দীর্ঘমেয়াদী রোগ ও আর্থিক সংকটে নিকট আত্মীয় না সাহায্য করলেও আল্লাহ কেন দূরের এক ভাইকে নিয়মিত দানে উদার করেন?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، نبينا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد:
প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
আপনি দীর্ঘদিন ধরে দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) রোগে ভুগছেন, কাজ করতে অক্ষম, ওষুধের জন্য প্রতি মাসে ব্যয় হয়। নিকট আত্মীয়রা সহযোগিতা করে না, কিন্তু অনলাইনে পরিচিত এক অপরিচিত ভাই আপনার কথা শুনে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করে যাচ্ছেন। আপনি বুঝতে চাচ্ছেন—এতে আল্লাহর কী হিকমত (কারণ) থাকতে পারে এবং কেন আল্লাহ তাঁর মনকে আপনার প্রতি উদার করে দিয়েছেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তরের মূলনীতি:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সংকট থেকে) নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিযিক দান করেন। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ নিজ কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।”
(সূরা আত-তালাক: ২-৩)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে চান সীমাহীন রিযিক দেন, যাকে চান পরিমিত দেন (সূরা আল-ইসরা: ৩০)। কখনও তিনি রিযিক পৌঁছান এমন পথে, যা মানুষের ধারণার বাইরে। আপনার ক্ষেত্রে একজন দূরের মানুষ (যার সাথে রক্ত বা এলাকার সম্পর্ক নেই) নিয়মিত সাহায্য করছে—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর কুদরতের নিদর্শন। আপনি যাকে ‘দূরের মানুষ’ বলছেন, ইসলামী দৃষ্টিতে তিনি আপনার ‘দ্বীনি ভাই’ (ইসলামি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ)। তা পরস্পরের প্রতি দয়া-মমতা ও সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কেন আল্লাহ একজন অপরিচিতের মনকে আপনার প্রতি উদার করলেন?
১. আল্লাহর রিযিকের উৎস অজানা পথ থেকে আসে:
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“হে আদমসন্তান! তুমি আমার ইবাদতে একনিষ্ঠ হও, আমি তোমার অন্তরকে অমুখাপেক্ষী করে দেব এবং তোমার অভাব-অভিযোগ দূর করব। আর যদি তা না করো, তবে আমি তোমার হাত কর্মব্যস্ত রাখব এবং তোমার অভাব দূর করব না।”
(ইবনু মাজাহ, সহিহ ইবনু মাজাহ; আলবানি সহিহ বলেছেন)
হাদিসের অর্থ হলো, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও ইবাদতে মনোযোগ দিলে আল্লাহ এমন উৎস থেকে রিযিক দেবেন যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনার রোগ ও অসহায়ত্ব সত্ত্বেও আপনার তাওয়াক্কুলের কারণেই আল্লাহ এই ভাইয়ের মাধ্যমে রিযিক পৌঁছে দিচ্ছেন।
২. রোগ ও কষ্টের মাধ্যমে বান্দার পরীক্ষা এবং গুনাহ মাফ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মুসলিমের ওপর কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট, এমনকি কাঁটাবিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত নেই—যার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন না।”
(বুখারি, মুসলিম)
আপনার দীর্ঘস্থায়ী রোগ আপনার গুনাহ মাফের কারণ। আর আল্লাহ পরীক্ষাস্বরূপ নিকটজনদের সাহায্য সরিয়ে দিয়ে দূরের কাউকে দান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, যাতে আপনার ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা পরীক্ষিত হয় এবং আপনি বুঝতে পারেন যে, প্রকৃত আশ্রয়দাতা একমাত্র আল্লাহ।
৩. ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও দানের ফজিলত:
আপনার সাথে পরিচিত ওই ভাই হয়তো আপনার কথা শুনে বা আপনার অবস্থা জেনে আল্লাহর জন্য দান করছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুনিয়াবি দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তার আখিরাতের দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন।”
(মুসলিম)
ওই ভাই হয়তো এই সওয়াবের নিয়্যতে দান করছেন। তার দানের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা। একে আপনি অহেতুক সন্দেহ করবেন না, বরং তার জন্য দো‘আ করুন।
৪. আল্লাহর হিকমত (প্রজ্ঞা):
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: “আল্লাহ বান্দার জন্য যে রিযিক নির্ধারণ করেন, তা পৌঁছানোর মাধ্যম তিনি তৈরি করে দেন। কখনও নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে, কখনও অপরিচিতের মাধ্যমে, কখনও প্রত্যাশিত পথে, কখনও অপ্রত্যাশিত পথে। সবই তাঁর হিকমত ও রহমতের অংশ।” (মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ৮/৫৪২)
আপনার ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়রা সাহায্য না করা আল্লাহরই ইচ্ছা—হয়তো আপনার জন্য কল্যাণ, যেমন আপনার ধৈর্য বৃদ্ধি, অথবা তাদের জন্য পরীক্ষা, অথবা আপনার তাওয়াক্কুল সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর নিবদ্ধ করা—যাতে আপনি শুধু আল্লাহর কাছেই আশা রাখেন।
৫. দানের কারণ ও নিয়ত—আপনার কোনো সন্দেহের প্রয়োজন নেই:
আপনি ভাবছেন, “কেন সে আমাকে দান করে?”—এটি শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে, যাতে আপনি দানগ্রহণে সংকোচ বোধ করেন বা অকৃতজ্ঞ হন। বরং আপনার উচিত:
- আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা যে তিনি আপনার জন্য একজন দানশীল বান্দাকে পথ দেখিয়েছেন।
- ওই ভাইয়ের জন্য দো‘আ করা, যেন আল্লাহ তার এই দান কবুল করেন ও তাকে উত্তম প্রতিদান দেন।
- নিজের প্রতি কোনো হীনমন্যতা না পোষণ করা; বরং মনে রাখা, আপনি আল্লাহর মেহমান। তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।
উপসংহার ও নির্দেশনা:
আল্লাহর কাছে আপনি শুকরিয়া আদায় করুন, ধৈর্য ধরুন এবং দো‘আ করতে থাকুন। আপনি যা পাচ্ছেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত। আপনার রোগ—আপনার জন্য কল্যাণ। দূরের ভাইয়ের দান—আল্লাহর রহমতের বহিঃপ্রকাশ। শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: “বান্দা যখন দেখে যে, তার কাছে অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক আসছে, তখন সে যেন নিশ্চিত হয় যে, আল্লাহই রিযিকদাতা এবং তিনি তার ওপর দয়া করেছেন।” (শারহু রিয়াদিস সালিহিন, ১/৩২৮)
সুতরাং, এই ঘটনার শিক্ষা:
- আল্লাহ যাকে চান তার রিযিক সহজ পথে দেন।
- ইসলামি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রক্ত বা এলাকার সম্পর্কের চেয়েও মজবুত।
- বিপদে ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অপ্রত্যাশিত সাহায্যের কারণ।
- আপনার কর্তব্য: কৃতজ্ঞ হওয়া, ওই ভাইয়ের জন্য দো‘আ করা এবং দান গ্রহণে কোনো দ্বিধা না রাখা (যেহেতু তিনি স্বেচ্ছায় দিচ্ছেন)।
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ:
এতে কোনো হারাম সন্দেহ নেই যতক্ষণ পর্যন্ত দান বৈধ উৎস থেকে হয় এবং আপনার কোনো প্রকার অনৈতিক চুক্তি বা শর্ত না থাকে। আপনি শুধু নিজের অসুস্থতার জন্য দো‘আ করতে থাকুন এবং আল্লাহর কাছে আরোগ্য প্রার্থনা করুন।
والله أعلم بالصواب