাপদ স্থান বা লকার – ব্যাংকের লকার বা সেফ ডিপোজিট বক্স ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে নগদ না রেখে মূল্যবান জিনিস রাখার ব্যবস্থা থাকে। টাকা জমানোর জন্য ব্যাংকের কোনো সুদি হিসাবের সাথে এটি জড়িত নয়।

৩. সমবায় সমিতি বা শরিয়াহসম্মত সঞ্চয় পরিকল্পনা – কোনো ইসলামি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যদি বৈধ পদ্ধতিতে সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করে (যেমন: কিস্তিতে পণ্য ক্রয়, অংশীদারিত্ব ভিত্তিক বিনিয়োগ), তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

৪. গৃহে নিরাপদ সিন্দুক – বর্তমানে ছোট সিন্দুক বা ডিজিটাল সেফ ব্যবহার করে ঘরেই টাকা নিরাপদ রাখা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা কিছুটা দূর করতে পারে।

ফকিহদের মতামত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) সকলেই সুদের যেকোনো প্রকারের লেনদেন হারাম বলেছেন। ইবনে আবেদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে লেখেন:

لا يجوز إيداع المال في البنك الربوي بقصد الربح، أما للحفظ عند الضرورة فيجوز بقدر ما لا يصل إلى حد الإعانة على الحرام
"সুদি ব্যাংকে লাভের উদ্দেশ্যে টাকা জমা করা জায়েজ নয়। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য জরুরি অবস্থায় ততটুকু জায়েজ যতটুকু হারাম কাজে সহযোগিতা করার পর্যায়ে না পৌঁছে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪:১৮৭)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) স্পষ্টভাবে সুদি ব্যাংকে সেভিংস বা ডিপিএস খোলাকে নাজায়েজ বলেছেন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় সুদি ব্যাংকে ডিপিএস বা সঞ্চয়ী হিসাব খোলা জায়েজ নয়। কারণ এটি সরাসরি সুদের লেনদেনের সাথে জড়িত, যা হারাম। শুধু নিরাপত্তার প্রয়োজনে, যদি কোনো সুদবিহীন কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থাকে, তাহলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সেটিও আদৌ সুদমুক্ত কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

সুপারিশ:

  • যদি সম্ভব হয়, যেকোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামি ব্যাংক বা ইসলামি উইন্ডো খুঁজে বের করুন। বাংলাদেশের কিছু বড় ইসলামি ব্যাংক এখনও কার্যক্রম চালাচ্ছে; তাদের বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করে দেখুন।
  • অন্যথায়, উক্ত টাকা নগদ না রেখে ব্যাংকের লকার ভাড়া করে (যা সুদি লেনদেন নয়) বা পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে গচ্ছিত রাখতে পারেন।
  • সবচেয়ে ভালো হলো, টাকা জমানোর জন্য কোনো বৈধ বিনিয়োগ (যেমন: স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায় অংশীদারিত্ব, জমি ক্রয় ইত্যাদি) বিবেচনা করা।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ পথ নির্দেশ করুন এবং আপনার মাল হালাল ও বরকতময় করুন। আমিন।

জাযাকাল্লাহু খাইর।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.