এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলা জায়েজ হবে কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
যৌথ পরিবারে থাকলে আমাদের দ্বীনপালন বিষয়ক বেশকিছু সমস্যা হচ্ছে বলে আমার স্বামী ও আমি আলাদা হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছি। আলাদা বাসা নিয়ে থাকলে আমি আমার সহশিক্ষার পড়াশোনাও ছেড়ে দিতে পারব এবং উনারা এবিষয়ে আমাদের সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতে পারবেন না।
এইমাসেই আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। আমি এই সেমিস্টারের ক্লাস, মিডটার্ম পরীক্ষা কিছুই দেইনি, শুধু পরিবারে দেখানোর জন্য কিছুদিন ভার্সিটি যাওয়া হয়েছে এবং মেয়েদের কমন রুমে অবস্থান করেছি যেন ফ্রিমিক্সিং থেকে দূরে থাকতে পারি। ক্লাস, মিডটার্ম পরীক্ষা এগুলো তো কোনোভাবে পার করেছি কিন্তু সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা যদি না দেই, উনারা বিষয়টা জানলে অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, পরীক্ষার আগেই আমরা আলাদা হয়ে যাব এবং আমার সহশিক্ষায় পরীক্ষাটা দেয়া লাগবে না। কিন্তু কিছু সমস্যার জন্য পরীক্ষার আগেই আলাদা হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
আমি সহশিক্ষার পরিবেশে একদমই ফিরে যেতে চাচ্ছি না। এক্ষেত্রে আমাদের একটা উপায় হাতে আছে যে, আমি পরিবারে দেখানোর জন্য ভার্সিটি যাব কিন্তু পরীক্ষা দিব না বরং মেয়েদের কমন রুমে অবস্থান করব ও অন্য গুরত্বপূর্ণ কাজ করব। তাহলে আমার ফ্রিমিক্সিং এ যাওয়া লাগবে না। আর বাসায় জানবে যে পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। কিন্তু উনারা পরীক্ষাবিষয়ক কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার মিথ্যা বলা লাগবে।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমার কি সহশিক্ষার পরিবেশে পরীক্ষাটা না দেয়ার জন্য বাসায় মিথ্যা বলা বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর দেয়া কি জায়েজ হবে? নাকি আমার জন্য বাসায় মিথ্যা কথা না বলে বরং পরীক্ষাটাই এটেন্ড করা উচিত?
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
প্রিয় জিজ্ঞাসিকা,
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্বীনদারি ও পারিবারিক সম্পর্ক উভয়ের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে। আপনি সহশিক্ষার (ফ্রি-মিক্সিং) পরিবেশে ইমতেহান না দিয়ে ঘরে মিথ্যা বলার বৈধতা জানতে চেয়েছেন। নিম্নে হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. মিথ্যা বলার মূল হুকুম
ইসলামে মিথ্যা বলা সাধারণত হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদীসে মিথ্যা বলার কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন:
- সূরা আল-হাজ্জ (২২:৩০): "...তোমরা মিথ্যা কথা (এর অপবাদ) থেকে দূরে থাকো।"
- হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমরা অবশ্যই সত্যবাদী হবে, কেননা সত্য কল্যাণের পথ দেখায়, আর কল্যাণ জান্নাতের পথ দেখায়। আর মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা মিথ্যা পাপের পথ দেখায়, আর পাপ জাহান্নামের পথ দেখায়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬০৯৪)
২. মিথ্যার অনুমোদিত অবস্থা
হানাফী ফিকহে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়েয করা হয়েছে:
- যুদ্ধের সময় (শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য)।
- দু’জন মুসলিমের মধ্যে মীমাংসা করানোর জন্য (সুধ-সাফাই করা)।
- স্ত্রী-স্বামীর সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য (পরস্পর ভালোবাসা বাড়ানোর জন্য কিছু বললে দোষ নেই)। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬০৩; রদ্দুল মুহতার, ৪/৪১৬)
এছাড়াও তাওরিয়া (অর্থাৎ এমন কথা বলা যা শুনতে এক রকম কিন্তু বলা উদ্দেশ্য ভিন্ন) জায়েয বলে ইমামগণ উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সরাসরি মিথ্যা না বলে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উত্তর দেওয়া বৈধ। (আল-হিদায়া, ২/২০৮; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৫০)
৩. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা
আপনি দ্বীন রক্ষার্থে সহশিক্ষার পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে চান, যা প্রশংসনীয় ইচ্ছা। কিন্তু এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
ক. মিথ্যা বলার প্রয়োজনীয়তা:
- আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি ও বাবা-মা আপনাকে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করছেন। আপনি সরাসরি তাদের অবগত কররে বড় ঝামেলা হতে পারে।
- আপনারা আলাদা হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু বর্তমানে সেটা সম্ভব নয়।
- এই অবস্থায় আপনি পরীক্ষা না দিয়ে বাসায় সরাসরি মিথ্যা বললে তা জায়েয হবে না। কারণ এটি উপরে বর্ণিত অনুমোদিত তিনটি ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত নয়।
খ. তাওরিয়া করা: আপনি যদি বাসায় কাউকে বলেন যে, "আমি ভার্সিটিতে যাচ্ছি" (যা সত্য, কারণ আপনি মেয়েদের কমনরুমে অবস্থান করবেন), কিন্তু পরীক্ষার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে আপনি তাওরিয়া (ঘুরিয়ে) উত্তর দিতে পারেন। যেমন:
- যদি প্রশ্ন করা হয়, "পরীক্ষা দিয়েছ কি?" আপনি বলতে পারেন, "আমি ভার্সিটি গিয়েছিলাম" বা "সব ব্যবস্থাই ছিল"।
- এখানে আপনি সরাসরি মিথ্যা বলছেন না; বরং আপনার কথা থেকে তারা হয়তো বুঝবে যে আপনি পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু আপনি তা বলছেন না। এটি তাওরিয়া বলে গণ্য হবে এবং জায়েয।
গ. দ্বীনি মেয়াদ: আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় ফ্রি-মিক্সিং থেকে বেঁচে থাকা এবং দ্বীন রক্ষা করা, তাহলে আপনি বাসায় সত্য গোপন (কিতমান) করতে পারেন, যেখানে সরাসরি মিথ্যা বলার প্রয়োজন হবে না। যেমন:
- পরীক্ষার দিন আপনি বলবেন, "আমি ভার্সিটি যাচ্ছি" (যা সত্য)।
- পরীক্ষার পর কেউ জিজ্ঞাসা করলে, আপনি বলতে পারেন, "আজ ভালো হয়নি" বা "পড়াশোনা হয়নি" — এটি মিথ্যা নয়, বরং অস্পষ্ট উত্তর।
৪. পরীক্ষার দিন করণীয়
আপনি ইতোমধ্যেই সেমিস্টারের ক্লাস ও মিডটার্ম শেষ করেছেন। বর্তমানে শুধু ফাইনাল পরীক্ষা বাকি। নিম্নোক্ত উপায়গুলো বিবেচনা করতে পারেন:
-
পরীক্ষা দিন কিন্তু ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে চলুন:
আপনি যদি পরীক্ষার সময় সহশিক্ষা এড়িয়ে যেতে চান, তাহলে মেয়েদের আলাদা রুমে বসার অনুমতি চান (অনেক ভার্সিটিতে বুক ব্যাংক বা লাইব্রেরি আলাদা থাকে)। এতে করে ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব।- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন, "যদি কোনো নারীর জন্য বাইরে বের হওয়া ফিতনার কারণ হয়, তবে তার জন্য ঘরে থাকা উত্তম। কিন্তু যদি বাধ্যতামূলকভাবে বের হতেই হয়, তবে যতটুকু সম্ভব ফিতনা থেকে বেঁচে থাকবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৪)
-
পরীক্ষা না দিয়ে তাওরিয়া করা:
আপনি যদি ফাইনাল পরীক্ষা না দিতে চান এবং বাসায় কাউকে সরাসরি না বলতে চান, তাহলে তাওরিয়া ব্যবহার করতে পারেন। যেমন:- বাসায় বলুন, "আমি পরীক্ষার জন্য ভার্সিটি যাচ্ছি" — এটি গুনাহ নয়, কারণ আপনি পরীক্ষার নিয়তে যাচ্ছেন (যদিও শেষ পর্যন্ত সে রুমে বসবেন না)।
- কেউ জিজ্ঞাসা করলে "পরীক্ষা কেমন হলো?" — উত্তর দিন, "ভালো নয়" বা "আরো পড়া দরকার" — এটি মিথ্যা নয়, বরং আপনার অবস্থা প্রকাশ করে।
৫. ইমামগণের মতামত
- ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.) বলেছেন, "মিথ্যা বলা জায়েয নয়, তবে যদি কেউ নিজেকে বা অন্যকে ফিতনা থেকে রক্ষা করতে চায়, তাহলে সে তাওরিয়া করতে পারে।" (শারহু মাআনিল আসার, ৪/২৮)
- মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.) বলেছেন, "গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা ছাড়া অন্য কোনো উপায় না থাকলে তাওরিয়া জায়েয, তবে সরাসরি মিথ্যা কখনো জায়েয নয়।" (মাআরিফুল কুরআন, ৮/২৯৫)
- মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন, "যেখানে সরাসরি বললে ফিতনা বা অশান্তি হবে, সেখানে তাওরিয়া বা কিতমান (গোপন) করা জায়েয।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৫০)
৬. সতর্কতা ও পরামর্শ
- সরাসরি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। হাদীসে এসেছে, "মিথ্যা বলার কারণে মানুষ ফাসিক হিসেবে গণ্য হয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬০৭)
- বাসায় দ্বীনি ব্যাখ্যা দিন: আপনি ও আপনার স্বামী একমত হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি ও বাবা-মাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সহশিক্ষার ক্ষতি বোঝানোর চেষ্টা করুন। দেখা যেতে পারে তারা বুঝবেন।
- আলাদা হওয়ার পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করুন: আপনারা আলাদা বাসা নিতে চাচ্ছেন, এটি উত্তম সিদ্ধান্ত। দ্রুত ব্যবস্থা নিন যাতে দ্বীনি কাজ সহজ হয়।
- পরীক্ষা দেওয়ার বিকল্প: যদি পরীক্ষা দেওয়াই বাধ্যতামূলক হয়, তবে ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে পরীক্ষা দিন। আপনার জন্য শুধু পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যন্ত যাওয়া জায়েয হবে, যদি সেখানে ফিতনা এড়ানো সম্ভব হয়।
৭. চূড়ান্ত ফতোয়া
আপনার জন্য সরাসরি মিথ্যা বলা জায়েয নয়। কিন্তু তাওরিয়া (ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উত্তর দেওয়া) জায়েয আছে, বিশেষ করে যখন আপনি দ্বীন সংশ্লিষ্ট ফিতনা থেকে বাঁচতে চান এবং পরিবারে অশান্তি এড়াতে চান। আপনি নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
- বাসায় বলুন, "আমি ভার্সিটি যাই পরীক্ষার জন্য" — এটি সত্য।
- পরীক্ষার পর কেউ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দিন, "পরীক্ষা করেছি" — না বলে বরং বলুন, "সেখানে গিয়েছিলাম" বা "ব্যবস্থা ছিল ভালো" — এগুলো তাওরিয়া।
তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যে, আপনার নিয়ত যেন দ্বীন রক্ষা ও ফিতনা থেকে বাঁচার হয়, পরিবারকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য না হয়। আল্লাহ নিয়ত দেখেন।
অবশেষে, আপনার দ্বীনদারি দেখে আমরা খুব খুশি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। সহশিক্ষার পরিবেশ থেকে দূরে থাকার জন্য আপনার সংগ্রাম সঠিক পথ। যতদ্রুত সম্ভব আলাদা বাসার ব্যবস্থা করুন এবং দ্বীনি পরিবেশে বসবাস করতে চেষ্টা করুন।
والله أعلم بالصواب