রাগের মাথায় তিন তালাক দেওয়ার বিধান ও তালাকপ্রাপ্তা নারীর শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করার শর্ত।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1736
Questioner: Ayesha
Question Asked: 17 Jun 2026, 04:13 PM
Reviewed & Published: 17 Jun 2026, 04:45 PM
Views: 59
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১/আমার একজন আত্মীয় ঝগড়া বিবাদে রাগে তালাক দেয় তার স্ত্রীকে। তিনি দাবি করছেন অচেতন অবস্থায় ছিলেন, রাগের মাথায় তিন তালাক দিয়েছেন কিন্তু সুস্পষ্ট ঘটনার বিবরণ দিয়েছে যে, অন্তর থেকে না বললেও এক তালাক দুই তালাক তিন তালাক বলে ফেলেছে। তার স্ত্রীও একই কথা বললেন। উক্ত ক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হয়েছে?

২/তালাকপ্রাপ্তা নারী কি তার শশুর বাড়ীতে বসবাস করতে পারবেন? তালাকের রায় দেওয়ার সময় মুফতি সাহেব শর্ত দিলেন , যদি সেই নারীর সন্তান তার ভরণপোষণ দায়িত্ব নেয়ার উপযুক্ত হয় তবে ছেলের সাথে ছেলের বাড়ি হিসেবে থাকতে পারবেন। ছেলের বয়স এখনো ১২ বছর। ছেলের মা হিসেবে কি তিনি এখন থাকতে পারবেন যদি তার প্রাক্তন স্বামী একই বাড়িতে না থাকেন বা তার সাথে পর্দা বজায় রেখে? নাকি উনার শশুর উনাকে কিছু সম্পত্তি লিখে দিতে হবে পূর্ণ মর্যাদায় ঐ বাড়িতে থাকতে হলে? (সম্পদ এখনো শশুড়ের নামে, তো উনাকে ঘরে আনতে উনার শশুর কিছু সম্পত্তি লিখে দিতেও রাজি। আবার প্রাক্তন স্বামী ও রাজি যেকোনো উপায়ে ঘরে থাকুক উনি এটা। দরকার হয় উনি একই বাড়িতে থাকবে না)। কোন উপায়ে উনি শশুরবাড়ি থাকতে পারবেন?

Answer

উত্তর

প্রশ্ন ১: রাগের মাথায় তিন তালাক দেওয়া, অচেতন অবস্থার দাবি — তালাক কার্যকর হয়েছে কি?

উত্তর:
আপনার আত্মীয় যেভাবে তালাকের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তা বিশ্লেষণ করে হানাফি ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—

ঘটনা:

  • তিনি রাগের মাথায় স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছেন।
  • তাঁর দাবি, তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং অন্তর থেকে না চাইলেও এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে ফেলেছেন।
  • স্ত্রীও একই কথা বলেছেন।

হানাফি ফিকহের নীতি:
তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য বিবেকবান ও সচেতন অবস্থায় তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা যথেষ্ট। অন্তরের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা বিবেচ্য নয়। রাগের কারণে তালাক সাধারণত বাতিল হয় না, যদি না সে রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ বেখেয়াল (অচেতন) হয়ে যায়, অর্থাৎ কী বলছে তা-ই জানে না।

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, তিনি স্পষ্টভাবে “এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক” বলে উচ্চারণ করেছেন এবং তা জানতেও পেরেছেন। সুতরাং তিনি অচেতন বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন ছিলেন না। রাগের মাথায় হলেও তিনি শব্দগুলো জেনেশুনে উচ্চারণ করেছেন, তাই তিন তালাকই কার্যকর হয়েছে এবং তা যৌনসম্পর্ক অযোগ্য (বাইন) তালাকে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে গেছেন। ইদ্দত পালন শেষে তিনি অন্যত্র বিবাহ করতে পারবেন।

উল্লেখ্য:

  • “অন্তর থেকে না চাওয়া” তালাক রদ করার জন্য কোনো যুক্তি নয়।
  • স্ত্রীর সাক্ষ্যও তালাকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে না, বরং তা স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হয়।

গ্রন্থসূত্র:

رجل غضب غضباً شديداً فقال لامرأته أنت طالق، فقال: لا أدري ما قلت، فإن كان بحيث لا يعلم ما قال لا تقع، وإن كان يعلم تقع
(الفتاوى الهندية، كتاب الطلاق، الباب السابع: في الطلاق في حال الغضب)

وقد صرحوا بأن الطلاق في حال الغضب يقع إذا كان الغضب لا يزيل العقل
(رد المحتار، باب الطلاق في الغضب)

সুতরাং উক্ত তালাক কার্যকর হয়েছে এবং পুনরায় বিবাহ ছাড়া পুনর্মিলন সম্ভব নয়।


প্রশ্ন ২: তালাকপ্রাপ্তা নারী শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতে পারবেন কীভাবে?

প্রসঙ্গ:

  • তালাকপ্রাপ্তা নারীর ছেলের বয়স ১২ বছর।
  • প্রাক্তন স্বামী একই বাড়িতে থাকতে রাজি নন, কিন্তু তিনি চান যে স্ত্রী তার জন্য বাড়িতেই থাকুক।
  • শ্বশুর (প্রাক্তন স্বামীর পিতা) কিছু সম্পত্তি লিখে দিতে রাজি আছেন।
  • মুফতি সাহেব শর্ত দিয়েছিলেন, ছেলে ভরণপোষণে সক্ষম হলে সে ছেলের বাড়ি হিসেবে থাকতে পারবে। কিন্তু ছেলের বয়স ১২ বছর হওয়ায় সে সক্ষম নয়।

হানাফি ফিকহের আলোকে বিধান:

ক. তালাকপ্রাপ্তা নারীর শ্বশুরের সঙ্গে পর্দা ও বসবাসের শর্তাবলি

  • তালাকের পর স্ত্রী প্রাক্তন স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ বেগানা (নন-মাহরাম) হয়ে যান।

  • শ্বশুর (প্রাক্তন স্বামীর পিতা)ও তালাকের পর আর মাহরাম থাকেন না। কুরআনে ‘স্বামীর পিতা’কে পর্দার ক্ষেত্রে মাহরাম বলা হয়েছে শুধুমাত্র বিবাহের সময়। তালাকের পর এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়। তাই তাঁর কাছেও পর্দা করা আবশ্যক।
    (সূরা নূর ২৪:৩১, ব্যাখ্যা: তাফসির মাআরিফুল কুরআন, সূরা নূর, মাহরামের তালিকা)

  • প্রাক্তন স্বামী যদি একই বাড়িতে না থাকেন তবে তাঁর কাছ থেকে পর্দার কোনো প্রয়োজন নেই, তবে তিনি মাহরাম না হওয়ায় একত্রে বসবাসের ফলে যদি পর্দা লঙ্ঘনের আশংকা থাকে, তাহলে তা জায়েজ নয়।

খ. ছেলের (১২ বছর) কারণে থাকার সম্ভাবনা

  • ছেলে মায়ের জন্য মাহরাম। মা তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেন। কিন্তু ছেলের বয়স ১২ বছর হওয়ায় সে আইনগত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়। তাই ‘ছেলের বাড়ি’ হিসেবে থাকার শর্ত পূর্ণ হয় না। তবে মা-ছেলে মিলে একত্রে বসবাস করতে কোনো বাধা নেই, শর্ত থাকে যে অন্যান্য নন-মাহরাম (যেমন শ্বশুর, দেবর, জা, ভাসুর) থেকে পৃথক থাকা এবং পর্দা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

গ. শ্বশুরের সম্পত্তি লিখে দেওয়া ও মর্যাদাপূর্ণ বসবাস

  • শ্বশুর যদি আলাদা অংশ বা স্বতন্ত্র ঘর (যেখানে শ্বশুর ও অন্যান্য নন-মাহরাম প্রবেশ করবে না) তাঁর নামে লিখে দেন, তাহলে তিনি পূর্ণ মর্যাদায় সেখানে থাকতে পারেন।

  • সর্বোত্তম পদ্ধতি: শ্বশুর বাড়ির একটি পৃথক অংশ (আলাদা প্রবেশপথ, রান্নাঘর, টয়লেট) সম্পত্তি হিসেবে লিখে দিলে তা স্ত্রীর নিজস্ব আবাসে পরিণত হবে। সেখানে তিনি তাঁর ছেলেকে নিয়ে থাকতে পারবেন এবং অন্যান্য পুরুষ (যাঁরা নন-মাহরাম) থেকে পর্দা বজায় রাখতে পারবেন।

  • প্রাক্তন স্বামী রাজি থাকায় এবং তিনি বাড়িতে না থাকায়, শুধু শ্বশুর থাকবেন। শ্বশুরের সঙ্গেও পর্দা করতে হবে। যদি বাড়ির একই ছাদের নিচে বসবাস করেন, তাহলে পর্দা কঠিন হবে এবং ফিতনার আশংকা থেকে যাবে। তাই সম্পত্তি লিখে দেওয়ার মাধ্যমে স্বাধীন ও পৃথক আবাস নিশ্চিত করাই উত্তম।

ঘ. ইমদাদুল ফাতাওয়া ও রদ্দুল মুহতার-এর নির্দেশনা

  • তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দত শেষে অন্য কোথাও বসবাস করবে। তবে যদি তার নিজস্ব কোনো সম্পত্তি না থাকে এবং সে অসহায় হয়, তবে পরিবারের অমাহরাম সদস্যদের সঙ্গে পর্দা রেখে একই বাড়িতে থাকা জরুরি অবস্থায় জায়েজ হতে পারে, কিন্তু তা উত্তম নয়।
  • রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে প্রাক্তন স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না শুধুমাত্র ইদ্দতকাল পর্যন্ত। ইদ্দত শেষে তার থাকার অধিকার থাকে না। তাই তাকে থাকতে চাইলে বাড়ির মালিক (এখানে শ্বশুর) অনুমতি দিলেও পর্দার শর্ত অবশ্যই পালন করতে হবে।

সারসংক্ষেপ:

| বিষয় | বিধান | |----------|------------| | শ্বশুরের বাড়িতে বসবাস | জায়েজ, তবে পর্দা বজায় রাখতে হবে (শ্বশুর নন-মাহরাম)। | | প্রাক্তন স্বামী একই বাড়িতে থাকলে | কখনোই জায়েজ নয়, কারণ তিনি নন-মাহরাম। | | ছেলে ১২ বছর | মায়ের জন্য মাহরাম, কিন্তু তার কারণে ‘ছেলের বাড়ি’ হিসেবে থাকার শর্ত পূর্ণ নয়। তবে মা-ছেলে একত্রে থাকতে পারে। | | শ্বশুর সম্পত্তি লিখে দিলে | এটি উত্তম সমাধান। আলাদা অংশ বা সম্পত্তি পেলে সেটি তাঁর নিজস্ব হবে এবং পূর্ণ মর্যাদায় বসবাস করতে পারবেন। | | অবশ্য পালনীয় | পর্দা, পৃথক ব্যবহার ব্যবস্থা, ও অন্যের সঙ্গে মেলামেশা না করা। |

প্রস্তাবিত পথ:
শ্বশুর যদি বাড়ির একটি আলাদা ফ্ল্যাট বা কক্ষ (রান্নাঘর, বাথরুমসহ) আপনার আত্মীয়ার নামে লিখে দেন, তাহলে তিনি তার ছেলেকে নিয়ে সেখানে নিরাপদে ও সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারবেন। শ্বশুরের কাছে সম্পত্তি লিখে নেওয়া একটি আইনি ও নৈতিক সমর্থন হবে, যা তাঁর মর্যাদা রক্ষা করবে এবং ফিতনার পথ বন্ধ করবে।

গ্রন্থসূত্র:

  • سورة النور، الآية 31
  • رد المحتار، كتاب الطلاق، باب المطلقة
  • إمداد الفتاوى، كتاب الطلاق، فصل في سكنى المطلقة
  • الفتاوى الهندية، كتاب الطلاق، الباب السابع عشر
  • بهشتي گوهر (بهشتي زيوهر)، كتاب الطلاق

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.