বাসায় পর্দার হুকুম—ভাইয়ের স্ত্রী, সৎ মেয়ে ও ভাইঝির সাথে পর্দা লঙ্ঘন হলে কী করণীয়?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1620
Questioner: TBB
Question Asked: 14 Jun 2026, 03:53 PM
Reviewed & Published: 14 Jun 2026, 03:59 PM
Views: 62
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমি (২৭ বছরের ছেলে) বর্তমানে যেখানে থাকি, সেখানে আমার মা, বড় ভাই এর স্ত্রী, সেই স্ত্রীর পূর্ব সংসার এর একজন সদ্য বালেগ মেয়ে সন্তান এবং আমার ভাই এর পূর্ববর্তী বিবাহের ২ জন মেয়ে সন্তান আছে। বড় ভাই অধিকাংশ সময় দেশের বাইরে থাকেন।
ভাই এর স্ত্রী বাসায় পর্দার বিধান মানেন না, আমি নিজে চেষ্টা করি কিন্তু উনি এরপর ও প্রয়োজনে বিভিন্ন কথা বার্তা বলেন, বাড়িতে পর্দা লঙ্ঘন করেই থাকেন। আমি কি করতে পারি?
যদি পরিবারের সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া বা অন্য কিছু করা হয় সেখানে আমার করনীয় কি? আমরা কি আযাব এর সম্মুখীন ক
হচ্ছি?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে পর্দার হুকুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে হানাফি মাযহাব ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১. পর্দার বিধান ও মাহরাম-নন মাহরামের পরিচয়

কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا (সূরা নূর: ৩১)

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ (সূরা আহযাব: ৫৯)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ (متفق عليه)

لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ (ترمذي)

আপনার পরিবারের নারীদের সাথে আপনার সম্পর্ক নির্ণয়:

  • বড় ভাইয়ের স্ত্রী: আপনার জন্য নন-মাহরাম। ভাইয়ের স্ত্রী মাহরাম নয়; বরং দেবর ও ভাবির মধ্যে শরয়ি পর্দা ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার ৯/৫২৫, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩২৮)
  • ভাইয়ের স্ত্রীর পূর্ব সংসারের মেয়ে (সদ্য বালেগ): আপনার সাথে তার কোনো রক্তসম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্ক নেই, তাই সে সম্পূর্ণ বেগানা (নন-মাহরাম)। তার সাথে পর্দা ফরজ।
  • বড় ভাইয়ের পূর্ব বিবাহের মেয়ে (ভাইঝি): এরা আপনার জন্য মাহরাম। ভাইয়ের মেয়ে আপনার ভাইঝি, তাই তার সাথে পর্দা ফরজ নয়—তবে শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক।

২. ভাইয়ের স্ত্রী পর্দা না মানলে আপনার করণীয়

আপনি যেহেতু ২৭ বছরের যুবক এবং পরিবারের সদস্য, তাই আপনার দায়িত্ব হলো নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা:

ক. নরম ভাষায় বোঝানো ও উপদেশ দেওয়া

আল্লাহ বলেন:

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا (طه: ৪৪)

সুযোগ মতো ভাইয়ের স্ত্রীকে পর্দার গুরুত্ব বোঝান—তবে একান্তে, পরিবারের অন্যদের (যেমন মা) উপস্থিতিতে। হাদিসের আলোকে দলিল পেশ করুন। যদি তিনি শোনেন, তবে ভাল; না শুনলে আপনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

খ. নিজে পর্দা রক্ষা করা

আপনার জন্য ফরজ হলো:

  • নিজের দৃষ্টি নিচু রাখা। যখনই ভাইয়ের স্ত্রী বা তার মেয়েকে দেখবেন, দৃষ্টি সরিয়ে নিন।
  • একাকী অবস্থান ও কথা বলা থেকে বিরত থাকা। প্রয়োজনে মা বা অন্য কোনো মাহরাম মহিলার উপস্থিতিতে কথা বলুন।
  • বাসার ভেতরে নিজের ঘরে অবস্থান করা এবং অপ্রয়োজনে তাদের সামনে না আসা।
  • পোশাক-আশাকে শরয়ি পর্দা মেনে চলা (আপনার জন্য পুরুষের সতর ঢাকা ও দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ)।

রাসূল ﷺ বলেছেন: لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ – কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে থাকবে না। (বুখারি, মুসলিম)

গ. মা ও বড় ভাইকে জানানো

আপনার মা যেহেতু বড়, তাকে বিষয়টি বোঝান। মা যদি ভাইয়ের স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেন, তা অধিক কার্যকর হতে পারে। এছাড়া বড় ভাই দেশে এলে তাকে সরাসরি জানান। ভাই তার স্ত্রীকে পর্দার বিধান বোঝাতে পারেন।

ঘ. অন্য ব্যবস্থা গ্রহণ

যদি কোনোভাবেই শোনেন না এবং পর্দা লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তাহলে আপনি আলাদা থাকার ব্যবস্থা করুন; যদি সম্ভব হয়, নিজের ঘরে। অথবা পরিবারের অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে চলে যান। ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: পর্দা ফরজ; কেউ মানতে না চাইলে নিজেকে রক্ষা করা মুমিনের দায়িত্ব। (রদ্দুল মুহতার ১/৪০৬)


৩. পরিবারের সবার সাথে ঘুরতে যাওয়া বা একত্রে কোথাও যাওয়া

সবাই মিলে কোথাও যাওয়া—যেখানে নন-মাহরাম নারী-পুরুষ একসাথে থাকেন এবং পর্দা রক্ষিত হয় না—সেখানে আপনার জন্য শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে:

  • **আপনার জন্য অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়,

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত: যখন গুনাহগারির আশঙ্কা থাকে, তখন দূরে থাকা ওয়াজিব। (আল-বাহরুর রায়েক ৫/২৪৮)


৪. আযাবের সম্মুখীন হওয়া প্রসঙ্গে

হ্যাঁ, পর্দা না মানা একটি কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন:

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ (সূরা আল-মুমিনুন: ৩)

যারা পর্দা মানে না, তারা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছে। তবে আপনি যদি নিজে পর্দা রক্ষা করেন এবং যথাসাধ্য অন্যদের বোঝান, তাহলে আপনি গুনাহ থেকে বাঁচবেন এবং আল্লাহর কাছে সওয়াব পাবেন। রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ (مسلم)

"তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো মুনকার (অসৎ কাজ) দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; যদি না পারে তবে মুখে; যদি না পারে তবে মনে; আর এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।"

আপনি যদি নীরব থাকেন এবং পর্দা লঙ্ঘনে অংশ নেন বা তা মেনে নেন, তাহলে আপনিও আযাবের সম্মুখীন হতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি নিজে পর্দা মেনে চলেন এবং তাদের ভুল ধরা দেন, তবে আপনি দায়মুক্ত।


৫. কিছু গুরুত্বপূর্ণ হানাফি ফিকহি রেফারেন্স

  • রদ্দুল মুহতার (শামী): পর্দা ও মাহরাম-নন মাহরাম সম্পর্কিত বিস্তারিত।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): পর্দা ও নন মাহরামদের সাথে আচরণ।
  • বাহিশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): পর্দার হুকুম অধ্যায়।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শাফি): পর্দা সংক্রান্ত ফতোয়া।
  • উসুলুশ শাশি: পর্দার দলিল ও হুকুম।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "পর্দা শুধু নারীর জন্যই নয়, পুরুষেরও দৃষ্টি হেফাজত করা ফরজ।"

মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) বলেন: "দেবর-ভাবির মধ্যে পর্দা ওয়াজিব; একান্তে কথা বলা, দেখা বা স্পর্শ করা জায়েজ নয়।"


৬. আপনার জন্য সুপারিশ

  1. আল্লাহর কাছে তাওবা ও দোয়া করুন, যেন আপনার পরিবার পর্দার গুরুত্ব বুঝে।
  2. ধৈর্য ও হিকমতের সাথে বোঝান। রাগ বা তর্ক নয়, বরং স্নেহ ও দলিল দিয়ে উপদেশ দিন।
  3. নিজে সম্পূর্ণ পর্দা মেনে চলুন। আপনার দৃষ্টি, ব্যবহার ও ভাষা যেন নন-মাহরামদের প্রতি শুদ্ধ হয়।
  4. ভাইয়ের আগমনে তাকে অবহিত করুন। ভাইয়ের দায়িত্ব তার স্ত্রী ও সন্তানদের পর্দা শিক্ষা দেওয়া।
  5. যদি পর্দা লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে এবং আপনার ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি সেখানে না থাকার ব্যবস্থা করুন। নবী ﷺ বলেছেন: المرء على دين خليله (আবু দাউদ) – অর্থাৎ মানুষ তার বন্ধুর ধর্মে থাকে; সুতরাং ভালো পরিবেশ বেছে নিন।

সারসংক্ষেপ:

  • ভাইয়ের স্ত্রী ও তার পূর্ব সংসারের মেয়ে আপনার জন্য নন-মাহরাম; তাদের সাথে পর্দা ফরজ।
  • আপনি নরমভাবে বোঝান, নিজে পর্দা রক্ষা করুন এবং ভাইকে জানান।
  • পর্দা লঙ্ঘন হওয়া অবস্থায় ঘুরতে যাওয়া বা মেলামেশা আপনার জন্য জায়েজ নয়।
  • আযাব তো হচ্ছেই, তবে আপনি নিজে আমল ঠিক রাখলে আল্লাহর রহমত আশা করতে পারেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান পালনের তওফিক দান করুন। আমিন।

(والله أعلم بالصواب)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.