টাকা ধার দিয়ে বাৎসরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান বা ধানের টাকা নেওয়া কি সুদ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: হ্যাঁ, টাকা ধার দেওয়ার বিনিময়ে বাৎসরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান বা ধানের টাকা নেওয়া সুদের অন্তর্ভুক্ত। এটি স্পষ্ট সূদ (রিবা) এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।
কেন এটি সুদ?
ইসলামী শরিয়তে সুদের সংজ্ঞা হলো: ঋণের ওপর কোনো বাড়তি শর্ত আরোপ করা বা নির্দিষ্ট কোনো লাভ/ফায়দা নেওয়া।
যখন কেউ টাকা ধার দেয় এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান (বা তার টাকা) নেওয়ার শর্ত করে, তখন এটি ঋণের ওপর বাড়তি লাভ নেওয়ার শামিল, যা সুদ ছাড়া আর কিছুই নয়।
কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে:
কুরআন:
﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾
"অথচ আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
হাদিস:
"প্রত্যেক ঋণ যে লাভ টেনে আনে, তা সুদ।" (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস: ২১৮২৯; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)
এটি ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি।
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহের বক্তব্য:
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ৫/১৬৩-১৬৪:
"যদি কেউ কাউকে কিছু ঋণ দেয় এবং শর্ত করে যে সে তাকে হাদিয়া দেবে বা তার বাড়িতে খাবে বা কোনো উপকার করবে, তাহলে তা নাজায়েজ এবং সুদ হবে।" -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) – ৩/২১৯:
"ঋণদাতা যদি ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে কোনো উপকার নেওয়ার শর্ত করে, যেমন: তার বাড়িতে বসবাস করা, তার বাহনে চড়া, বা কোনো জিনিস কিনে দেওয়া ইত্যাদি, তাহলে তা সুদ হবে এবং হারাম।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী) – ৪/৩১৩:
"টাকা ধার দিয়ে তার বিনিময়ে কোনো মাল বা লাভ নির্ধারণ করা সুদ।" -
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানি) – ২/৩০৯:
"বর্তমান যুগে টাকা ধার দিয়ে বাৎসরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান বা তার মূল্য নেওয়া নিঃসন্দেহে রিবা।"
বিশেষ নোট:
- ধান বা টাকা—উভয়ই সুদ: আপনি যদি টাকা ধার দেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান নেন, তাহলে সেটাও সুদ। কারণ ধানের পরিমাণ নির্ধারিত এবং এটি ঋণের অতিরিক্ত।
- ব্যবসার নামে চালানো যাবে না: অনেকেই একে 'ব্যবসা' বা 'লাভ-লোকসানের অংশীদারি' বলে চালাতে চান, কিন্তু যেহেতু এখানে কোনো প্রকৃত ব্যবসা বা অংশীদারি নেই (যেখানে লোকসানের ঝুঁকি থাকা আবশ্যক), তাই এটি সুদ ছাড়া কিছু নয়।
- কৃষি ঋণের বিকল্প: যদি কোনো কৃষককে সাহায্য করতে চান, তাহলে পারেন:
- মুদারাবা (শেয়ারক্রপিং): জমিতে অংশীদারি করে লাভ-লোকসান ভাগ করে নেওয়া।
- মুরাবাহা: পণ্য ক্রয় করে নির্দিষ্ট মুনাফা রেখে কিস্তিতে বিক্রি করা (সুদমুক্ত)।
- ঋণে কোনো বাড়তি শর্ত না দেয়া: শুধু মূল টাকা ফেরত নেওয়া।
উপসংহার:
প্রশ্নে বর্ণিত লেনদেন (টাকা ধার দিয়ে বাৎসরিক নির্দিষ্ট ধান বা তার মূল্য নেওয়া) সুদের আওতাভুক্ত এবং হারাম। মুসলমানদের জন্য এটি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ﴾
"আর যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই; তোমরা কারো প্রতি অত্যাচার করবে না এবং কারো কাছ থেকে অত্যাচারিত হবে না।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৯)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুদ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন।
(والله أعلم بالصواب)