সালাত ত্যাগকারী মৃত ছেলের জন্য এক মায়ের ফাতওয়ার অনুরোধ।
Miscellaneous Fiqh · Hanbali
Question
প্রশ্ন : ১৭ বৎসর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল। আজ থেকে ২ মাস পূর্বে গাড়ি দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। ছেলেটি সালাত আদায় করতনা এবং রামাযান মাসে সিয়ামও পালন করতনা। তবে আমার জানা মতে এই দু’টি পাপ কাজ ছাড়া আর কোন পাপ কাজ তার দ্বারা সংগঠিত হয়নি। এমতাবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ হতে তার রামাযান মাসের সিয়ামগুলি পূর্ণ করা তার মা হিসাবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়েয হবে কি? ঐ ছেলের পক্ষ হতে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিবসের সিয়াম এবং সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এ সমস্ত নাফল সিয়ামগুলি যদি পালন করা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলে পাবে? এ ছাড়া আমি যদি তার পক্ষ থেকে যুহর সালাতের আগে চার রাক‘আত, যুহর সালাতের পরে দুই রাক‘আত এবং ‘আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর সালাতের প্রথমে দুই রাক‘আত করে সালাত আদায় করি তাহলে কি এ সমস্ত সালাতের সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?
উত্তর : ফাতওয়া কমিটি যে ফাতওয়া দিয়েছিল তা ছিল এরূপ : যে ব্যক্তি সিয়াম পালন না করে এবং সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা যাবেনা। কেননা যে ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : একজন মু’মিন বান্দা এবং একজন কাফির ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা সালাত আদায় করে, আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা সালাত আদায় করেনা। অতএব যারা সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় জীবন কাটালো এবং মৃত্যুর আগে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা, এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু‘আ করা জায়েয হবেনা। অতএব ঐ ছেলের মা ঐ ছেলের মাগফিরাতের জন্য যতই নাফ্ল সালাত, সিয়াম ও দু‘আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবেনা। কেননা সালাত এমন একটি ইবাদাত যা কারও পক্ষ হয়ে আদায় করলে তার প্রতিদান পাবার কোন প্রমাণ ইসলামী শারী‘আতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল প্রকার ভাল কাজের তাওফীকদাতা।
পরিশেষে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সকল সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রাহমাত ও শান্তি বর্ষিত হোক, ‘আমীন।
পক্ষে : ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি :
সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বায
সহ-সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্ন আবদুল্লাহ আলুশ শাইখ
সদস্য : আবদুল্লাহ ইব্ন আবদুর রাহমান আল গুদাইয়ান
সদস্য : বাকার ইব্ন আবদুল্লাহ আবু যায়ীদ
সদস্য : সালিহ ইব্ন ফাউযান আল ফাউযান
উপরোক্ত মাসয়ালা সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের অবস্থান বিষয়ে জানতে চাই।
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে উল্লেখিত ফাতওয়াটি হানবালী মাযহাব ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিশুদ্ধ মত অনুসারে দেওয়া হয়েছে। আপনি হানাফী মাযহাবের অবস্থান জানতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদেরকে ইসলামকিউএএ.ইনফো ও হানবালী ফিকহ অনুসরণ করে উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতএব আমরা এখানে হানবালী মাযহাব ও সালাফে সালেহীনের (ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, ইবন বায, আলবানী, ইবন উসাইমীন, সালেহ আল-ফাওযান) মতামতই পেশ করব।
মূলনীতি:
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ওযর ছাড়া নামাজ ত্যাগ করে, সে কাফির (মুরতাদ) বলে গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“একজন মু’মিন ও একজন কাফির-মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত (নামাজ) পরিত্যাগ করা।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮২)
অন্য হাদীসে এসেছে:
“আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মধ্যে প্রতিশ্রুতি হলো সালাত। যে ব্যক্তি তা পরিত্যাগ করে, সে কুফরী করল।” (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ২৬২১; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন)
এই হাদীসের ভিত্তিতে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, ইবন বায, ইবন উসাইমীন প্রমুখ মনীষী বলেছেন: ইচ্ছাকৃত ও ওযরবিহীন নামাজ ত্যাগকারী ব্যক্তি দুনিয়াতে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে না এবং তার জানাযা পড়া, তার জন্য দু‘আ করা, তার পক্ষ থেকে নফল ইবাদত করা জায়েয নয়। (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়্যাহ, ২২/৪৩; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ১০/২৪২)
সিয়াম (রোজা) ও সালাতের সাওয়াব পৌঁছে দেওয়া:
যে ব্যক্তি কুফরী অবস্থায় মারা গেছে, তার জন্য কোনো নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যারা কুফরী করে এবং কাফির অবস্থায় মারা যায়, তাদের কারো কাছ থেকে পৃথিবী পরিমাণ সোনাও গ্রহণ করা হবে না, যদিও তা দ্বারা মুক্তি পেতে চায়।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৯১)
অতএব, আপনার ছেলের পক্ষ থেকে রামযানের কাজা রোজা, আশুরা, আরাফা, সোম-বৃহস্পতিবারের নফল রোজা রাখা এবং নফল সালাত আদায় করা আদৌ জায়েয নয় এবং এতে আপনার ছেলের কোনো উপকার হবে না।
হানাফী মাযহাবের কথা:
হানাফী মাযহাবে ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগকারীকে কাফির না বলে ফাসেক গণ্য করা হয় (তবে এ মতটি দলিলের আলোকে দুর্বল)। হানাফীরা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল ইবাদত জায়েয মনে করলেও তারা একমত যে, যে ব্যক্তি কুফরী অবস্থায় মারা যায়, তার জন্য কোনো ইবাদতের সওয়াব পৌঁছে না। (বাদায়েউস সানায়ে’, ৭/২০৭)
কিন্তু যেহেতু প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তি কুফরী অবস্থায় (সালাত ত্যাগকারী) মারা গেছে, তাই হানাফী মাযহাবের বিচারেও তার জন্য নফল ইবাদত করা ও তার কাছে সওয়াব পৌঁছানোর আশা করা অমূলক।
সারসংক্ষেপ:
- যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ও ওযরবিহীন নামাজ ত্যাগ করে, সে হানবালী ও সালাফী মতানুযায়ী কাফির।
- কাফির অবস্থায় মারা গেলে তার জন্য কোনো নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে না।
- মৃত ব্যক্তির জন্য নফল সালাত, সিয়াম ও দু‘আ করা জায়েয নয়, কেননা সে মুরতাদ।
- হানাফী মাযহাব ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগকারীকে কাফির না বললেও, কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য নফল ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানোর কোনো ভিত্তি স্বীকার করে না।
প্রস্তাবনা:
আপনার ছেলের জন্য আপনি সর্বদা দু‘আ করতে পারেন যে, আল্লাহ তাকে ইহসানের সাথে হেদায়াত দিতেন এবং তার মৃত্যুকে ক্ষমার কারণ বানাতেন। তবে তার পক্ষ থেকে নামাজ-রোজা আদায় করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। বরং আপনি আপনার নিজের আমল বৃদ্ধি করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা আলে ইমরান ৩:৯১
- সহীহ মুসলিম: হাদীস ৮২
- সুনান আত-তিরমিযী: হাদীস ২৬২১ (আলবানী সহীহ)
- মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়্যাহ, ২২/৪৩
- মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ১০/২৪২
- ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ফতোয়া নং ১৯৪৮০
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং একমাত্র তাওফীক দানকারী।