সাধারণ গুনাহ করলে ইমান চলে যায় কি না, এবং মনের সন্দেহ দূর করার ইসলামী পদ্ধতি।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
৩।একজন অমুসলিম নিশ্চিত না সে শাতিম কিনা তার কথা মনে বা ভিতরে যে কোনো কারনেই আসুক পাত্তা না দিলে ভালো হবে কি, কারন আমার ওসওয়াসার সমস্যা আছে এ বিষয় নিয়ে মন বা ভিতরে আসে আবার চলে গেলে আবার আসে ?
Answer
উত্তর: ইমান এবং ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনি মূলত দুটি বিষয় জানতে চেয়েছেন:
- যদি কোনো অমুসলিম ব্যক্তি শাতিম (নবী-রাসূল বা আল্লাহর প্রতি অশ্রদ্ধাপূর্ণ কথা বলা) কিনা তা নিশ্চিত না হন, এবং আপনি ইচ্ছা করে গুনাহ না করার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু পরে যদি কোনো সাধারণ গুনাহ করেন, তাহলে কি ইমান চলে যাবে?
- ওয়াসওয়াসার (মানসিক কুযুক্তি/সন্দেহ) সমস্যার কারণে যখনই এ সংক্রান্ত চিন্তা মনে আসে, তখন তা উপেক্ষা করা কি ভালো?
নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর: সাধারণ গুনাহ করলে কি ইমান চলে যায়?
মূলনীতি: ইসলামী শরিয়তে ইমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য খুবই স্পষ্ট। সাধারণ পাপ (ছোট বা বড় গুনাহ) করলে একজন মুসলিমের ইমান চলে যায় না, যতক্ষণ না সে সেই কাজটিকে হালাল মনে করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি কাজ করে। গুনাহ করলে ইমান দুর্বল হয়, কিন্তু তা ধ্বংস করে না।
- কুরআন: আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না; আর এছাড়া (অন্য পাপ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮) – এখানে শিরক ছাড়া অন্য পাপ ক্ষমার আওতায় আসে, অর্থাৎ ইমান থাকে।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, তার জান-মাল আমার থেকে নিরাপদ, আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে।” (বুখারি, মুসলিম) – এটি প্রমাণ করে যে, মৌলিক ইমান থাকলে ব্যক্তি মুসলিমই থাকে, যদিও সে গুনাহ করে।
- হানাফি ফিকহ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, “ঈমানের সাথে গুনাহ কোনো ক্ষতি করে না, যেমন কুফরের সাথে নেকি কোনো উপকার করে না।” (ফিকহুল আকবর) অর্থাৎ, যতক্ষণ কুফরি কাজ না করবেন, ততক্ষণ সাধারণ গুনাহ করলে ঈমান চলে যাবে না।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: আপনি যদি কোনো অমুসলিম ব্যক্তি শাতিম কিনা তা নিশ্চিত না হন, এবং আপনি ইচ্ছা করে বলেন, “আমি ইমান নষ্ট হয় এমন কাজ করব না, কিন্তু প্রয়োজনে অন্য গুনাহ করব” – তাহলে আপনার ইমান চলে যাবে না, কারণ আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি কাজ করেননি। পরে যদি আপনি কোনো সাধারণ গুনাহ (যেমন মিথ্যা, গীবত ইত্যাদি) করেন, সেটাও আপনার ইমান নষ্ট করবে না; বরং এটি আপনার জন্য পাপ হবে, তবে আপনি মুসলিমই থাকবেন।
সতর্কতা: তবে যদি আপনি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে বা মনে কুফরি শব্দ উচ্চারণ করেন, বা শাতিমের কথা শুনে সেটাকে সত্য মনে করেন, তাহলে ইমান চলে যেতে পারে। কিন্তু শুধু “গুনাহ করার ইচ্ছা” বা “সাধারণ পাপ” ইমান নষ্ট করে না।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: ওয়াসওয়াসা (মনের কুযুক্তি) মোকাবিলা
মূলনীতি: ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, এবং এটি ইমানের দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি ঈমানদারদের পরীক্ষা। ইসলামী পদ্ধতি হলো: ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং তা উপেক্ষা করা।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “মানুষের মনে কখনো কখনো ওয়াসওয়াসা আসে, তখন সে বলে, ‘কে আমাকে সৃষ্টি করেছে? কে এটি সৃষ্টি করেছে?’... এমন অবস্থায় তোমরা ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি’ বলে পড়বে এবং ওয়াসওয়াসা থেকে বিরত থাকবে।” (বুখারি, মুসলিম)
- হানাফি ফিকহের গ্রন্থ: রদ্দুল মুহতার (১/১২৫) এ এসেছে, “যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, তার জন্য উত্তম হলো এ ধরনের চিন্তাকে পাত্তা না দেওয়া এবং একে শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে করা। কারণ ওয়াসওয়াসা নিয়ে চিন্তা করলে তা বেড়ে যায়।”
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: আপনার যখনই মনে আসে যে, “অমুক অমুসলিম ব্যক্তি কি শাতিম কিনা?” বা “আমার ইমান চলে যাবে কিনা?” তখন তার কোনো মূল্য দেওয়া উচিত নয়। কারণ:
- আপনি নিশ্চিত নন যে সেই ব্যক্তি শাতিম। ইসলামে কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা (সু-ধারণা বর্জন) নিষিদ্ধ।
- আপনার ওয়াসওয়াসার সমস্যা আছে বলে এই চিন্তা বারবার আসা-যাওয়া করছে। শয়তান এভাবেই মানুষকে কুফরির দিকে ঠেলে দিতে চায়।
- উপেক্ষা করাই একমাত্র পথ। যখনই এ ধরনের চিন্তা আসবে, তখনই আপনি আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়বেন এবং কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে অন্য কোনো কাজে মনযোগ দেবেন।
উপসংহার: এ ধরনের চিন্তাকে পাত্তা না দেওয়াই আপনার জন্য উত্তম এবং এটি ওয়াসওয়াসা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বারবার এ নিয়ে মাথা ঘামালে সমস্যা বাড়বে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর (আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব):
-
প্রশ্ন: “তারপর যদি গোনাহ করি ইমান চলে যাবে কি?” উত্তর: না, সাধারণ গুনাহ করলে ইমান চলে যাবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি কাজ করলে ইমান চলে যেতে পারে। আপনি যেহেতু শাতিম হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত নন এবং ইমান নষ্টের কাজ না করার ইচ্ছা পোষণ করেন, আপনার ইমান ইনশাআল্লাহ নিরাপদ।
-
প্রশ্ন: “পাত্তা না দিলে ভালো হবে কি?” উত্তর: হ্যাঁ, পাত্তা না দেওয়াই সর্বোত্তম পদ্ধতি। ওয়াসওয়াসার ক্ষেত্রে এটি সুন্নাহ-সম্মত পদ্ধতি। শয়তানের কুমন্ত্রণা উপেক্ষা করলে তা দুর্বল হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত চলে যায়।
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ১/১২৫, ৩/৬০২ (ওয়াসওয়াসা ও কুফর সংক্রান্ত মাসাইল)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – ২/২৭৪ (শাতিম ও ইমান নষ্টের বিষয়ে)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – ২/৪২২ (ওয়াসওয়াসার প্রতিকার)
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা থানভী) – ১/২৯ (ইমান ও গুনাহের সম্পর্ক)