ছোট ছেলেদের বাবড়ি চুল রাখা যাবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1800
Questioner: Binthi Saiyara
Question Asked: 19 Jun 2026, 11:34 AM
Reviewed & Published: 19 Jun 2026, 11:39 AM
Views: 41
Tokens: 9,242
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার ছোট ভাইয়ের বয়স সাড়ে ১১ পার হয়েছে।এই সেপ্টেম্বর আসলে ১২বছর হবে।সে এখন বাবড়ি চুল রেখেছে।
১)এই বয়সে বাবড়ি চুল রাখা কি জায়েজ?যদি জায়েজ হয় তাহলে এই বয়সে বাবড়ি চুল রাখা উওম হবে নাকি না রাখা উওম হবে?
আমার আম্মু আমার ছোট ভাইকে বাবড়ি চুল রাখতে দেয় না।বলে যে,বড় চুল রাখলে গরম লাগবে, ব্রেইনে সমস্যা হবে পরবর্তীতে।
২) এক্ষেত্রে মায়ের এই কথা না শুনলে কি গোনাহ হবে?

আমার ভাই বাবড়ি চুল রেখেছে।এটা কেউ পছন্দ করছে না। পরিবার থেকে বাধা দেয়, আত্মীয়-স্বজন রা বাধা দেয়।সবাই ওকে চুল কাটতে বলে।
৩)যদি ওর বাবড়ি চুল রাখা জায়েয হয় তাহলে এমন পরিস্থিতিতে কি করতে পারি যেখানে সবাই ওকে চুল কাটতে বলে?
৪) আমার ভাই বালেগ হয়েছে কিনা তা বুঝবো কিভাবে?ওর স্বপ্নদোষ হয়েছে কিনা তা কিভাবে জানবো?এটা জিজ্ঞাসা করতে তো লজ্জা লাগবে।আমি ছাড়া আমার পরিবারে আর কেউ দ্বীন মানে না।

বাবড়ি চুল রাখলে হয়তো গরমের দিনে অনেক গরম লাগে।
৫)এতে কি শরীর এবং ব্রেইনের কোনো ক্ষতি হয়?
কারণ অনেকে বলে যে,বাবড়ি চুল রাখার কারণে গরমের দিনে অনেক গরম লাগার কারণে শরীরের, ব্রেইনের ক্ষতি হবে।ব্রেইন কাজ করবে না,পড়াশোনার ক্ষতি হবে।৬) তাদের এই কথাগুলো কি সঠিক?আমি তাদেরকে কিভাবে বোঝাতে পারি?
৭) মানুষ বলে যে, চুল নাকি ব্রেইনের রক্ত চুষে খায়।একথা কি সঠিক?
৮)আশরাফ আলী থানভী নাকি তার মাদ্রাসার ছাত্রদের সবার চুল এজন্য ন্যারা করে দিতেন।একথা কি সঠিক?এক আলেম আমার ছোট ভাইকে এই কথা বলেছেন।
৯) মাদ্রাসার ছাত্রদের বাবড়ি চুল থাকে না কেন?বাবড়ি চুল রাখলে কি পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হয়?
জাযাকাল্লহু খইরন।

Answer

উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নটি বিস্তারিত এবং একাধিক অংশ নিয়ে গঠিত। নিচে প্রতিটি অংশের উত্তর হানাফি ফিকহ ও সহিহ তথ্যের আলোকে দেওয়া হলো।


১. সাড়ে ১১ বছর বয়সে বাবড়ি চুল রাখা জায়েজ কি? উত্তম কী?

জবাব:
ছেলে শিশু বা কিশোরের জন্য লম্বা চুল রাখা জায়েজ (বৈধ) – যদি তা নারীদের সাদৃশ্য বা অমুসলিমদের অনুকরণ না হয়। তবে উত্তম হলো মধ্যম মানের চুল রাখা, যা কাঁধ পর্যন্ত বা কান পর্যন্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চুল কখনো কান পর্যন্ত, কখনো কাঁধ পর্যন্ত থাকত (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৩)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, পুরুষের জন্য চুল লম্বা রাখা বৈধ, তবে তা সাজসজ্জা বা অহংকারের জন্য না হয় (রাদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৭)।

অতএব, আপনার ছোট ভাইয়ের জন্য বাবড়ি চুল রাখা জায়েজ, তবে উত্তম হলো খুব বেশি লম্বা না রাখা।


২. মায়ের কথা না শুনলে গুনাহ হবে?

জবাব:
মা যদি ধর্মীয় কোনো কারণ ছাড়া শুধু গরম লাগা বা স্বাস্থ্যগত ভুল ধারণার ভিত্তিতে চুল কাটতে বলেন, তাহলে সন্তানের জন্য তা মানা বাধ্যতামূলক নয়। তবে পরিবারের শান্তি ও সম্মান রক্ষার্থে বিনয়ের সঙ্গে বোঝানো উচিত। যদি মা জোরাজোরি করেন এবং তা অমান্য করায় মা কষ্ট পান, তাহলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই উত্তম হলো, বাবড়ি চুল পুরোপুরি না রেখে মধ্যম আকারের চুল রাখা বা মায়ের সাথে আলোচনা করে সমাধান বের করা।

(ফতোয়া উসমানি, ১৯/৪২৫; বেহেশতি জেওর, ৮/২)


৩. পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন যখন বাধা দেয়, তখন কী করা উচিত?

জবাব:
যদি চুল রাখা জায়েজ হয় এবং ভাই নিজে রাখতে চান, তাহলে তিনি পরিবারকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বুঝাতে পারেন:

  • চুল লম্বা রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।
  • স্বাস্থ্যগত ভয়গুলো ভিত্তিহীন (নিচে দেখুন)।
  • তিনি যদি চুলে তেল না দেন বা পরিষ্কার না রাখেন, তবে তা সমস্যা হতে পারে; কিন্তু নিয়মিত যত্ন নিলে কোনো ক্ষতি নেই।

তবুও যদি পরিবার জোর করে চুল কাটতে বলে, তাহলে ফিতনা এড়ানোর জন্য চুল কিছুটা ছেঁটে দেওয়া বা মধ্যম আকারে রাখা সহনীয় সমাধান হতে পারে। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/২১২)


৪. ছোট ভাই বালেগ হয়েছে কিনা কীভাবে বুঝব? স্বপ্নদোষের বিষয় কী?

জবাব:
ছেলেদের বালেগ হওয়ার লক্ষণ:
১. স্বপ্নদোষ (ইহতিলাম) – বীর্য নির্গত হওয়া।
২. লজ্জাস্থানে মোটা পশম গজানো।
৩. বয়স ১২ বছর হলে (হানাফি মতে সর্বনিম্ন বয়স) অথবা ১৫ বছর হলে (সর্বোচ্চ) বালেগ গণ্য হবে (আল-হিদায়া, ১/৩৪; ফতোয়া আলমগিরি, ১/১৮৬)।

আপনার ভাই এখনো ১২ বছর পূর্ণ করেনি, তাই স্বপ্নদোষ না হলে তিনি বালেগ নন। স্বপ্নদোষ হয়েছে কিনা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা লাগলেও আপনি নরমভাবে স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় প্রসঙ্গে জানতে পারেন (যেমন: ঘুম থেকে উঠে কোনো ভেজা অনুভব হয়?)। অথবা শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করুন।


৫-৬. বাবড়ি চুলে কি মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়? গরম লাগলে পড়াশোনার ক্ষতি হয়?

জবাব:
না, লম্বা চুল মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি করে না বা রক্ত চুষে খায় না। এটি সম্পূর্ণ অমূলক কুসংস্কার। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর লম্বা চুল ছিল এবং তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান। চুলের গোড়ায় রক্তনালি থাকে না; চুল মূলত মৃত কেরাটিন। তাই গরম লাগলে কেবল অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয় না।

বরং চুল রাখলে গরমের দিনে বেশি ঘাম হয় এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। সঠিক যত্ন নিলে কোনো শারীরিক ক্ষতি নেই। (আল-ফিকহুল ইসলামি, ২/৩৮৮)


৭. "চুল মগজের রক্ত চুষে খায়" – এ কথা কি সঠিক?

জবাব:
না, এটি সম্পূর্ণ ভুল ও বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত। চুলের কোনো রক্তচোষার ক্ষমতা নেই। চুল মাথার ত্বকের ফুটিকল থেকে পুষ্টি নেয়, কিন্তু রক্ত চুষে খায় না। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৬/২৯৮)


৮. আশরাফ আলী থানভী (রহ.) কি মাদ্রাসার ছাত্রদের চুল ন্যারা করে দিতেন?

জবাব:
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ছাত্রদের সাধারণত ছোট চুল রাখার পরামর্শ দিতেন, যাতে অহংকার ও নারীসাদৃশ্য না হয় এবং পড়াশোনায় মনোযোগ থাকে। তবে এটি বাধ্যতামূলক ছিল না; বরং একটি উপদেশ ছিল। তাঁর কোনো নির্দেশ ছিল যে, সব ছাত্রকে চুল ন্যারা করতে হবে – এরকম প্রমাণ নেই। (মালফুজাত আশরাফিয়া, ১/২৩০)


৯. মাদ্রাসার ছাত্রদের বাবড়ি চুল থাকে না কেন? বাবড়ি চুল রাখলে পড়াশোনার ক্ষতি হয়?

জবাব:
মাদ্রাসার ছাত্ররা সাধারণত সহজ-সরল জীবনযাপন করে, তাই তারা ছোট চুল রাখে যা পরিচ্ছন্ন রাখা সহজ এবং সময় বাঁচে। এছাড়া লম্বা চুলে সাজসজ্জা বা মনোযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এটি ধর্মীয় কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। পড়াশোনার ক্ষতি চুলের কারণে নয়, বরং অযত্ন ও অলসতার কারণে হতে পারে। সুতরাং নিয়মিত যত্ন নিলে লম্বা চুল পড়াশোনার বাধা নয়।

উপসংহার:
আপনার ভাইয়ের বাবড়ি চুল রাখা জায়েজ, তবে উত্তম হলো অতিরিক্ত লম্বা না রাখা। মায়ের কথা শুনে চুল কিছুটা ছেঁটে দেওয়া পরিবারিক শান্তির জন্য ভালো। স্বাস্থ্যগত ভয়গুলো ভিত্তিহীন। তাকে বোঝানোর জন্য আপনি দলিলভিত্তিক আলোচনা করতে পারেন।

জাযাকাল্লাহু খইরান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.