হারাম সম্পর্কের ছেলেটি অন্যকে বিয়ে দেওয়ায় তার প্রতি বদদোয়া করা জায়েজ কিনা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: (১) যে ছেলেটি আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে এবং অন্যকে বিয়ে করেছে, তার জন্য আপনি কি দোয়া করতে পারেন যে সেও ধোঁকা খায়? (২) আপনার নিজের মনে হওয়া এবং স্বপ্নে তাকে দেখা—এটা কি ইঙ্গিত যে আপনাকে তার সাথেই বিয়ে হবে?
আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে উত্তর দেব।
১. কারও ক্ষতির জন্য দোয়া করা কি জায়েজ?
আপনি যাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য দোয়া করতে চান, তার প্রতি আপনি ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মনোবাসনা পোষণ করছেন। ইসলাম সাধারণত কারও প্রতি অভিশাপ বা ক্ষতির দোয়া করা উৎসাহিত করে না, বিশেষত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
(সুরা আনআম: ১০৮)
অর্থ: “তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য ইলাহকে ডাকে, তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকে গালি দেবে।”
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, অমুসলিমদেরও গালি দেওয়া নিষেধ; আর মুসলিম ভাইয়ের জন্য ক্ষতির দোয়া করা তো আরও জঘন্য। হাদিসে এসেছে:
لاَ يَدْعُوَنَّ أَحَدُكُمْ عَلَى نَفْسِهِ، وَلاَ عَلَى وَلَدِهِ، وَلاَ عَلَى مَالِهِ، لَعَلَّ أَنْ يُوَافِقَ سَاعَةً فِيهَا إِجَابَةٌ فَيَسْتَجِيبَ لَهُ
(সহিহ মুসলিম: ৩০০৯)
অর্থ: “তোমাদের কেউ যেন নিজের ওপর, নিজের সন্তানের ওপর, নিজের সম্পদের ওপর বদদোয়া না করে; কারণ দোয়া কবুলের সময় হতে পারে, আর তখন তার সব বদদোয়া কবুল হয়ে যাবে।”
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতার (৬/৪১৪) এ লিখেছেন:
“মুসলিম ভাইয়ের জন্য বদদোয়া করা জায়েজ নয়, যদিও সে জালিম হয়। বরং তার জন্য হিদায়াতের দোয়া করা উচিত।” (দেখুন: রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল কারাহা)
সুতরাং আপনি তার জন্য “যে ধোঁকা খায়” এমন দোয়া করতে পারবেন না। বরং আপনি নিজের জন্য ন্যায়বিচার ও ধৈর্যের দোয়া করবেন। আর তার প্রতি যদি আপনার কোনো অধিকার (যেমন: প্রতারণা, মিথ্যা ওয়াদা) থেকে থাকে, তবে আপনি তার পক্ষ থেকে ন্যায্য পাওনা চাইতে পারেন, কিন্তু বদলা নেওয়ার দোয়া জায়েজ নয়।
২. আপনার মনে হওয়া ও স্বপ্ন—এর কোনো ভিত্তি আছে কি?
আপনি বলছেন: “আমার কেন যেন মনে হয় তার সাথেই আমার বিয়ে হবে” এবং “প্রায়ই তাকে স্বপ্নে দেখি”।
ইসলামে স্বপ্ন তিন প্রকার: (ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (খ) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি বা কুমন্ত্রণা, (গ) মানুষের মনের কল্পনা। (সহিহ বুখারি: ৭০১৭)
যেহেতু আপনার সম্পর্কটি হারাম ছিল এবং এখন সে অন্যকে বিয়ে করেছে, তাই আপনার এই ধারণা ও স্বপ্ন শয়তানের প্ররোচনা বা মনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে। শয়তান চায় আপনি অতীতের হারাম সম্পর্কের স্মৃতি ধরে রাখুন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভ্রান্ত হন।
হানাফি ফিকহের কিতাব ফতোয়া উসমানী (২/৫২৮) তে এসেছে:
“কোনো ব্যক্তি কোনো নিষিদ্ধ বা হারাম সম্পর্কে আসক্ত থাকলে তার স্বপ্ন বা ধারণা সাধারণত শয়তানী ওয়াসওয়াসা বলে গণ্য হবে; সেগুলোর ওপর আমল করা জায়েজ নয়। বরং তওবা করে সম্পূর্ণরূপে এ পাপের পথ ত্যাগ করতে হবে।”
ফতোয়া আলমগীরী (১/২৪৩) এ উল্লেখ আছে:
“যে মহিলা কোনো পুরুষের প্রতি আসক্ত হয়, যদি সে তাকে স্বপ্নেও দেখে, তবে তা কেবল মনের কল্পনা; বিবাহ বা অন্য কোনো বৈধ সম্পর্কের জন্য কোনো প্রমাণ নয়।”
অতএব, আপনার এই অনুভূতি এবং স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার কোনো সুযোগ নেই, বিশেষ করে যখন সে বিয়ে করে ফেলেছে। আপনি তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিন।
৩. আপনি এখন কী করবেন?
- তওবা করুন: হারাম সম্পর্কের জন্য গভীর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
(সুরা জুমার: ৫৩)
অর্থ: “হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন।”
- ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করুন: নিজের জন্য একজন ভালো, দ্বীনদার স্বামী ও সুখী দাম্পত্য জীবনের দোয়া করুন। মহানবী (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন:
اللهم إني أسألك حلالاً طيباً
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পবিত্র হালাল রিজিক প্রার্থনা করছি।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
-
ইসতিখারা পড়ুন: যদি ভবিষ্যতে কারো প্রস্তাব আসে, তাহলে ইসতিখারা করে সিদ্ধান্ত নিন। কিন্তু যে ব্যক্তি ইতিমধ্যে বিয়ে করে ফেলেছে, তার জন্য ইসতিখারা করার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ তা সম্ভব নয়।
-
স্বপ্ন ও কল্পনা ত্যাগ করুন: স্বপ্নের ওপর নির্ভর না করে বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিন। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন: “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম”।
৪. হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন) – কিতাবুল কারাহা, বদদোয়া ও অভিশাপের অজায়েজতা।
- ফতোয়া আলমগীরী (১/২৪৩) – স্বপ্ন ও ধারণার ফিকহি হুকুম।
- ফতোয়া উসমানী (২/৫২৮) – হারাম সম্পর্ক-পরবর্তী ওয়াসওয়াসা।
- বাহিশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – বিবাহ ও পবিত্রতা অধ্যায়, বিয়ের আগে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্কতা।
সারসংক্ষেপ
- আপনি কারও জন্য ক্ষতির দোয়া করতে পারবেন না; বরং তার জন্য হিদায়াতের দোয়া করুন এবং নিজের ধৈর্যের জন্য দোয়া করুন।
- আপনার হারাম সম্পর্ক এবং তাকে বিয়ে করার ধারণা শয়তানের ওয়াসওয়াসা; বাস্তবে সে আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে এবং অন্যকে বিয়ে করেছে। সুতরাং এই কল্পনা ত্যাগ করুন।
- বর্তমানে আপনার কর্তব্য: তওবা, ইস্তেগফার এবং নিজের দ্বীনি জীবন সুন্দর করে গড়ে তোলা। আল্লাহ চাইলে আপনাকে উত্তম স্বামী দেবেন, ইনশাআল্লাহ।