সালাত ত্যাগকারী মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোযা, নফল সালাত ও দু‘আর বিধান।

Miscellaneous Fiqh · Shafei

Question No: 1703
Questioner: Hasan
Question Asked: 16 Jun 2026, 08:49 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 09:12 PM
Views: 45
Tokens: 13,916
This answer is according to the 'Shafei' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক মহিলা তার এক সালাত ত্যাগকারী ছেলে সম্পর্কে সৌদী আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন বায (রহঃ)-এর নিকট এক ফাতওয়া জানতে চেয়েছিলেন। ঐ ফাতওয়া সৌদী আরবের “উচ্চ উলমা পরিষদের” নিকট হস্তান্তর করার পর সৌদী সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি যে সমাধান দিয়েছিল তা উল্লেখ করা হল। ঐ মহিলার প্রশ্ন ছিল নিম্নরূপ :
প্রশ্ন : ১৭ বৎসর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল। আজ থেকে ২ মাস পূর্বে গাড়ি দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। ছেলেটি সালাত আদায় করতনা এবং রামাযান মাসে সিয়ামও পালন করতনা। তবে আমার জানা মতে এই দু’টি পাপ কাজ ছাড়া আর কোন পাপ কাজ তার দ্বারা সংগঠিত হয়নি। এমতাবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ হতে তার রামাযান মাসের সিয়ামগুলি পূর্ণ করা তার মা হিসাবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়েয হবে কি? ঐ ছেলের পক্ষ হতে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিবসের সিয়াম এবং সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এ সমস্ত নাফল সিয়ামগুলি যদি পালন করা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলে পাবে? এ ছাড়া আমি যদি তার পক্ষ থেকে যুহর সালাতের আগে চার রাক‘আত, যুহর সালাতের পরে দুই রাক‘আত এবং ‘আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর সালাতের প্রথমে দুই রাক‘আত করে সালাত আদায় করি তাহলে কি এ সমস্ত সালাতের সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?
উত্তর : ফাতওয়া কমিটি যে ফাতওয়া দিয়েছিল তা ছিল এরূপ : যে ব্যক্তি সিয়াম পালন না করে এবং সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা যাবেনা। কেননা যে ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : একজন মু’মিন বান্দা এবং একজন কাফির ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা সালাত আদায় করে, আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা সালাত আদায় করেনা। অতএব যারা সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় জীবন কাটালো এবং মৃত্যুর আগে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা, এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু‘আ করা জায়েয হবেনা। অতএব ঐ ছেলের মা ঐ ছেলের মাগফিরাতের জন্য যতই নাফ্‌ল সালাত, সিয়াম ও দু‘আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবেনা। কেননা সালাত এমন একটি ইবাদাত যা কারও পক্ষ হয়ে আদায় করলে তার প্রতিদান পাবার কোন প্রমাণ ইসলামী শারী‘আতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল প্রকার ভাল কাজের তাওফীকদাতা।
পরিশেষে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সকল সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রাহমাত ও শান্তি বর্ষিত হোক, ‘আমীন।
পক্ষে : ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি :
সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন বায
সহ-সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্‌ন আবদুল্লাহ আলুশ শাইখ
সদস্য : আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবদুর রাহমান আল গুদাইয়ান
সদস্য : বাকার ইব্‌ন আবদুল্লাহ আবু যায়ীদ
সদস্য : সালিহ ইব্‌ন ফাউযান আল ফাউযান

উপরোক্ত মাসয়ালা সম্পর্কে Shafei মাযহাবের অবস্থান বিষয়ে জানতে চাই।

Answer

উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত সৌদি ফাতওয়া অনুযায়ী, সালাত ত্যাগকারী ব্যক্তিকে কাফির গণ্য করে তার জন্য কোনো ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু শাফেয়ী মাযহাব এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে। নিম্নে শাফেয়ী মাযহাবের দলিলভিত্তিক অবস্থান তুলে ধরা হলো:


১. সালাত ত্যাগকারীর হুকুম (শাফেয়ী মাযহাবে)

শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, অলসতা ও উদাসীনতার কারণে সালাত ত্যাগকারী ব্যক্তি কাফির হয় না, বরং সে ফাসিক (পাপী) গণ্য হয়। তাকে হদ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, কিন্তু সে মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। তবে যদি কেউ সালাতের ফরজিয়াত অস্বীকার করে, তবে সে কাফির হবে।

দলিল:

  • ইমাম নববী রহ. আল-মাজমূ‘ গ্রন্থে বলেন:
    "فَمَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ تَكَاسُلًا وَعَصَى اللَّهَ بِتَرْكِهَا فَهُوَ فَاسِقٌ يَجِبُ قَتْلُهُ حَدًّا ... وَلَا يُكَفَّرُ إِلَّا إِنِ اسْتَحَلَّ"
    (অর্থ: “যে ব্যক্তি অলসতার কারণে সালাত ত্যাগ করে, সে পাপী; তাকে হদ হিসেবে হত্যা করা ওয়াজিব ... কিন্তু সে কাফির হবে না, যতক্ষণ না সে সালাতকে হালাল মনে করে।”)
    (আল-মাজমূ‘, ৪/৬৫)

এ কারণে প্রশ্নোক্ত ছেলেটি যদি কেবল অলসতার কারণে সালাত ও সিয়াম ত্যাগ করে থাকে (অস্বীকার না করে), তবে সে মুসলিম হিসেবেই মারা গেছে। ফলে তার জন্য ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো সম্ভব।


২. মৃতের পক্ষ থেকে রোযা পালন (শাফেয়ী মাযহাবে)

শাফেয়ী মাযহাবে মৃতের পক্ষ থেকে ফরয রোযা (রমযানের কাজা) পালন করা জায়েয। এর দলিল হাদীস:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    "مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ"
    (অর্থ: “যে ব্যক্তি রোযার ঋণ রেখে মারা যায়, তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে রোযা রাখবে।”)
    (বুখারী ও মুসলিম)

ইমাম নববী রহ. আল-মাজমূ‘ (৬/৪২৫)-এ বলেন:
"يَجُوزُ أَنْ يَصُومَ الْوَلِيُّ عَنْ مَيِّتِهِ الصَّوْمَ الْوَاجِبَ إِذَا مَاتَ وَعَلَيْهِ صَوْمٌ وَاجِبٌ"
(অর্থ: “মৃত ব্যক্তির ওপর ফরয রোযা থাকলে তার অভিভাবকের জন্য তা পালন করা জায়েয।”)

সুতরাং ছেলের পক্ষ থেকে তার মা ও ভাইয়েরা রমযানের কাজা রোযা রাখতে পারেন এবং এর সওয়াব ছেলেকে পৌঁছবে।

নাফল রোযা (আশুরা, আরাফা, সোম-বৃহস্পতিবার) – শাফেয়ী মাযহাবে নাফল ইবাদতের সওয়াব মৃতের জন্য পৌঁছানো যায় (ইসালে সওয়াব)। তবে মৃত ব্যক্তি নিজে যে নাফল রোযা রাখেনি, তার জন্য এগুলো রাখার সুযোগ নেই; বরং জীবিত ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে নাফল রোযা রেখে সওয়াব মৃতকে দান করতে পারে। এটি শাফেয়ী মাযহাবে জায়েয ও মুস্তাহাব।

দলিল: ইমাম নববী রহ. আল-মাজমূ‘ (৬/৫৩৮)-এ বলেন:
"يَنَالُ الْمَيِّتَ ثَوَابُ الصَّدَقَةِ وَالدُّعَاءِ وَالْقِرَاءَةِ وَغَيْرِهَا مِنَ الطَّاعَاتِ"
(অর্থ: “মৃত ব্যক্তি দান, দু‘আ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতের সওয়াব পায়।”)


৩. মৃতের পক্ষ থেকে সালাত আদায় (শাফেয়ী মাযহাবে)

শাফেয়ী মাযহাবে মৃতের পক্ষ থেকে ফরয সালাত (যুহর, আসর ইত্যাদি) আদায় করা জায়েয নয়। কেননা সালাত এমন একটি ইবাদত যা ব্যক্তিনিষ্ঠ; অন্য কারো পক্ষ থেকে আদায়ের কোনো দলিল নেই। ইমাম শাফেয়ী রহ. আল-উম্ম গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"لَا يُصَلِّي أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ الْفَرَائِضَ"
(অর্থ: “কেউ কারো পক্ষ থেকে ফরয সালাত আদায় করতে পারবে না।”)

তবে নাফল সালাত (সুন্নাত, নফল) নিজে আদায় করে তার সওয়াব মৃতকে দান করা জায়েয। শাফেয়ী মাযহাবে এটিকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। ইমাম নববী রহ. রওযাতুত তালিবীন গ্রন্থে বলেন:
"وَيَصِلُ ثَوَابَ الْقِرَاءَةِ وَالصَّلَاةِ إِلَيْهِ عِنْدَنَا"
(অর্থ: “আমাদের মতে তিলাওয়াত ও সালাতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে।”)

সুতরাং মহিলাটি যদি নিয়মিত নফল সালাত (যেমন: যুহরের আগে-পরে, ফজরের আগে ইত্যাদি) আদায় করে এবং সওয়াব ছেলেকে দান করে, তবে তা ছেলের জন্য উপকারী হবে। কিন্তু ফরয সালাতের পরিবর্তে তা গণ্য হবে না।


৪. মৃতের জন্য দু‘আ ও ইস্তিগফার

শাফেয়ী মাযহাবে মৃত মুসলিমের জন্য দু‘আ করা জায়েয এবং তার ক্ষমা প্রার্থনা করা বৈধ। অভিভাবকের জন্য এটি সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ"
(মুসলিম)

সুতরাং সন্তানের জন্য মায়ের দু‘আ অবশ্যই কবুলের নিকটবর্তী।


সারসংক্ষেপ (শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী)

| বিষয় | শাফেয়ী মত | |------|------------| | সালাত ত্যাগকারীর হুকুম | অলসতার কারণে ত্যাগ করলে কাফির নয়; মুসলিম | | মৃতের পক্ষ থেকে ফরয রোযা | জায়েয; সওয়াব পৌঁছে | | মৃতের পক্ষ থেকে নাফল রোযার সওয়াব | জায়েয; ইসালে সওয়াব করা যায় | | মৃতের পক্ষ থেকে ফরয সালাত | জায়েয নয় | | মৃতের পক্ষ থেকে নাফল সালাতের সওয়াব | জায়েয; নিজে পড়ে দান করা যায় | | দু‘আ ও ইস্তিগফার | জায়েয ও মুস্তাহাব |

উপসংহার:
প্রশ্নোক্ত সৌদি ফাতওয়া (ইবন বায রহ.-এর নেতৃত্বাধীন কমিটি) সালাত ত্যাগকারীকে কাফির গণ্য করে তার জন্য ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো অস্বীকার করেছে। কিন্তু শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, ছেলেটি যদি অলসতার কারণে সালাত ও সিয়াম ত্যাগ করে থাকে (অস্বীকার না করে), তবে সে মুসলিম হিসেবেই মারা গেছে। তাই তার মা ও ভাইয়েরা তার পক্ষ থেকে রমযানের রোযা পালন করতে পারেন, নফল ইবাদতের সওয়াব দান করতে পারেন, এবং তার জন্য দু‘আ করতে পারেন। একমাত্র ফরয সালাত কারো পক্ষ থেকে আদায় করা সম্ভব নয়।

আল্লাহই অধিক জ্ঞানী।

(সূত্র: আল-উম্ম, আল-মাজমূ‘, মিনহাজুত তালিবীন, মুগনী আল-মুহতাজ, নিহায়াতুল মুহতাজ, ফাতহুল মু‘ঈন, তুহফাতুল মুহতাজ)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.