Relations
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: হারাম সম্পর্কের পর প্রতিশোধ হিসেবে বদদু‘আ করা জায়েয নয়
প্রশ্ন: আমি একটি ছেলের সাথে হারাম সম্পর্কে জড়িত ছিলাম। সে এখন অন্য মেয়েকে বিয়ে করে ফেলেছে। আমাকে ধোঁকা দেওয়ার কারণে আমি কি আল্লাহর কাছে এভাবে দু‘আ করতে পারি যে, “হে আল্লাহ! আপনি আমার পক্ষ থেকে তাকে ও তার পরিবারকে দুনিয়াবি শাস্তি দিন”?
উত্তর:
আপনার আবেগ ও ক্ষোভ বোধগম্য, তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের দু‘আ করা জায়েয নয়। নিচে যুক্তিসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. হারাম সম্পর্ক উভয়ের জন্যই গুনাহ
প্রথমেই বুঝতে হবে, যে সম্পর্কটি ছিল তা সম্পূর্ণ হারাম ও আল্লাহর নাফরমানি। তাই এতে জড়িত থাকার জন্য আপনিও গুনাহগার। কেউ যদি আপনাকে ধোঁকা দিয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগ থাকতে পারে, কিন্তু আপনি নিজেও তো সেই হারাম সম্পর্কের অংশীদার ছিলেন। তাই প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা পরিত্যাগ করে তওবা করাই আপনার জন্য প্রথম কর্তব্য।
(সূরা নূর: ৩১; সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
২. কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বদদু‘আ করা নিষিদ্ধ
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে ও তোমাদের সম্পদের বিরুদ্ধে দু‘আ করো না। যদি এমন সময়ে দু‘আ করা হয় যে সময়ে দু‘আ কবুল হয়, তাহলে তা কবুল হয়ে যেতে পারে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩০০৯)
তাছাড়া, কোনো নির্দিষ্ট মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া বা তার জন্য ধ্বংস কামনা করা নাজায়েয। এক হাদীসে এসেছে:
“মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী, আর তাকে হত্যা করা কুফরী।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৮)
এমনকি অত্যাচারী ব্যক্তির জন্যও নির্দিষ্ট করে দুনিয়াবি শাস্তি কামনা না করে বরং হেদায়েতের জন্য বা ইনসাফের জন্য দু‘আ করা উচিত। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলেছেন:
“কোনো মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া জায়েয নয়, যদিও সে ফাসেক হয়।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৩)
৩. ধোঁকা দেওয়া সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ না করাই উত্তম
যদিও আপনার সাথে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে, তবে ইসলাম ধৈর্য ও ক্ষমা করার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা ক্ষমা করো, আর তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?” (সূরা নূর: ২২)
অন্য আয়াতে বলেন:
“যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কার রয়েছে।” (সূরা শূরা: ৪০)
অতএব, আপনি যদি তাকে ক্ষমা করতে পারেন, তাহলে তা অধিক সওয়াবের কাজ হবে।
৪. মাযলুমের দু‘আ কবুল হলেও সতর্কতা আবশ্যক
হাদীসে এসেছে, মাযলুমের দু‘আ আল্লাহর কাছে কবুল হয়, এমনকি যদি সে কাফিরও হয় (মুসনাদে আহমদ)। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে দুনিয়াবি বিপদ বা শাস্তি কামনা করবেন। কারণ, আপনি নিজেও তো গুনাহগার। আর দ্বিতীয়ত, শাস্তি কামনা করলে তার বিপরীতে আপনাকেও হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। তাই সর্বোত্তম পন্থা হলো:
- নিজের গুনাহের জন্য তওবা করা।
- তাকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া (অর্থাৎ আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন বলে বিশ্বাস রাখা)।
- ভবিষ্যতে আর কোনো হারাম সম্পর্কে জড়িত না হওয়া।
৫. হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
ফতোয়ায়ে উসমানীতে (১/২৪৫) এসেছে:
“কারো জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অভিশাপ দেওয়া বা তার ধ্বংস কামনা করা জায়েয নয়। বরং অন্যায়কারীর জন্য হেদায়েতের দু‘আ করা উচিত।”
আর ‘ইমদাদুল ফতোয়া’ (২/৪৫৬) গ্রন্থে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:
“যে ব্যক্তি আপনার সাথে প্রতারণা করেছে, তার জন্য দুনিয়াবি বিপদ কামনা না করে বরং আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করুন। বিশ্বাস করুন, আল্লাহ কখনো অত্যাচারীকে ছাড়বেন না, তবে আপনার কাজ হলো নিজের তওবা ও সংশোধন।”
৬. কী করবেন এখন?
- প্রথমত: হারাম সম্পর্কের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি তওবা করুন।
- দ্বিতীয়ত: ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো রকম বদদু‘আ বা অভিশাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- তৃতীয়ত: আল্লাহর কাছে নিজের হেদায়েত ও ধৈর্য কামনা করুন। আপনি চাইলে এভাবে দু‘আ করতে পারেন:
“হে আল্লাহ! আপনি তাকে (ওই ছেলেকে) সঠিক পথ দেখান। আর আমার প্রতি যে অত্যাচার হয়েছে, তার বিচার আপনার কাছে রেখে দিলাম। আপনি ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু।” - চতুর্থত: নিজেকে সংযত করুন এবং দ্বীনের পথে চলতে থাকুন। মনে রাখবেন, প্রতিশোধ আল্লাহর কাজ – আপনি নিজেই নেবেন না।
সারসংক্ষেপ:
| যে প্রশ্ন করেছিলেন | উত্তর | |-------------------|-------| | “আল্লাহ তাকে ও তার পরিবারকে দুনিয়াবি শাস্তি দিন” – বলা কি জায়েয? | না, জায়েয নয়। এটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বদদু‘আ ও অভিশাপের শামিল, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। |
বরং নিজের গুনাহের তওবা করুন, অন্যদের জন্যও হেদায়েতের দু‘আ করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
উত্তর প্রদানকারী:
ইসলামিক জ্ঞান ও ফিকহ বিভাগ
দারুল ইফতা, দেওবন্দ
[তথ্যসূত্র: ফাতাওয়া উসমানী, রাদ্দুল মুহতার, ইমদাদুল ফাতাওয়া, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]