তিন তালাক পরবর্তী করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ও সন্তানের খাতিরে একই ঘরে বসবাসের বিধান
প্রশ্নকারী ভাই, আপনি জানিয়েছেন যে আপনার স্ত্রীকে আপনি তিন তালাক দিয়েছেন, ফলে সে আপনার জন্য বৈধ স্ত্রী নেই। তবে আপনাদের তিনটি সন্তান আছে এবং সন্তানদের কারণে তাকে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি নিজেও যেতে রাজি নন। আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, শারীরিক সম্পর্ক না করে শুধু সন্তানদের খাতিরে একই ঘরে বসবাস করা জায়েজ আছে কিনা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
তিন তালাকের পর স্ত্রী সম্পূর্ণরূপে হারাম (বাইন) হয়ে যায়। তখন সে আপনার জন্য নন-মাহরাম (পুরুষের মতো পর্দা করতে হবে) হয়ে যায়। সন্তানের খাতিরে একই ঘরে বসবাস করা জায়েজ নয় যদি না পূর্ণ পর্দা ও পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করা হয় এবং কোনো প্রকার খলওত (একান্ত সাক্ষাৎ) বা গুনাহের সম্ভাবনা না থাকে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে সবচেয়ে উত্তম হলো আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা।
বিস্তারিত আলোচনা:
১. তিন তালাকের পর স্ত্রীর মর্যাদা:
তিন তালাকের কারণে স্ত্রী বাইন (অপরিবর্তনীয়) তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যায়। তার ইদ্দতের (তিন মাসিক) সময় শেষ হলে সে আপনার জন্য একেবারে নন-মাহরাম হয়ে যায়। ইদ্দতের ভিতরেও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে ঘরে রাখা যাবে, তবে ইদ্দত শেষে তাকে সরিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫২২; ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/৪৭৩)
২. একই ঘরে বসবাসের বিধান:
- ইদ্দতের সময় স্ত্রী যদি আপনার ঘরেই থাকে, তবে তাকে সম্পূর্ণ পৃথক কক্ষে রাখতে হবে এবং তার সাথে বেপর্দা দেখা-সাক্ষাৎ হারাম।
- ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে সে আপনার জন্য নন-মাহরাম। তখন তার সাথে একই ঘরে বসবাস করা নাজায়েজ। কারণ এটি গুনাহের কারণ হতে পারে এবং পর্দার বিধান লঙ্ঘন হয়।
- শুধু সন্তানের খাতিরে একই ঘরে বসবাসের অনুমতি শরিয়তে নেই। বরং সন্তানের লালন-পালনের জন্য মাকে বাবা বা অভিভাবকের কাছে পাঠানো বা আলাদা বাসা ভাড়া করে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। (ফতোয়া উসমানি, ২/৪১৮; ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৭১)
৩. ব্যতিক্রম ও শর্ত:
- যদি মহিলার কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকে এবং সন্তানের দেখাশোনা ছাড়া উপায় না থাকে, তবে কিছু স্কলার অস্থায়ীভাবে নিচের শর্তে অনুমতি দিয়েছেন:
- সম্পূর্ণ পৃথক কক্ষ ও পৃথক রান্নার ব্যবস্থা।
- কোনো প্রকার খলওত (একান্তে দেখা) না হওয়া।
- মহিলা সম্পূর্ণ পর্দা (হিজাব) করে চলবেন এবং পুরুষ তার দিকে তাকাবে না।
- এই ব্যবস্থা যত দ্রুত সম্ভব পরিবর্তন করে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা।
- তবে এটিও উত্তম নয়; বরং দ্রুত সমাধান করা ওয়াজিব। (আহসানুল ফতোয়া, ৫/২৮৪; ফতোয়া মাহমুদিয়া, ১১/৫৮৭)
৪. আপনার করণীয়:
- প্রথমে আপনার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বোঝান যে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এখন তিনি আপনার জন্য হারাম এবং একসঙ্গে থাকা গুনাহ।
- তাকে তার অভিভাবকের (মাহরাম) কাছে পাঠানোর চেষ্টা করুন। যদি তার পরিবার না থাকে, তবে নিজে একটি আলাদা বাসা ভাড়া করে তাতে তাকে সন্তানসহ রাখুন অথবা নিজে আলাদা বাসায় চলে যান।
- সন্তানের খাতিরে একই ঘরে থাকা জায়েজ নয় বলেই তার জন্য কোথাও যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। যদি তিনি যেতে রাজি না হন, তাহলে স্থানীয় ইসলামি আলেম বা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করুন।
- শারীরিক সম্পর্ক না করলেও কেবল পর্দা ও পৃথক কক্ষের মাধ্যমেই একই ঘরে বসবাস করা অনুমোদিত নয়, কেননা এতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮; সন্দর্ভ: মাআরিফুল কুরআন, সূরা তালাক, ৬৫:১-এর তাফসির)
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
- সূরা তালাক (৬৫:১): “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) ইদ্দত গণনা করো… এবং তাদের তাদের ঘর থেকে বের করো না এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা স্পষ্ট নির্লজ্জতায় লিপ্ত হয়।” – এটি ইদ্দতকালীন হুকুম। ইদ্দত শেষে তাদেরকে বের করা ওয়াজিব।
- হাদিস: নবীজি ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন কোনো মহিলার সাথে তার মাহরাম ছাড়া একান্তে না বসে।” (মুসলিম, হাদিস: ১৩৪১) – তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী আপনার মাহরাম নয়, তাই একই ঘরে বসবাস একান্তে বসার শামিল হবে।
তথ্যসূত্র (Hanafi Kitab):
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন) – ৪/৫২২ (বাইন তালাকের বিধান)
- ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) – ১/৪৭৩ (ইদ্দত ও বাসস্থান)
- ফতোয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি) – ২/৪১৮ (তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে থাকার বিধান)
- ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি) – ২/২৭১ (সন্তানের খাতিরে থাকার অনুমতি নেই)
- আহসানুল ফতোয়া (মুফতি সাইয়েদ মুহাম্মদ সা’দ) – ৫/২৮৪ (শর্তসাপেক্ষ অনুমতি)
উপসংহার:
আপনার জন্য জায়েজ নয় যে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে একই ঘরে বসবাস করবেন, শুধু সন্তানের খাতিরে। আপনাকে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি তিনি যেতে রাজি না হন, তবে আলেমদের মাধ্যমে মীমাংসা করুন এবং সন্তানের কল্যাণের জন্য মাকেও আলাদা একটি জায়গা দিন। শারীরিক সম্পর্ক না করলেও একই ঘরে থাকা ফিতনার কারণ এবং হারাম।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথ বুঝার তাওফিক দান করুন এবং আপনার সন্তানদের হেফাজত করুন।