মিশ্র আয় থেকে চিকিৎসা নেওয়া।
Halal and Haram · Hanafi
Question
কেউ যদি বিদেশে রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে চাকরিরত থাকেন যেখানে হারাম খাবার ও বিক্রি হয়, পাশাপাশি দেশে হালাল পারিবারিক ব্যবসা ও আছে। তবে বিদেশে আরো উপার্জন আছে কিনা জানা নাই।
দেশের ব্যবসার আয় বিদেশের আয়ের প্রায় ৭ ভাগের এক ভাগ। তিনি আমার পরিবারের লোক এবং প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, আমি বালেগ এবং উক্ত পারিবারিক ব্যবসা টি দেখাশোনা করি। এই ব্যবসার আয় থেকে পুরো পরিবারের খরচ হয়।
এখন, উক্ত সদস্য পরিবারের জন্য তার উপার্জন থেকে পরিবারের জন্য খরচ করলে,হাদিয়া দিলে সেটার উপর বাকি সদস্যদের বিধান কি?
তিনি যদি আমার চিকিৎসার খরচ দিতে চান, তাহলে আমার উপর বিধান কি?
উল্লেখ্য যে আমি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না, এবং উপার্জন বলতে পারিবারিক ব্যবসা দেখা ই। যার আয় আলহামদুলিল্লাহ ২৫-৩৫ হাজার। এটা ওয়ারিশ সুত্রে পাওয়া।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী মাসআলা জড়িত। নিচে প্রতিটি দিক আলাদাভাবে স্পষ্ট করা হলো।
১. বিদেশে শেফ হিসেবে চাকরি ও তার উপার্জনের বিধান
যে রেস্তোরাঁয় হারাম খাবার (যেমন: শুকরের মাংস, জবাইবিহীন প্রাণী, মদ ইত্যাদি) বিক্রি হয়, সেখানে শেফ হিসেবে কাজ করা জায়েয নয়। কারণ শেফ সরাসরি হারাম খাবার প্রস্তুতকারী এবং এ কাজের মাধ্যমেই তার বেতন নির্ধারিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ
“নিশ্চয় আল্লাহ যখন কোনো বস্তু হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেন।”
(আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৮৮; সহীহ ইবনে হিব্বান ৪৯৩৮)
অতএব বিদেশের রেস্তোরাঁ থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ আয় হারাম। ফতোয়ায়ে উসমানীতে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
“যে ব্যক্তি হারাম ব্যবসায় বা চাকরিতে লিপ্ত, তার উপার্জন হারাম। তা নিজে খাওয়া বা পরিবারকে খাওয়ানো জায়েয নয়।”
(ফতোয়ায়ে উসমানী ২/২৩০, ইমদাদুল ফতোয়া ৪/১৫৫)
এখন প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি যদি বিদেশে আরও কোনো হালাল উপার্জন রাখেন, তবে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু শুধু শেফের বেতন হারাম।
২. হারাম ও হালাল মিশ্রিত আয় থেকে পরিবারের জন্য খরচ ও হাদিয়া
আপনার পারিবারিক ব্যবসা (যার আয় ২৫-৩৫ হাজার) সম্পূর্ণ হালাল। বিদেশের আয় (যা প্রায় ৭ গুণ) হারাম। সুতরাং পরিবারের জন্য ব্যয় ও হাদিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়ম:
- শুধু হালাল অংশ থেকে খরচ করা জায়েয।
- যদি হারাম অংশ মিশ্রিত থাকে এবং পৃথক করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেই মিশ্রিত সম্পদ গ্রহণ করা ও তা দ্বারা উপকৃত হওয়া নাজায়েয।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে: مَنْ جَمَعَ حَلَالًا وَحَرَامًا ثُمَّ اخْتَلَطَا وَلَمْ يَتَمَيَّزَا لَمْ يَجُزْ أَكْلُهُ وَلَا التَّصَدُّقُ بِهِ
“যে ব্যক্তি হালাল ও হারাম মিশ্রিত করে এবং তা পৃথক না হয়, তবে তা খাওয়া জায়েয নয়, দান করাও জায়েয নয়।”
(রদ্দুল মুহতার ৬/৩৮৬; ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০৪)
পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিধান:
তারা যদি জানেন যে এই টাকা হারাম উৎস থেকে এসেছে, তাহলে তা গ্রহণ করা, খাওয়া বা ব্যবহার করা হারাম। তবে যদি না জানেন এবং হালাল মনে করে গ্রহণ করেন, তবে তাদের জন্য তা ব্যবহার করা জায়েয, কিন্তু জেনে নেওয়ার পর আর ব্যবহার করা জায়েয নয়। (ফতোয়ায়ে উসমানী ২/২২৫; বাহিশ্তি জেওর ২/৪৩)
৩. আপনার চিকিৎসার খরচ গ্রহণের বিধান
আপনি যদি জানেন যে আপনার চিকিৎসার খরচ দেওয়া হচ্ছে বিদেশের হারাম উপার্জন থেকে, তাহলে তা গ্রহণ করা হারাম। কারণ চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা হারাম সম্পদ বৈধ করে না যতক্ষণ না প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে এবং হালাল কোনো উপায় না থাকে। এমন অবস্থায়ও শুধুমাত্র প্রাণ বাঁচানোর পরিমাণ গ্রহণ জায়েয, এবং পরবর্তীতে সেই অর্থের সদকা করা ওয়াজিব হবে (মুসলিম ব্যক্তির জন্য)। কিন্তু এখানে আপনি নিজেই একজন বালেগ এবং আপনার পারিবারিক হালাল ব্যবসা থেকে আয় হচ্ছে (২৫-৩৫ হাজার)। তাই আপনার নিজের চিকিৎসার জন্য নিজের হালাল আয় ব্যবহার করুন বা অন্য হালাল উৎস থেকে সাহায্য নিন।
ফতোয়ায়ে উসমানীতে এসেছে:
“হারাম সম্পদ দ্বারা চিকিৎসা করানো জায়েয নয়; বরং তা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।”
(ফতোয়ায়ে উসমানী ২/২৩৫)
৪. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির করণীয় ও পরামর্শ
- উক্ত ব্যক্তির উচিত তওবা করা, হারাম চাকরি ছেড়ে দেওয়া এবং হালাল উপার্জনের পথ অবলম্বন করা।
- যদি তার কাছে পূর্বের হারাম উপার্জন থেকে কোনো সম্পদ জমা থাকে, তবে তার মালিকানা সাব্যস্ত হবে না; তাকে অবশ্যই তা সদকা করে ফেলতে হবে।
- পারিবারিক হালাল ব্যবসা যদি পর্যাপ্ত না হয়, তবে ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করুন অথবা অন্য হালাল পেশা গ্রহণ করুন।
- আপনারা পরিবারের সদস্যরা তাকে হারাম উপার্জনের ক্ষতি সম্পর্কে বুঝান এবং তাকে হালাল পথে আসতে উদ্বুদ্ধ করুন।
প্রাসঙ্গিক কিতাবের সূত্রসমূহ
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৫-৩৮৬) – “মিশ্রিত হালাল-হারাম সম্পদের হুকুম”
- ফতোয়ায়ে আলমগীরী (৫/৩০৪) – “হারাম উপার্জন পরিবারে খরচ করা”
- ইমদাদুল ফতোয়া (৪/১৫৫-১৫৬) – “শেফের চাকরি ও বেতন”
- ফতোয়ায়ে উসমানী (২/২২৫-২৩৫) – “হারাম আয় থেকে খরচ, হাদিয়া ও চিকিৎসা”
- বাহিশ্তি জেওর (২/৪৩) – “হারাম সম্পদ গ্রহণ, ব্যবহার ও পরিহার”
- হিদায়া (৪/১৪১) – “হারাম বস্তুর মূল্য হারাম”
- শরহু মাআনিল আসার – ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর বক্তব্য
সারসংক্ষেপ:
আপনার পারিবারিক ব্যবসার হালাল আয়ই যথেষ্ট। বিদেশের হারাম আয় গ্রহণ করবেন না এবং তার কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করবেন না, বিশেষ করে চিকিৎসার জন্যও নয়। তাকে হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে বলুন। আল্লাহ তওবা ও ইখলাসের বদৌলতে হালাল রিজিকের পথ খুলে দেবেন।
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা তালাক: ২-৩)
والله أعلم بالصواب