অত্যাচারিতের বদ দোয়ার বিধান, ধৈর্যের ফজিলত ও ইসলামী সমাধান।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1714
Questioner: Shirin Akter
Question Asked: 17 Jun 2026, 07:10 AM
Reviewed & Published: 17 Jun 2026, 07:15 AM
Views: 59
Tokens: 7,739
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আপন ভাই আমার থেকে ২ বছরের বড়ো। আমার আব্বা মারা যাওয়ার অনেক আগেই সম্পত্তি মানে বাসা বন্টন করে গেছে। যার পুরাটা আমার ভাই পেয়েছে। আমার এতে কোনো আক্ষেপ নেই। যেহেতু আমার ভাই পড়াশোনা, ব্যাবসা কোনো কিছুতে ভালো না আরো অন্যান্য সঙ্গত কারণ ছিল। কিন্তু কিছু জিনিস ছিল যেগুলো আমার আব্বা জীবন দশা তেই আমাকে দেন। যেমন ধরেন আমার যাবতীয় যত ফার্নিচার যেমন খাট, শোকেস, ওয়ারেড্রপ, সোফা ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। আমার বাবা মারা জান ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ আর আমার বিয়ের হয় ২১ জুলাই ২০২৩. আমার বিয়ের পর যখন আমি আমার জিনিস গুলো চায় আমার জিনিস গুলো আমাকে দিতে অস্বীকার করে, অনেক বাজে কথা বলে। এমন কী আমার আম্মা কে তার জিনিস গুলা থেকে বঞ্চিত করে। আমার আম্মা e কারণে এখন আমার নানা নানীর কাছে থাকে। আর একটি জমি তে আমার আম্মার আর ভাইয়ার নাম আছে। মানে ৫ কাঠা জমি তে ১ কাঠা আম্মার আর ৪ কাঠা ভাইয়ার। আমার বিয়ের ও অনেক আগে থেকে আমার আম্মা ওই ১ কাঠা আমাকে দাওয়ার নিয়ত করে। কিন্তু আমার ভাই বিভিন্ন ভাবে টা হতে দেই নাই। সব সময় কোনো না কোনো ঝামেলা করতো। যেহেতু আব্বার বাড়ি টা পুরাটাই ভাইয়ার নামে দিয়েছে তাই আম্মার খুব ইচ্ছে ছিল শহরের ওই ১ কাঠা আমাকে দিতে। যাই হউক তার পর আমার বিয়ের হয়ে যাই। কিন্তু আমার জমি তো দূরের কথা আমার জিনিস গুলা চাইতে গেলে অনেক বাজে ব্যাবহার করে। আমি সম্মানের কথা চিন্তা করে এগুলি তে জড়াই না। আমার বিয়ের ৩ বছর হয়ে যাচ্ছে। আমার ভাই আমার সাথে কথা বলে। এমন হয়েছে আমি ভালো করে কিছু বোলতে গেলে আমাকে হুমকি দিতে শুরু করে। অনেক জুলুম করে। আগে দুয়া করতাম কিন্তু এখন ওই জুলুম গুলোর জন্য বদ দুয়া করি। বদ দুয়া করা যাবে কী?

Answer

উত্তর: বদ দোয়া করা ও শরয়ী নির্দেশনা

প্রথমেই আপনার কষ্ট ও দুঃখের বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করছি। ভাইয়ের অবিচার, সম্পত্তি বঞ্চনা এবং মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার সত্যিই কঠিন পরিস্থিতি। কিন্তু ইসলামে প্রতিশোধ বা বদ দোয়া করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও হুকুম জানা জরুরি।


১. বদ দোয়া (অভিশাপ) করার বিধান

ইসলাম সাধারণত অভিশাপ (লা’নাত) বা বদ দোয়া করতে নিরুৎসাহিত করে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

“মুমিন কখনো লা’নাতকারী (অভিশাপকারী) হয় না।” (তিরমিযী, হাদিস: ১৯৭৭)

তবে যদি কেউ অত্যাচারিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে বদ দোয়া করে, তবে তা জায়েয। কিন্তু উত্তম হলো ধৈর্য ধরা এবং ক্ষমা করে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর মন্দের প্রতিশোধ সমান মন্দ; কিন্তু যে ক্ষমা করে ও সন্ধি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে।” (সূরা শূরা: ৪০)
“যে ধৈর্য ধরে এবং ক্ষমা করে, এটি নিশ্চয় বড় সাহসের কাজ।” (সূরা শূরা: ৪৩)

হাদিসে এসেছে:

“মজলুমের দোয়া (অত্যাচারিতের বদ দোয়া) কবুল হয়, যদিও সে পাপী হয়।” (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪৬৪)

তাই আপনার ভাইয়ের ওপর বদ দোয়া করা জায়েয, কিন্তু এটি আপনার জন্য উত্তম নয়। উত্তম হলো আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া এবং নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করা।


২. বদ দোয়া করার শর্ত ও সতর্কতা

  • বদ দোয়া শুধু অত্যাচারীর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, সম্পত্তি বা অন্য কিছুতে নিজের লোভ পূরণের জন্য নয়।
  • অভিশাপ দেওয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত; বরং বলবেন: “হে আল্লাহ! আমার ভাইকে হেদায়েত দান করুন।” অথবা “হে আল্লাহ! আপনি আমার অত্যাচারের প্রতিশোধ নিন।”
  • বদ দোয়া করলে তা নিজের অকল্যাণও করতে পারে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

“সাবধান! তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, নিজেদের সন্তানের বিরুদ্ধে ও নিজেদের সম্পদের বিরুদ্ধে দোয়া করো না। কারণ এমন হতে পারে যে, তা কবুল হওয়ার সময় এসে গেছে।” (মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯)


৩. আপনার করণীয় (প্রস্তাবিত সমাধান)

২. ধৈর্য ও ক্ষমা:

  • আপনার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে ধৈর্য ধরা এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া সর্বোত্তম। এতে আপনি আল্লাহর কাছে বেশি সওয়াব পাবেন।
  • হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।” (মুসলিম)

৩. উপযুক্ত ইসলামী পদ্ধতি:

  • প্রথমে পারিবারিক মধ্যস্থতা করুন। গ্রামের মুরব্বি বা ইমাম সাহেবের মাধ্যমে ভাইকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
  • যদি না মানে, তাহলে স্থানীয় ইসলামী সালিশি কমিটি বা মসজিদের ইমামের সহায়তা নিন।
  • সম্পত্তির বণ্টন যদি পিতার জীবদ্দশায় ওয়ারিশদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে না হয়ে থাকে, তবে ফরায়েজ (ইসলামী উত্তরাধিকার) অনুযায়ী পুনর্বণ্টনের দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু পিতা যদি জীবদ্দশায় তার সম্পত্তি বণ্টন করে থাকেন, তাহলে তা বৈধ, যদিও উত্তম হলো সমান বণ্টন।

৪. আপনার প্রাপ্য জিনিসপত্র (ফার্নিচার) উদ্ধার:

  • আপনার বাবা আপনাকে যে জিনিসপত্র জীবদ্দশায় দান করেছিলেন, সেগুলো আপনার মালিকানা। ভাইয়ের তা আটকে রাখা গুনাহ। আপনি মধ্যস্থতা বা ইসলামী আদালত (যদি সম্ভব) দ্বারা সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করুন।

৫. মায়ের অধিকার রক্ষা:

  • আপনার মায়ের জন্য নির্ধারিত ১ কাঠা জমি আপনার ভাইয়ের আটকে দেওয়া জায়েয নয়। যদি আপনার মা আপনাকে তা দিতে চান, তাহলে তা বৈধ। কিন্তু ভাইয়ের বাধা অমানবিক ও ইসলামবিরোধী।
  • মাকে সম্মান ও সাহায্য করা আপনার কর্তব্য। মা যাতে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন যাপন করেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

৪. বদ দোয়া না করে কী করবেন?

  • উত্তম দোয়া করুন:
    “হে আল্লাহ! আমার ভাইকে হেদায়েত দিন। তার অন্তর নরম করুন। সে যেন আমার ও আমার মায়ের হক আদায় করে। আপনি তাকে সঠিক পথ দেখান।”

  • নিজের জন্য দোয়া করুন:
    “হে আল্লাহ! আমাকে ধৈর্য দিন। আপনি আমার অত্যাচারের প্রতিশোধ নিন। আপনি আমাকে কল্যাণ ও সন্তুষ্টি দান করুন।”

  • রাসূল (ﷺ)-এর শিক্ষা অনুসরণ করুন:
    মক্কার কাফেররা যখন তাকে নির্যাতন করত, তখন তিনি বদ দোয়া না করে বলতেন:

    “হে আল্লাহ! আমার সম্প্রদায়কে হেদায়েত দিন, কারণ তারা জানে না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৩৯)


৫. চূড়ান্ত ফতোয়া

“বদ দোয়া করা জায়েয, কিন্তু উত্তম নয়। আপনার জন্য উত্তম হলো ধৈর্য ধরা, ক্ষমা করে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া। যদি বদ দোয়া করতেই চান, তাহলে শুধু অত্যাচারীর বিপরীতে সীমাবদ্ধ রাখুন, তবে অভিশাপ (লা’নাত) না দিয়ে বরং বলুন: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার ভাইকে তার কর্মের ফল দিন।’ তবে সবচেয়ে ভালো হলো, তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করা এবং নিজের অধিকার আদায়ে ইসলামী পন্থা অবলম্বন করা।”

(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২২৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৬০০; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৫৭; মাআরিফুল কুরআন, ৮/৫৪৩)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.