দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কিন্তু আমাদের দেশে তো গণতন্ত্র চালু আছে। সেক্ষেত্রে মাঝে মাঝে অনেক কষ্ট লাগে। মনে হয় যে খিলাফত ব্যবস্থা থাকলে কতই না উত্তম হতো
এমতাবস্থায় আসলে একজন সাধারণ মুমিন মুসলিম হিসেবে করণীয় কী?আমি জানি আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইবাদত। খেলাফত আসলে আসল না আসলে নাই।
কিন্তু এক্ষেত্রে কি কোন চেষ্টা মেহনতের প্রয়োজন আছে কিনা? থাকলে সেগুলো কী কী?
Answer
ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়
প্রশ্ন: আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে। একজন মুসলিম হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কী করণীয়?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার অনুভূতি অত্যন্ত সঠিক ও প্রশংসনীয়। একজন মুসলিম হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থার প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা থাকা ঈমানের দাবি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয় সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা নিম্নরূপ:
খিলাফতের গুরুত্ব
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমার পরে খিলাফত ত্রিশ বছর স্থায়ী থাকবে। তারপর হবে রাজতন্ত্র।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২২২৬)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও হানাফী ফুকাহায়ে কেরাম খিলাফত প্রতিষ্ঠাকে ফরযে কিফায়া হিসেবে গণ্য করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির জন্য সরাসরি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে লিপ্ত হওয়া ফরয।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়
আপনি সঠিকভাবে বলেছেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ইবাদত। তবে শাসনব্যবস্থা ইবাদতের পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যম। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) তার কিতাব "আল-খারাজ"-এ উল্লেখ করেছেন যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ফরযে কিফায়া আদায়ের জন্য ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন।
বর্তমানে আপনি যা করতে পারেন:
১. দ্বীনী শিক্ষা অর্জন ও প্রচার: ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেছেন, সমাজ সংস্কারের মূল ভিত্তি হলো দ্বীনী শিক্ষা। আপনি নিজে দ্বীন শিখুন ও অন্যদের শেখান।
২. ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা: সাধ্যমতো ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করুন। ছোট পরিসরে হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা খিলাফতের মূল চেতনা।
৩. যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব নির্বাচনে সচেষ্ট হওয়া: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার ব্যবহার করে যতদূর সম্ভব সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রচেষ্টা করা জায়েয। হানাফী ফিকহের কিতাব "আল-হিদায়া"-তে বলা হয়েছে, শাসকের মূল শর্ত হলো ন্যায়পরায়ণতা ও যোগ্যতা।
৪. দুর্নীতি ও অনাচারের প্রতিরোধ: সাধ্যমতো সামাজিক দুর্নীতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।
৫. দোয়া ও তাওবা: উম্মতের শাসনব্যবস্থার সংশোধনের জন্য দোয়া করা। হাদীসে এসেছে, "দুআ হল ইবাদত।" (সুনানে আবু দাউদ)
৬. নিরর্থক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভেদ এড়িয়ে চলা: বর্তমানে সরাসরি খিলাফত প্রতিষ্ঠার শারঈ পদ্ধতি না থাকায় অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও সংঘর্ষে জড়ানো উচিত নয়। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন, "বর্তমানে বিভেদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।"
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, "খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ ও শর্ত। জোর করে বা সহিংস পথে তা প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। বরং ব্যক্তি সমাজকে দ্বীনী শিক্ষায় সমৃদ্ধ করতে হবে।"
ইমাম শাতিবী (রহ.) বলেছেন, "শাসনব্যবস্থার সংশোধন ধীরে ধীরে শিক্ষা ও নৈতিকতার মাধ্যমে হয়, সহিংসতার মাধ্যমে নয়।"
উপসংহার
আপনার আকাঙ্ক্ষা সঠিক, কিন্তু বর্তমানে প্রধান করণীয় হলো নিজেকে এবং পরিবারকে ইসলামী শিক্ষায় সমৃদ্ধ করা, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইবাদতে মনোনিবেশ করা। খিলাফত মাধ্যম, মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
والله أعلم بالصواب