সুদখোর প্রতিবেশীর দাওয়াত ও হারাম উপার্জনকারীর হাদিয়া গ্রহণের হুকুম।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1653
Questioner: Allah Ta'alar Banda
Question Asked: 15 Jun 2026, 02:07 PM
Reviewed & Published: 15 Jun 2026, 02:18 PM
Views: 41
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক ব্যক্তি ইবনে মাসউদ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমার এমন একজন প্রতিবেশী আছে যে সুদ খায়। সে যদি আমাকে খাবারের দাওয়াত দেয়, তবে আমি কি সেই দাওয়াতে যাব?"উত্তরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন:أَجِيبُوهُ؛ فَإِنَّمَا الْمَهْنَأُ لَكُمْ، وَالْوِزْرُ عَلَيْهِ"তোমরা তার দাওয়াত গ্রহণ করো (খাও)। কেননা এর সুস্বাদু বা আনন্দের অংশটুকু তোমাদের জন্য, আর এর পাপ বা গুনাহের দায়ভার তার ওপর বর্তাবে।"(সূত্র: আবদুর রাজ্জাক কর্তৃক 'আল-মুসান্নাফ' গ্রন্থে বর্ণিত এবং ইমাম বায়হাকী ও ইবনে আবী শায়বাহ্ এটি সংকলন করেছেন)

উক্ত ফাতওয়া কি শরিয়াহ অনুযায়ী গ্রহণ যোগ্য?
এবং এই ফাতওয়া এর আলোকে কেউ যদি এমন করো হাদিয়া, বা তার পক্ষ থেকে চিকিৎসা খরচ গ্রহণ করে যার মূল উপার্জন বিদেশের রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে চাকরিরত থাকেন যেখানে হারাম খাবার ও বিক্রি হয়, পাশাপাশি দেশে হালাল ব্যবসা ও আছে। তবে ব্যবসার আয় তুলনামূলক বিদেশের আয় থেকে অনেক টাই কম। তিনি মূলত পরিবারের সদস্য। এই অবস্থায় জায়েজ হবে? অর্থাৎ গুনাহ হবে না কোন?

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين

প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার:
প্রশ্নকারী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি ফাতওয়া উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি সুদখোর প্রতিবেশীর দাওয়াত গ্রহণ করতে বলেছেন এবং বলেছেন যে, খাবারের স্বাদ ও আনন্দের অংশ গ্রহণকারীর জন্য, আর পাপের বোঝা দাতার ওপর বর্তাবে। এখন প্রশ্ন হলো: এই ফাতওয়া কি শরীয়তসম্মত? এবং এর আলোকে, যদি কেউ এমন ব্যক্তির কাছ থেকে হাদিয়া বা চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণ করে, যার প্রধান উপার্জন বিদেশের একটি রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে কাজ করা, যেখানে হারাম খাবার বিক্রি হয়, এবং তার দেশে একটি ছোট হালাল ব্যবসাও আছে (তবে ব্যবসার আয় অনেক কম), তবে কি তা জায়েজ হবে? তিনি পরিবারের সদস্য।

উত্তর:

প্রথম অংশ: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ফাতওয়ার বিশ্লেষণ

হাদিসটি সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে (আবদুর রাজ্জাক, আল-মুসান্নাফ; ইবনে আবী শায়বাহ; বায়হাকী)। তবে এটি একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল যে, সুদখোর ব্যক্তি যদি নিজের হালাল সম্পদ থেকে (যা সুদের সাথে মিশ্রিত নয়) খাবার দেয়, তবে তা গ্রহণে দোষ নেই, কারণ পাপ তার। কিন্তু এটি একটি সাধারণ ও শর্তহীন অনুমতি নয়। বরং হানাফি ফিকহে এই বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে।

হানাফি মাজহাবের কিতাবসমূহে এসেছে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হারাম, তার দান-হাদিয়া গ্রহণ করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) এবং যদি সম্পদ সম্পূর্ণ হারাম হয়, তবে তা গ্রহণ করা হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪২)
  • ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন: “যে ব্যক্তি সুদ খায়, তার দাওয়াত গ্রহণ করা মাকরুহ, যদি না জানা যায় যে, খাবারটি তার হালাল মাল থেকে প্রস্তুত।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৬)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: “যদি দাতার অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তবে তার দান গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ তা গ্রহণকারীর জন্য অকল্যাণকর।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৪)
  • মুফতি তকি উসমানি (দা. বা.) বলেছেন: “ঐতিহাসিকভাবে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ফাতওয়াটি এমন একজন প্রতিবেশী সম্পর্কে ছিল, যার মালে সুদের অংশ ছিল নগণ্য এবং অধিকাংশই হালাল। তাই তা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২৫)

সুতরাং, ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ফাতওয়া সঠিক, কিন্তু এটি প্রতিটি অবস্থার জন্য প্রযোজ্য নয়। এটি তখনই প্রযোজ্য যখন দাতার সম্পদের অধিকাংশ হালাল এবং দানকৃত বস্তুটি নির্দিষ্টভাবে হালাল মাল থেকে হয়। কিন্তু যদি দাতার অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তবে এই ফাতওয়া প্রযোজ্য হবে না।

দ্বিতীয় অংশ: প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা

প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির অবস্থা:

  • তিনি বিদেশের একটি রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে কাজ করেন, যেখানে হারাম খাবার (যেমন: শুয়োরের মাংস, জবাইকৃত নয় এমন মুরগি/গরু, মদ ইত্যাদি) বিক্রি হয়। তার কাজ সরাসরি হারাম খাবার তৈরি ও পরিবেশনের সাথে জড়িত।
  • তিনি দেশে একটি হালাল ব্যবসা করেন, তবে তার আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
  • তিনি পরিবারের সদস্য (যেমন: পিতা, ভাই, চাচা ইত্যাদি)।

এ অবস্থায়:

➡️ তার প্রধান উপার্জন (শেফের বেতন) হারাম।
কারণ শেফ হিসেবে কাজ করে তিনি হারাম খাবার প্রস্তুত ও বিক্রিতে সহায়তা করছেন, যা নিজেই একটি বড় গুনাহ। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, এই ধরনের কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ হারাম। (আল-হিদায়া, ৪/৩৭৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৭)

➡️ তার হালাল ব্যবসার আয় তুলনামূলকভাবে নগণ্য।
ফলে তার মোট সম্পদের অধিকাংশ হারাম। হানাফি ফকিহগণ বলেছেন: যখন কোনো ব্যক্তির সম্পদের অধিকাংশ হারাম হয়, তখন তার কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা জায়েজ নয়, যদি না নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রদত্ত বস্তুটি হালাল মাল থেকে আসছে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২৭)

➡️ হাদিয়া বা চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণ:
এই ব্যক্তির কাছ থেকে হাদিয়া বা চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণ করা জায়েজ হবে না, কারণ অধিকাংশ সম্পদ হারাম থাকায়, এটি গ্রহণ করা মাকরুহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধের কাছাকাছি। বিশেষত, যদি তিনি হাদিয়া দেন, তবে তা তার হারাম উপার্জন থেকেই দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা wajib (আবশ্যক)। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৫; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ১৪/৩৬৭)

➡️ পরিবারের সদস্য হওয়ার প্রভাব:
পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে কোনো বিশেষ অনুমতি নেই। বরং পরিবারের সদস্য হওয়ায় দায়িত্ব হলো তাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং হারাম উপার্জন ত্যাগ করতে উৎসাহিত করা। তার কাছ থেকে গ্রহণ করলে তার গুনাহকে উৎসাহিত করা হবে। তাই গ্রহণ করা উচিত নয়। হ্যাঁ, যদি তিনি জীবিকার জন্য নিতান্তই অসহায় হন (যেমন: পিতা যদি একমাত্র উপার্জনক্ষম হন এবং তার সন্তানেরা না খেয়ে থাকে), তবে কোনো কোনো ফকিহ অনুমতি দিয়েছেন, তবে সে ক্ষেত্রেও শুধু প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করা যাবে এবং নিয়ত থাকবে যে, এটি তার হারাম সম্পদ নয় বরং প্রয়োজন পূরণের জন্য। কিন্তু এখানে প্রশ্নকারী নিজেই পরিবারের সদস্য, তিনি অসহায় বলে উল্লেখ নেই। তাই সাধারণত জায়েজ নয়। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, ৪/২৭৩০)

তৃতীয় অংশ: উপসংহার ও নির্দেশনা

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ফাতওয়া সঠিক, কিন্তু এটি তখনই প্রযোজ্য যখন দাতার সম্পদের অধিকাংশ হালাল এবং প্রদত্ত বস্তুটি হালাল মাল থেকে হয়। বর্তমান প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়, কারণ তার প্রধান উপার্জন হারাম এবং হালাল আয় নগণ্য।

সুতরাং, এই ব্যক্তির কাছ থেকে হাদিয়া বা চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণ করা জায়েজ নয়। বরং তাকে নসিহত করা উচিত যে, তিনি হারাম কাজ পরিত্যাগ করে কেবল হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট হন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিকের সন্ধান দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমীন।

রেফারেন্স সমূহ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ৬/৩৮৫-৩৮৬
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরী), ৫/৩৪২, ৫/৩৫৭
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি), ৪/২২৪-২২৫
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি), ২/৩২৫-৩২৮
  • আল-হিদায়া (মারগিনানী), ৪/৩৭৯
  • আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু (ড. যুহায়লী), ৪/২৭৩০

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.