সালাত ত্যাগকারী মৃত ছেলের জন্য এক মায়ের ফাতওয়ার অনুরোধ।

Miscellaneous Fiqh · Maliki

Question No: 1705
Questioner: Hasan
Question Asked: 16 Jun 2026, 09:05 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 09:17 PM
Views: 56
Tokens: 12,859
This answer is according to the 'Maliki' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক মহিলা তার এক সালাত ত্যাগকারী ছেলে সম্পর্কে সৌদী আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন বায (রহঃ)-এর নিকট এক ফাতওয়া জানতে চেয়েছিলেন। ঐ ফাতওয়া সৌদী আরবের “উচ্চ উলমা পরিষদের” নিকট হস্তান্তর করার পর সৌদী সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি যে সমাধান দিয়েছিল তা উল্লেখ করা হল। ঐ মহিলার প্রশ্ন ছিল নিম্নরূপ :
প্রশ্ন : ১৭ বৎসর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল। আজ থেকে ২ মাস পূর্বে গাড়ি দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। ছেলেটি সালাত আদায় করতনা এবং রামাযান মাসে সিয়ামও পালন করতনা। তবে আমার জানা মতে এই দু’টি পাপ কাজ ছাড়া আর কোন পাপ কাজ তার দ্বারা সংগঠিত হয়নি। এমতাবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ হতে তার রামাযান মাসের সিয়ামগুলি পূর্ণ করা তার মা হিসাবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়েয হবে কি? ঐ ছেলের পক্ষ হতে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিবসের সিয়াম এবং সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এ সমস্ত নাফল সিয়ামগুলি যদি পালন করা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলে পাবে? এ ছাড়া আমি যদি তার পক্ষ থেকে যুহর সালাতের আগে চার রাক‘আত, যুহর সালাতের পরে দুই রাক‘আত এবং ‘আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর সালাতের প্রথমে দুই রাক‘আত করে সালাত আদায় করি তাহলে কি এ সমস্ত সালাতের সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?
উত্তর : ফাতওয়া কমিটি যে ফাতওয়া দিয়েছিল তা ছিল এরূপ : যে ব্যক্তি সিয়াম পালন না করে এবং সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা যাবেনা। কেননা যে ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : একজন মু’মিন বান্দা এবং একজন কাফির ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা সালাত আদায় করে, আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা সালাত আদায় করেনা। অতএব যারা সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় জীবন কাটালো এবং মৃত্যুর আগে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা, এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু‘আ করা জায়েয হবেনা। অতএব ঐ ছেলের মা ঐ ছেলের মাগফিরাতের জন্য যতই নাফ্‌ল সালাত, সিয়াম ও দু‘আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবেনা। কেননা সালাত এমন একটি ইবাদাত যা কারও পক্ষ হয়ে আদায় করলে তার প্রতিদান পাবার কোন প্রমাণ ইসলামী শারী‘আতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল প্রকার ভাল কাজের তাওফীকদাতা।
পরিশেষে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সকল সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রাহমাত ও শান্তি বর্ষিত হোক, ‘আমীন।
পক্ষে : ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি :
সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন বায
সহ-সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন আবদুল্লাহ আলুশ শাইখ
সদস্য : আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবদুর রাহমান আল গুদাইয়ান
সদস্য : বাকার ইব্‌ন আবদুল্লাহ আবু যায়ীদ
সদস্য : সালিহ ইব্‌ন ফাউযান আল ফাউযান

উপরোক্ত মাসয়ালা সম্পর্কে Maliki মাযহাবের অবস্থান বিষয়ে জানতে চাই।

Answer

মালিকী মাযহাবের অবস্থান

উক্ত মাসআলায় মালিকী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:

১. সালাত ত্যাগকারীর হুকুম

মালিকী মাযহাবে ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগকারী ব্যক্তিকে কাফির গণ্য করা হয় না, বরং তাকে ফাসিক (গুনাহগার) মনে করা হয়। তবে যদি সে সালাতের ফরজিয়্যত অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফির হবে। কিন্তু শুধু অলসতা বা উদাসীনতায় সালাত ত্যাগকারী ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে গণ্য, যদিও এটি কবীরা গুনাহ।

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগ করে, তাকে হত্যা করা হবে (হাদ্দ হিসেবে), কিন্তু তাকে কাফির বলা হবে না। তার জানাযার সালাত পড়া হবে এবং মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা হবে।"
(আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা, ১/২২৮; মুখতাসার খলীল; হাশিয়াতুদ দাসূকী, ২/১৭৫)

সুতরাং প্রশ্নোক্ত ছেলে সালাত ও রমযানের সিয়াম ত্যাগ করলেও মালিকী মতে সে কাফির নয়; বরং সে গুনাহগার মুসলিম মৃত ব্যক্তি। তাই তার জন্য দো‘আ করা, তার পক্ষ থেকে সাদকা করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়েয।


২. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সালাত ও সিয়াম আদায়

মালিকী মাযহাবে জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তির জন্য ফরজ সালাত বা ফরজ সিয়াম আদায় করা জায়েয নেই। শুধু নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে:

  • সিয়ামের ক্ষেত্রে:

    • যদি মৃত ব্যক্তির উপর নযর (মান্নত)-এর সিয়াম থাকে, তাহলে তার ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী) তার পক্ষ থেকে তা আদায় করতে পারে। (আল-মুদাওওয়ানা, ১/২৩০; আল-মুওয়াত্তা, বাবুস সিয়াম)
    • যদি মৃত ব্যক্তি রমযানের কাযা সিয়াম (যেমন: সফর, অসুস্থতা, হায়য ইত্যাদি কারণে ছুটে যাওয়া) আদায় না করেই মারা যায় এবং সে সিয়াম আদায়ের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আদায় করেনি, তাহলে তার পক্ষ থেকে ওয়ারিস সিয়াম পালন করলে তা জায়েয নয়। বরং তার পক্ষ থেকে ফিদইয়া (প্রত্যেক দিনের জন্য একজন মিসকীনকে খাদ্য) প্রদান করতে হবে। (ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/৩১৬; আয-যাখীরা, ২/৫২৪)
    • যদি মৃত ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে (অজুহাত ছাড়া) রমযানের সিয়াম ত্যাগ করে থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে কাযা বা ফিদইয়া কোনো কিছুই জায়েয নয়। বরং তার জন্য শুধু তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। (মুখতাসার খলীল, কিতাবুস সিয়াম; হাশিয়াতুদ দাসূকী, ১/৫৩০)
  • সালাতের ক্ষেত্রে:

    • মালিকী মাযহাবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ফরজ বা নফল কোন সালাতই পড়া জায়েয নয়। সালাত এমন একটি ইবাদত যা কেবল নিজেকেই আদায় করতে হয়; অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে তা কখনও আদায় করতে পারে না। (আল-মুদাওওয়ানা, ১/১৫২; আল-কাবীর, ২/১০৮)
    • রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

      "যে ব্যক্তি (অসুস্থতা বা সফরে) সালাত আদায় করতে পারেনি, সে তার পরিবারের কাউকে তার পক্ষ থেকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতে পারে না। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের আমলের জন্য দায়ী।"
      (ইবনে আবী শায়বা; ইমাম মালিক আল-মুওয়াত্তা-তে এরূপ কোনো অনুমতি দেননি)


৩. নফল ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দেওয়া

মালিকী মাযহাবে জীবিত ব্যক্তি নিজে নফল সিয়াম, নফল সালাত, দান-সদকা ইত্যাদি আদায় করে সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করতে পারে কি না—এ বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে প্রসিদ্ধ মত হলো:

  • সালাত ও সিয়ামের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো জায়েয নয়। কারণ সালাত ও সিয়াম এমন ইবাদত যার ফজিলত সরাসরি আমলকারীর জন্য নির্ধারিত। (হাশিয়াতুদ্দাসূকী, ২/১৮১)
  • দান-সদকা, দো‘আ ও ইস্তিগফার মৃত ব্যক্তির জন্য উপকারী। ছেলে যেহেতু সালাত ত্যাগী ও গুনাহগার, তাই তার মা তার জন্য দো‘আ করতে পারেন, ইস্তিগফার করতে পারেন এবং তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করতে পারেন।

ইমাম ইবনুল কাসিম (রহ.) বলেন:

"মৃত ব্যক্তির জন্য সিয়াম পালন করা জায়েয নয়, তবে তার পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয।"
(আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা, ১/২৩১)


৪. মালিকী মাযহাবের সিদ্ধান্ত

প্রশ্নোক্ত অবস্থায়:

  • ছেলে কাফির নয়; বরং গুনাহগার মুসলিম।
  • তার মা নিজের পক্ষ থেকে তার জন্য দো‘আ, ইস্তিগফার ও সদকা করতে পারেন।
  • তার পক্ষ থেকে রমযানের সিয়াম বা নফল সিয়াম পালন করা জায়েয নয়
  • তার পক্ষ থেকে যুহর, আসর, মাগরিব, ইশা, ফজর—কোনো সালাতই আদায় করা জায়েয নয়
  • নফল সালাত ও সিয়ামের সওয়াব তার কাছে পৌঁছানোরও কোনো প্রমাণ নেই।

একমাত্র আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইস্তিগফার এবং দান-সদকাই তার জন্য উপকারী হতে পারে।

রেফারেন্স:

  • ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা, বাবু ‘য-যাকাত’ ও ‘সিয়াম’
  • আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা, ১/১৫২, ২২৮-২৩১
  • ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/৩১৬
  • আয-যাখীরা, ২/৫২৪
  • মুখতাসার খলীল, কিতাবুস সিয়াম
  • হাশিয়াতুদ দাসূকী, ১/৫৩০, ২/১৭৫-১৮১

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.