রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো পুরুষত্ব কামনা করা কি জায়েজ?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার মনে ওয়াসওয়াসার কারণে যে সংশয় এসেছে, তা শয়তানের পক্ষ থেকে। আপনি নেক কাজ করতে চাচ্ছেন, তাই শয়তান আপনাকে ভুল পথে ঠেলে দিতে চায়। আপনার প্রশ্নের জবাব আমরা কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে দিচ্ছি।
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো পুরুষত্ব কামনা করা কি জায়েজ?
-
সাধারণ নীতি: যে কোনো ভালো বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়া জায়েজ ও প্রশংসনীয়। রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর কাছে সবকিছু চায়, এমনকি জুতার ফিতাও।” (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ৩৯৭৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯৩৫)
-
রাসূলের অনুসরণের গুরুত্ব: আল্লাহ বলেন: “তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১)। তাই রাসূল (সা.)-এর সুন্নত ও চরিত্রের আলোকে নিজেকে গঠন করার দোয়া করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
-
পুরুষত্ব বলতে এখানে কী বোঝানো হয়েছে? রাসূল (সা.) ছিলেন সর্বোচ্চ সাহসী, ধৈর্যশীল, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল। তাঁর এসব গুণ কামনা করা জায়েজ। তবে দোয়ার সময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা তাঁর মতো পূর্ণতা পেতে পারি না; বরং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী নিজেকে গড়তে চাই। যেমন বলা যায়: “হে আল্লাহ! আমাকে রাসূল (সা.)-এর মতো উত্তম চরিত্র, সাহস ও পুরুষত্ব দান করুন।” এটি সরাসরি রাসূলের সাথে নিজেকে তুলনা করা নয়, বরং তাঁর অনুসরণের আকাঙ্ক্ষা।
-
আদবের ব্যাপারে: আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, আল্লাহর রাসূলের প্রতি শ্রদ্ধা ও আদব রক্ষা করা জরুরি। আপনি যদি বলেন “ঠিক তাঁর মতো” এবং মনে মনে বিশ্বাস করেন যে আপনি অপূর্ণ, তবে তা আদবের খেলাফ নয়। তবে নিরাপদ পদ্ধতি হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকা মিন ফাদলিকা আন তারযুক্বনী রুজুলাতান তুযাইয়িনু বিহা খুলুক্বী কামা যাইয়ান্তা বিহা খুলুকা নাবিয়্যিকা (সা.)” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ চাই যে, আপনি আমাকে এমন পুরুষত্ব দিন যা আমার চরিত্রকে সুশোভিত করবে, যেমন আপনি আপনার নবীর চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন।”
২. ওয়াসওয়াসা ও নিফাকের ভয়:
- ওয়াসওয়াসা: এটি শয়তানের কাজ। আপনি নেক কাজ করতে চাইছেন, তাই শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দিতে চায়। রাসূল (সা.) বলেছেন: “ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) আসলে তুমি বলো: ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর রাসূলের উপর’, তারপর তা চলে যাবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪)। সুতরাং এই ভয়কে গুরুত্ব দেবেন না।
- নিফাক (মুনাফিকি): আপনি যদি অন্তরে sincerity (একলাস) নিয়ে দোয়া করেন, তবে তা নিফাক নয়। নিফাক হলো মুখে কিছু বলা আর অন্তরে তার বিপরীত থাকা। আপনার অন্তর তো আল্লাহর কাছেই চাইছে, তাই এটি নিফাক নয়। বরং এটি ইমানের দাবি।
- হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসার রোগী, তার উচিত সন্দেহ ত্যাগ করে শুধু শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের ওপর আমল করা।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫০)
৩. উপসংহার ও পরামর্শ:
-
আপনার দোয়া জায়েজ আছে – যদি আপনি রাসূল (সা.)-এর চরিত্র ও গুণাবলি অনুসরণের আকাঙ্ক্ষা করেন।
-
ওয়াসওয়াসাকে কর্ণপাত করবেন না। এটি আপনার ইবাদতকে নষ্ট করতে চায়। আপনি যখনই এই ভয় পাবেন, তখন বলুন: “আমি বুঝি না, আমি শুধু ভালো চাই” এবং তা নিয়ে চিন্তা বন্ধ করুন।
-
আরো উত্তম দোয়া: সহিহ সুন্নাহ থেকে কিছু দোয়া পড়ুন, যেমন: “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াক্বিনা আযাবান্নার” (সূরা আল-বাকারা, ২:২০১) অথবা “আল্লাহুম্মানফা’নী বিমা ‘আল্লামতানী ওয়া ‘আল্লিমনী মা ইয়ানফা’নী ওয়া যিদনী ‘ইলমা” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৯৯)।
-
আপনার জন্য বিশেষ টিপস: ওয়াসওয়াসার চিকিৎসার জন্য বেশি বেশি সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ুন, এবং আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমান। কোনো ফুকাহায়ে কেরামের কাছে প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত পরামর্শ নিন।
মহান আল্লাহ আপনাকে উত্তম পুরুষত্ব (চারিত্রিক শক্তি, ইমানের দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধ) দান করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
📚 রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারী, হাদিস: ৬৩৪২ (আল্লাহর কাছে সবকিছু চাওয়া)
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ৩৯৭৩ (জুতার ফিতা পর্যন্ত চাওয়া)
- রদ্দুল মুহতার, ইবনে আবেদীন, ১/৪৫০ (ওয়াসওয়াসা উপেক্ষার নির্দেশ)
- মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী (সূরা আল-ইমরান ৩:৩১-এর তাফসির)
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/৩৫০ (দোয়ার আদব ও তাওয়াক্কুল)