ফরয গোসলে নাক, কান, নাভি, চুল ও লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর নিয়ম।
Taharah Purity · Hanafi
Question No:
1576
Questioner:
Kahinur Rahman
Question Asked:
13 Jun 2026, 03:41 PM
Reviewed & Published:
13 Jun 2026, 03:45 PM
Views:
66
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by
.
Question
১.ফরয গোসলে নাকে,কানে, নাভিতে, পানি দেওয়াফ সুন্নত নিয়ম আলাদা করে ব্যাখ্যা করে বলবেন?
২.ফরয গোসলে ছেলেদের চুলের গোড়ায় পানি পৌছানোর সুন্নত নিয়ম কি এটা ইমাম দের মত, সালাফদের আমল,সুন্নত, সাহাবিরা কিভাবে করেছেন সব সহ।
৩.দেহের লোম বড় আমার,এক লোমের জায়গায় ৩টা, ৪টা ছোট ছোট লোম।আবার এমন অনেক লোম আছে যা ৩টা কিন্তু অনেক অনেক ছোট, ১ সেন্টিমিটার এর চেয়েও অওম, তাই অনেক ওয়াসওয়াসা আসে লোমের গোড়ায় পানি দিতে বালতির পর বালতি পানি ঢালি তাই সুন্নত নিয়ম টা বলিয়েন।
২.ফরয গোসলে ছেলেদের চুলের গোড়ায় পানি পৌছানোর সুন্নত নিয়ম কি এটা ইমাম দের মত, সালাফদের আমল,সুন্নত, সাহাবিরা কিভাবে করেছেন সব সহ।
৩.দেহের লোম বড় আমার,এক লোমের জায়গায় ৩টা, ৪টা ছোট ছোট লোম।আবার এমন অনেক লোম আছে যা ৩টা কিন্তু অনেক অনেক ছোট, ১ সেন্টিমিটার এর চেয়েও অওম, তাই অনেক ওয়াসওয়াসা আসে লোমের গোড়ায় পানি দিতে বালতির পর বালতি পানি ঢালি তাই সুন্নত নিয়ম টা বলিয়েন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহ (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, বাহিশ্তি জেওর, ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া উসমানি) থেকে দলিলসহ উত্তর প্রদান করা হলো।
প্রশ্ন ১: ফরয গোসলে নাক, কান, নাভিতে পানি দেওয়ার সুন্নত নিয়ম
নাকে পানি দেওয়া:
- ফরয: নাকের ভেতরের অংশে (নাকের ডগা থেকে শুরু করে নাকের হাড় পর্যন্ত) পানি পৌঁছানো ফরয নয়। বরং নাকের বাইরের অংশ ধৌত করাই ফরয। তবে সুন্নত হলো নাকে পানি দিয়ে জোরে টেনে (নাকের ভেতর পর্যন্ত) পৌঁছানো (ইস্তিনশাক করা)। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৬; বাহিশ্তি জেওর, ১/২৮]
- নিয়ম: ডান হাতে পানি নিয়ে নাকে দিয়ে বাম নাক থেকে বের করে পরিষ্কার করা। এটি গোসল ও অজু উভয়ের জন্যই সুন্নত। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১]
- সতর্কতা: রোজাদার অবস্থায় গোসল করলে জোরে টানা সুন্নত নয়, বরং নাকে পানি দিয়ে নাকের সিট (নারস) ওপরে উঠে যায় এমন পরিমাণে পানি দেওয়া জায়েয। [রদ্দুল মুহতার, ২/৪২৪]
কানে পানি দেওয়া:
- ফরয: কানের ভেতরের গর্ত (কানের পর্দা পর্যন্ত) ধৌত করা ফরয নয়। কানের বাইরের অংশ এবং কানের লতি ধৌত করাই ফরয।
- সুন্নত: কানের ছিদ্রে আঙ্গুল দিয়ে পানি পৌঁছানো সুন্নত নয়। বরং সুন্নত হলো অজুর নিয়মে কানে পানি দেওয়া: শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে কানের ভেতরের অংশ এবং বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে কানের পিছনের অংশ ঘষা। গোসলের ক্ষেত্রেও এই আমল সুন্নত। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১]
- সারসংক্ষেপ: কানের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরয নয়, বরং কানের বাইরের অংশ ধোয়া ফরয। সুন্নত হলো কানের বাইরের ও ভেতরের অংশ আঙ্গুল দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করা।
নাভিতে পানি দেওয়া:
- ফরয: নাভির ভেতরের অংশ (গর্ত) ধৌত করা ফরয। যদি নাভি ডেবে থাকে বা ময়লা জমে থাকে, তাহলে পানি পৌঁছানো জরুরি। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৮]
- সুন্নত: নাভি ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করা এবং নাভির গর্তে পানি পৌঁছানোর জন্য আঙ্গুল দিয়ে ঘষা সুন্নত। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১]
- নিয়ম: নাভিতে পানি ঢেলে আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ময়লা বের করে দেওয়া। প্রয়োজনে সাবান বা অন্য কিছু ব্যবহার করা জায়েয।
প্রশ্ন ২: ফরয গোসলে ছেলেদের চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর সুন্নত নিয়ম (সাহাবি-সালাফ-ইমামদের আমল)
ইমামদের মত (হানাফি মাযহাব):
- ফরয: মাথার চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয়। শুধু মাথার চুল (প্রতি চুলে) পানি পৌঁছালেই গোসল সহীহ হয়। তবে চুল যদি পাকানো বা জড়ানো থাকে (যেমন: বেণী, ড্রেডলক), তাহলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২]
- সুন্নত: পুরো মাথায় তিনবার পানি ঢেলে হাত দিয়ে মালিশ করা (দাগও মালিশ) সুন্নত। এতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। [ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৯১]
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: তিনি চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোকে ফরয মনে করতেন না। তবে সতর্কতা হিসেবে পানি পৌঁছানো ভালো। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৬০]
সাহাবি ও সালাফদের আমল:
- হাদিস: উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন গোসল করতেন, প্রথমে ডান হাতে পানি নিয়ে মাথায় ঢালতেন, তারপর বাম হাতে পানি নিয়ে মাথায় ঢালতেন এবং হাত দিয়ে মাথার চুল মালিশ করতেন যাতে পানি গোড়ায় পৌঁছে যায়। [সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৫৪]
- সহাবি-আমল: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) গোসলের সময় মাথায় পানি ঢেলে চুল মালিশ করতেন। [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, ১/৭৭]
- সালাফ-আমল: ইমাম নববী (রহ.) এবং অন্যান্য সালাফ চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর জন্য মাথা মালিশ করাকে সুন্নত মনে করতেন। [শারহুল মুহাজ্জাব, ২/১৫৬]
সারসংক্ষেপ:
- সুন্নত নিয়ম: গোসলের সময় মাথায় পানি ঢেলে তিনবার হাত দিয়ে মালিশ করা। এতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায় এবং এটি সুন্নত পালন হয়।
- ফরয: চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয় (জড়ানো চুল ছাড়া)। কিন্তু সুন্নত পালনের জন্য মালিশ করা উত্তম।
প্রশ্ন ৩: দেহের লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর ওয়াসওয়াসা ও সুন্নত নিয়ম
ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য ফিকহি নীতি:
- আপনার লোমগুলো ছোট (১ সেন্টিমিটারের কম) এবং এক লোমের জায়গায় ৩-৪ টি লোম থাকলেও এগুলোকে পৃথক পৃথক লোম ধরা হয় না। বরং এগুলো একই ত্বকের ওপর অবস্থিত।
- হানাফি ফিকহ অনুসারে: লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয়। বরং ত্বকের বাইরের অংশে (যেখানে লোম জন্মে) পানি পৌঁছালেই ওই অংশ ধৌত হয়েছে বলে ধরা হয়। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২]
- নিয়ম: আপনি বালতি দিয়ে পানি ঢালার পরিবর্তে নিম্নরূপ করবেন:
- গোসলের সময় সারা শরীরে পানি ঢালুন (যেমন: হাত দিয়ে পানি নিয়ে শরীরে ছেটান)।
- হাত দিয়ে শরীর মালিশ করুন। এতে লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছে যাবে।
- প্রয়োজনে সাবান বা বডি ওয়াশ ব্যবহার করে মালিশ করুন - এতে ময়লা দূর হবে এবং ওয়াসওয়াসা কমবে।
- ওয়াসওয়াসা দূরীকরণ: আপনি যদি বালতি-ভর্তি পানি ঢালার পরও ওয়াসওয়াসা অনুভব করেন, তাহলে জানবেন যে সুন্নত হলো মালিশ করা, বারবার পানি ঢালা নয়। অতিরিক্ত পানি ঢালা ইসরাফ (অপচয়) হতে পারে। [ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৫২]
ইমামদের বক্তব্য:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয়।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.): লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয়, তবে উত্তম (মুস্তাহাব)। [রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৯]
- সিদ্ধান্ত: ফরয গোসলের জন্য লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো আবশ্যক নয়। আপনি যদি সারা শরীরে পানি ঢেলে হাত দিয়ে মালিশ করেন, তাহলে গোসল সহীহ হবে। ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য আপনি নিচের নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন:
সুন্নত নিয়ম (লোমের জন্য): গোসলের সময় হাত দিয়ে শরীরের প্রতিটি অংশ ঘষে মালিশ করুন। প্রয়োজনে সাবান দিয়ে ঘষুন। পানি সারা শরীরে প্রবাহিত হলে লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছে যাবে বলে ধরে নিন। অতিরিক্ত পানি ঢালার প্রয়োজন নেই।
সার্বিক উপসংহার ও পরামর্শ
- নাক: কুলি করার মতো পানি টেনে নেওয়া সুন্নত (রোজা না থাকলে)।
- কান: কানের বাইরের ও ভেতরের অংশ আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ধোয়া সুন্নত। কানের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরয নয়।
- নাভি: নাভির গর্তে পানি পৌঁছানো ফরয। আঙ্গুল দিয়ে ঘসে পরিষ্কার করা সুন্নত।
- চুল: মাথায় পানি ঢেলে হাত দিয়ে মালিশ করা সুন্নত। চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয় (জড়ানো চুল ছাড়া)।
- লোম: ত্বকে পানি পৌঁছালেই গোসল সহীহ। লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয নয়। ওয়াসওয়াসা এড়াতে হাত দিয়ে মালিশ করুন এবং অতিরিক্ত পানি ঢালা থেকে বিরত থাকুন।
ওয়াসওয়াসা দূর করার দোয়া:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল ওয়াসওয়াসিল খাতিরাতি মিন্নাশ শাইতান।
উদ্ধৃতি:
- রদ্দুল মুহতার (১/১৫৬-১৬০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১১-১২)
- বাহিশ্তি জেওর (১/২৮-৩০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৯১)
- ফাতাওয়া উসমানি (১/১৫২-১৫৩)