ফরয গোসল নিয়ে প্রশ্ন।
Taharah Purity · Hanafi
Question
২.দেহের লোম বড় আমার,এক লোমের জায়গায় ৩টা, ৪টা ছোট ছোট লোম।আবার এমন অনেক লোম আছে যা ৩টা কিন্তু অনেক অনেক ছোট, ১ সেন্টিমিটার এর চেয়েও অওম, তাই অনেক ওয়াসওয়াসা আসে লোমের গোড়ায় পানি দিতে বালতির পর বালতি পানি ঢালি তাই সুন্নত নিয়ম টা বলিয়েন, জা করলে পানি দেহের লোমের গোড়া য় যাবে।
৩.ইস্তিনশাক কি?নাকে পানি দেওয়ার নিয়ম কি?নাকে অয়ানি দিয়েই পানি টানবো নাকি নাকে পানি দিয়ে বাম হাতের ২ টি আঙুল ঢুকিয়ে পরে আংগুল বের পরে টান দিবো?অজুতেও কি একি কাজ হবে???? সব বলিয়েন
Answer
ফরয গসল, ইস্তিনশাক ও লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর সুন্নত নিয়ম
ইমামদের মত ও সাহাবীদের আমল
ফরয গোসলে মাথার চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। আর তা করার সুন্নত পদ্ধতি হল:
সুন্নত পদ্ধতি: প্রথমে মাথায় তিনবার পানি ঢালার পর আঙ্গুলগুলো খাড়া রেখে চুলের গোড়ায় মালিশ করা। অর্থাৎ, পানি মাথায় ঢেলে আঙ্গুল দিয়ে চুলের গোড়ায় ভালোভাবে মালিশ করবেন, যেন পানি গোড়ায় পৌঁছে যায়।
ইমামদের মত: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, গোসলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। আর মালিশ করা সুন্নত। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও একই মত দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১)
সাহাবীদের আমল: সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) গোসলের সময় প্রথমে মাথায় পানি ঢালতেন, তারপর আঙ্গুল দিয়ে চুলের গোড়া ভালোভাবে মালিশ করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৩১৬)
মালিশ কী? মালিশ অর্থ হলো ঘষা বা টিপে দেওয়া। গোসলের ক্ষেত্রে মালিশ বলতে বোঝায়, পানি ঢালার পর হাত দিয়ে শরীরের অঙ্গগুলো ভালোভাবে ঘষে বা টিপে দেওয়া, যাতে পানি গোড়ায় পৌঁছে যায়।
পানি ঢেলে হাতের তালু দিয়ে টেনে দেওয়াই মালিশ নাকি আঙ্গুল খাড়া রেখে চুলের উপরে টানবে? উভয় পদ্ধতিই গ্রহণযোগ্য। তবে সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো: পানি মাথায় ঢেলে দুই হাতের আঙ্গুল খাড়া রেখে চুলের গোড়ায় মালিশ করা। কেননা এতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো সহজ হয়। (বাহিশ্তি জেওর, ১/৯২; ফাতাওয়া উসমানি, ১/১২৪)
২. দেহের লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর নিয়ম
মোটা ও ঘন লোমের ক্ষেত্রে
আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, আপনার শরীরের লোম মোটা এবং এক জায়গায় ৩/৪টি ছোট ছোট লোম রয়েছে। এতে ওয়াসওয়াসা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু নিম্নোক্ত নিয়ম জানা থাকলে ওয়াসওয়াসা দূর হবে ইনশাআল্লাহ:
সুন্নত নিয়ম: ১. দেহে পানি ঢালার পর হাত দিয়ে ভালোভাবে মালিশ করুন। ২. মালিশ করার সময় এমনভাবে করুন যেন হাতের তালু দিয়ে লোমের গোড়ায় চাপ পড়ে। ৩. বারবার পানি ঢালার প্রয়োজন নেই। একবার পানি ঢেলে ভালোভাবে মালিশ করলেই পানি লোমের গোড়ায় পৌঁছে যাবে। ৪. ছোট লোমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, শরীরের লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। আর মালিশ করা সুন্নত। কিন্তু মালিশ না করলেও গোসল সহীহ হবে, যদি পানি লোমের গোড়ায় পৌঁছে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৯)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে মনে রাখবেন, পানি ঢালার পর শরীরের অধিকাংশ স্থানে পানি সাধারণত পৌঁছে যায়। শুধু সন্দেহের কারণে বারবার পানি ঢালা ওয়াসওয়াসার কারণ। তাই একবার পানি ঢেলে ভালোভাবে মালিশ করুন এবং নিশ্চিত হোন যে পানি পৌঁছেছে। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/১২৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৩৪)
৩. ইস্তিনশাক: নাকে পানি দেওয়ার নিয়ম
ইস্তিনশাক কী?
ইস্তিনশাক (اِسْتِنْشَاق) অর্থ নাকের ভেতর পানি টানা। অজু ও গোসল উভয় ক্ষেত্রেই এটি সুন্নত।
নাকে পানি দেওয়ার সুন্নত নিয়ম
অজুতে ইস্তিনশাকের নিয়ম: ১. ডান হাতে পানি নিয়ে নাকের ছিদ্রে দিয়ে শ্বাসের সাথে পানি টানবেন। ২. তারপর বাম হাতের কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নাক পরিষ্কার করবেন। ৩. বাম হাতের দুই আঙ্গুল নাকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে পানি বের করে দেবেন। ৪. পানি টানার সময় জোরে টানা উচিত নয় (রোজা থাকলে বিশেষ সতর্কতা)।
গোসলে ইস্তিনশাক: গোসলেও অজুর মতোই ইস্তিনশাক করতে হবে। অর্থাৎ ডান হাতে পানি নিয়ে নাকে টেনে বাম হাত দিয়ে পরিষ্কার করা। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৩; বাহিশ্তি জেওর, ১/৮৫)
প্রশ্নের উত্তরে:
- "নাকে অয়ানি দিয়েই পানি টানবো নাকি নাকে পানি দিয়ে বাম হাতের ২ টি আঙ্গুল ঢুকিয়ে পরে আঙ্গুল বের করে টান দিবো?"
- উত্তর: উভয়টাই সুন্নত। অর্থাৎ প্রথমে ডান হাতে পানি নিয়ে নাকে টানবেন (ইস্তিনশাক)। তারপর বাম হাতের কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি নাকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে পরিষ্কার করবেন (ইস্তিনসার)। এ দুটি ভিন্ন কাজ, কিন্তু উভয়ই সুন্নত।
অজু ও গোসল উভয় ক্ষেত্রেই এই নিয়ম একই।
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
- ইস্তিনশাক এবং ইস্তিনসার উভয়ই অজু ও গোসলের সুন্নত।
- নাকের ভেতর পানি টানা (ইস্তিনশাক) এবং নাক পরিষ্কার করা (ইস্তিনসার) আলাদা সুন্নত।
- রোজা অবস্থায় ইস্তিনশাকের সময় পানি বেশি উপরে টানা থেকে বিরত থাকবেন। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/১২৮)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | সুন্নত পদ্ধতি | |-------|---------------| | চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো | মাথায় পানি ঢেলে আঙ্গুল খাড়া রেখে গোড়ায় মালিশ করা | | দেহের লোমের গোড়ায় পানি | পানি ঢেলে হাত দিয়ে মালিশ করা | | ইস্তিনশাক | ডান হাতে পানি নিয়ে নাকে টানা | | ইস্তিনসার | বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে নাক পরিষ্কার করা |
ওয়াসওয়াসা দূর করার দোয়া: "আমন্ত্রাসিকা বি রহ্মাতিকা, ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর" (অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত প্রার্থনা করছি, নিশ্চয় আপনি সর্বশক্তিমান।)
সূত্র: রদ্দুল মুহতার (১/১৫৮-১৫৯), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১১-১৩), বাহিশ্তি জেওর (১/৮৫-৯২), ফাতাওয়া উসমানি (১/১২৪-১২৮), ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৩৪)