হারাম কাজে ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে কলম বিক্রি করা কি যাবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
কলম বিক্রি করলে, যারা কিনেন বেশির ভাগই অফিস এবং স্কুলের স্টুডেন্ট, যেখানে ২০% হলেও হারাম লিখনী বা কাজ থাকে। এখন কলম বিক্রি করলে এটা ৯০ ভাগের মতো শিউর যে এটি কোনো হারাম কাজে ব্যবহত হতে পারে, কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক শিরকী জিনিস আছে আর অফিস আদালতেও। এখন কলম বিক্রি করা কি জায়েয হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
কলম এমন একটি বস্তু যা মূলত হালাল কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তা হারাম কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। ইসলামী ফিকহের নীতি অনুযায়ী, যে বস্তুর অধিকাংশ ব্যবহার হালাল, তা বিক্রি করা জায়েয। আর যদি অধিকাংশ ব্যবহারই হারাম হয়, তাহলে তা বিক্রি করা মাকরূহ তাহরীমী বা নিষিদ্ধ হবে।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, কলম ক্রেতাদের অধিকাংশই অফিস বা স্কুলের ছাত্র, যেখানে কিছু হারাম লেখালেখি (যেমন: শিরকী বিষয়ক, মিথ্যা সাক্ষ্য, সুদী লেনদেনের কাগজপত্র ইত্যাদি) থাকে। তবে প্রশ্ন হলো—এই কলমের ব্যবহারের মধ্যে হালাল কাজের পরিমাণ বেশি নাকি হারাম কাজের?
আপনি বলেছেন, "২০% হলেও হারাম লিখনী বা কাজ থাকে।" তাহলে হালাল ব্যবহারের পরিমাণ ৮০%। যেহেতু হালাল ব্যবহারের পরিমাণই বেশি, সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে কলম বিক্রি করা জায়েয। কারণ ফিকহের নীতি হলো:
العبرة للغالب لا للنادر
"বিবেচনা করা হয় অধিকাংশের দিকে, বিরলের দিকে নয়।"
তবে আপনি আরও বলেছেন, "৯০ ভাগের মতো শিউর যে এটি কোনো হারাম কাজে ব্যবহত হতে পারে।" যদি আপনার নিশ্চিত ধারণা হয় যে নির্দিষ্ট কোনো ক্রেতা তা হারাম কাজেই ব্যবহার করবে, তাহলে তার কাছে বিক্রি করা জায়েয হবে না। কারণ আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
إذا علم البائع أن المشتري سيستعمل المبيع في الحرام، فلا يحل له بيعه؛ لأنه إعانة على المعصية.
"যদি বিক্রেতা জানে যে ক্রেতা বস্তুটি হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে তার কাছে তা বিক্রি করা হালাল নয়; কারণ এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার নামান্তর।"
(রদ্দুল মুহতার, ৯/৪৮৭-৪৮৮)
সুতরাং আপনি যদি জানেননি যে ক্রেতা এটি হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তবে আপনার গুনাহ হবে না। আর যদি জানেন, তাহলে শুধু তার কাছে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা উচিত, অথবা তাকে নসীহত করা উচিত।
কিতাবের দলিল:
১. ফতোয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ (৫/৩৪৬):
"বিক্রেতার জন্য এমন বস্তু বিক্রি করা মাকরূহ, যা সাধারণত হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন: মূর্তি বানানোর উপকরণ বা শিরকী অনুষ্ঠানের জিনিস। তবে যে বস্তু হালাল ও হারাম উভয় কাজে ব্যবহৃত হয়, তা বিক্রি করা জায়েয, যদি হারাম ব্যবহার সংখ্যালঘু হয়।"
২. ইমদাদুল ফতোয়া (৪/৩৫১) - হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো বস্তুর অধিকাংশ ব্যবহার হালাল হয়, তবে তা বিক্রি করা জায়েয। আর যদি অধিকাংশ ব্যবহার হারাম হয়, তবে তা বিক্রি করা মাকরূহ।"
৩. মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা মায়িদা, আয়াত ২) তে বলা হয়েছে:
"সৎকাজে ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।"
সুতরাং যদি কোনো বস্তু সরাসরি পাপের সহায়ক হয়, তাহলে তা বিক্রি করা জায়েয নয়। কিন্তু কলম সরাসরি পাপের জন্য নয়, বরং ব্যবহারকারীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত:
- সাধারণভাবে কলম বিক্রি করা জায়েয, কারণ এর অধিকাংশ ব্যবহার হালাল।
- তবে যদি আপনি জানেন যে কোনো নির্দিষ্ট ক্রেতা তা শিরকী বা হারাম লেখালেখিতেই ব্যবহার করবে, তাহলে তার কাছে বিক্রি করা জায়েয হবে না।
- আপনি যদি দোকানে বিক্রেতা হন এবং বিভিন্ন ক্রেতা আসে, তবে তাদের নিয়ত সম্পর্কে অনুমান করে বিচার করার প্রয়োজন নেই। সাধারণত: যা হালাল কাজে ব্যবহার হয়, তা বিক্রি করা হালাল।
পরামর্শ:
আপনি যদি চান বেশি সতর্ক হতে, তবে কলম বিক্রির সময় ক্রেতাদের সাধারণভাবে নসীহত করতে পারেন বা শুধু নির্ভরযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি করতে পারেন, যেখানে হারাম লেখালেখির পরিমাণ কম। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি আবশ্যক নয়।
আল্লাহই বেশি জানেন।