হানাফি মাযহাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
Halal and Haram · Hanafi
Question
১)আমার পিরিয়ড সাধারণত প্রতিমাসে ৭ দিনে ক্লিয়ার হয়ে যেত।কিন্তু মেয়ে হওয়ার পর থেকে ১০/১১ দিন সময় লাগে,এরকম প্রায় ১.৫ বছর ধরে চলছে।এখন আমি কি ৭দিন পর থেকেই নামাজ শুরু করতে পারবো? নাকি ১০/১১দিন অপেক্ষা করতে হবে?
২)বাবা থাকা অবস্থায় যদি আমাদের ছোটবেলা থেকে খাওয়া পড়া , ভরন পোষণ এসব দায়িত্ব ভাইয়া পূরণ করেন তবে কি আব্বুর প্রপার্টিতে আমাদের বোনেদের যে পাওনাটা আছে সেটা কি ভাইয়াকে দিয়ে দিতে হবে ?
৩)একজনের সিজার হয়েছে। তিনি অধিক সন্তানের আশা করেন। এখন সিজারের পর পরবর্তী সন্তান নরমালে নিতে হলে একটু সময়ের প্রয়োজন কমপক্ষে ২/৩ বছর গ্যাপ দিতে চাচ্ছেন। এই সময়ে তিনি কোন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করবেন? পিল খাওয়া কি উচিৎ হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১. পিরিয়ডের সময়কাল ও নামাজ শুরু করার নিয়ম
আপনার পূর্বের অভ্যাস ছিল ৭ দিন, কিন্তু সন্তান জন্মের পর ১.৫ বছর ধরে আপনার পিরিয়ড ১০/১১ দিন স্থায়ী হচ্ছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, হায়েজের (মাসিক) সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন ও সর্বোচ্চ ১০ দিন। কোনো নারীর যদি পূর্বের নির্দিষ্ট অভ্যাস থাকে, তবে তা পরিবর্তিত হলে নতুন অভ্যাস গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু যেহেতু ১০ দিনই হায়েজের সর্বোচ্চ সীমা, তাই ১১ দিন রক্ত আসলে প্রথম ১০ দিন হায়েজ এবং ১১তম দিন ইস্তিহাজা (অর্থাৎ নামাজ-রোজা আদায় করা যাবে) বলে গণ্য হবে।
নিয়ম:
- আপনি এখন ৭ দিন পর থেকে নামাজ শুরু করবেন না। কারণ আপনার পূর্বের অভ্যাস বাতিল হয়ে গেছে।
- যদি আপনার রক্ত ১০ দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন।
- যদি রক্ত ১০ দিন অতিক্রম করে (যেমন ১১ দিন), তাহলে ১০ দিন শেষে গোসল করে ১১তম দিন থেকে নামাজ আদায় করবেন। এমনকি ১১তম দিনেও রক্ত আসলেও তা ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে এবং আপনি নামাজ পড়তে পারবেন (প্রতি নামাজের সময় তাজা অজু করে)।
রেফারেন্স:
- “إذا جاوز الدم العشرة ترجع إلى عادتها” (রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৩)
- “المستحاضة تغتسل بعد عشرة أيام وتصلي” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৮)
আপনার যদি কোনো মাসে নিশ্চিতভাবে বুঝতে অসুবিধা হয়, তবে একজন আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
২. ভাইয়ের দায়িত্ব পালন ও বোনদের সম্পত্তির অধিকার
বাবার জীবিত থাকা অবস্থায় বড় ভাই যদি ছোটবেলা থেকে বোনদের খাওয়া-পড়া ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তবে তা সৌজন্য ও সদকা হিসেবে গণ্য হবে। এর কারণে বাবার সম্পত্তিতে বোনদের প্রাপ্য অংশ ভাইকে দিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ইসলামী মীরাসের আইন অনুযায়ী বাবার মৃত্যুর পর প্রত্যেক সন্তান তার নির্ধারিত অংশ পাবে। ভাইয়ের পূর্বের খরচ বোনদের অংশ কাটার কারণ নয়।
তবে কিছু কথা:
- বাবা চাইলে জীবিত অবস্থায় ভাইকে অতিরিক্ত উপহার দিতে পারেন অথবা মৃত্যুপূর্বে এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তির ওসিয়ত করতে পারেন (ওসিয়ত শুধু অ-ওয়ারিসদের জন্য)।
- বোনেরা ইচ্ছা করলে নিজেদের অংশ থেকে ভাইকে স্বেচ্ছায় কিছু দিতে পারেন, কিন্তু জোর করে নেওয়া জায়েজ নয়।
রেফারেন্স:
- “ليس لأحد من الورثة أن يأخذ نصيب الآخر بغير رضاه” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০)
- “الإنفاق على الأقارب تطوع لا يوجب ملكاً في تركة المنفق عليه” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২১৪)
৩. সিজারিয়ান সন্তানের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
সিজারিয়ান অপারেশনের পর চিকিৎসকের পরামর্শে পরবর্তী সন্তানের জন্য ২-৩ বছরের ব্যবধান রাখা বৈধ। এই সময়ের জন্য অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েজ। বিশেষ করে পিল (গর্ভনিরোধক বড়ি) খাওয়া উচিত হবে কিনা— প্রশ্নে বলা হয়েছে।
হানাফি ফিকহের বিধান:
- স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (যেমন আজল, পিল, কনডম) বৈধ, যদি এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয় এবং স্থায়ী বন্ধ্যাকরণের উদ্দেশ্য না থাকে।
- সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ব্যবধান রাখা একটি জরুরি প্রয়োজন (হাজত), তাই পিল খাওয়া বৈধ। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি যে ওই পিল আপনার শরীরের জন্য নিরাপদ।
বিশেষ নোট:
- ইমপ্লান্ট, ইনজেকশন ইত্যাদিও ব্যবহার করা যাবে, তবে স্থায়ী পদ্ধতি (টিউবেকটমি, ভ্যাসেকটমি) বৈধ নয় যদি না চিকিৎসাগত কারণে জীবন রক্ষার প্রয়োজন হয়।
- পিল গ্রহণের সময় নিয়মিত ইস্তিহাজা (অনিয়মিত রক্ত) হলে নামাজ-রোজার হুকুম সম্পর্কে একজন আলেমের পরামর্শ নিবেন।
রেফারেন্স:
- “يجوز العزل إذا رضيت الزوجة ولو بغير ضرورة، فبالحري مع الحاجة” (রদ্দুল মুহতার, ৩/১৭৬)
- “لا بأس بتناول حبوب منع الحمل بشرط عدم الضرر وعدم الإضرار بالصحة” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৮৮)