তালাকপ্রাপ্তা নারীর অনিয়মিত পিরিয়ডে ইদ্দত গণনার নিয়ম।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
নিজের ইদ্দত (ইদ্দাত) কীভাবে গণনা করবেন, তা বুঝতে পারছেন না—এ বিষয়ে আপনার উদ্বেগ ঠিকই আছে। যেহেতু আপনার মাসিক অনিয়মিত, তাই ইদ্দতের গণনা কিছুটা জটিল হলেও শরী‘আতের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। নিচে হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
ইদ্দতের সাধারণ বিধান
কুরআনে বলা হয়েছে—
﴿وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ﴾ (সূরা বাকারা: ২২৮)
অর্থ: “আর তালাকপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদেরকে তিন কুরূ’ (হায়য) পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।”
এ আয়াতের ভিত্তিতে হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো—
- যে নারীর হায়য হয়, তার ইদ্দত তিনটি পূর্ণ হায়য (মাসিক) পর্যন্ত।
- যে নারীর হায়য আসে না (যেমন: ছোট মেয়ে, বৃদ্ধা, বা অনিয়মিত মাসিকের কারণে সম্পূর্ণভাবে হায়য বন্ধ হয়ে গেছে), তার ইদ্দত তিন মাস (৯০ দিন) গণ্য হবে।
(সূত্র: আল-হিদায়া, ২/৪২৪; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫০৬; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৫২৮)
আপনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- তালাক হয় এপ্রিলের শুরুতে (ধরি, ১লা এপ্রিল)।
- ২৬ এপ্রিল আপনার হায়য এসেছে। এটি ইদ্দতের প্রথম হায়য গণ্য হবে।
- মে মাসে কোনো হায়য হয়নি।
- এখন জুন মাস চলছে।
যেহেতু আপনার হায়য অনিয়মিত (অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান নেই), তাই ইদ্দত গণনার জন্য নিম্নোক্ত নিয়ম প্রযোজ্য:
১. যদি হায়য শুরু হয় (অর্থাৎ রক্ত দেখা যায়) তাহলে:
ইদ্দত পূর্ণ হবে তিনটি পূর্ণ হায়য হওয়ার পর। অর্থাৎ—
- ২৬ এপ্রিলের হায়য = প্রথম হায়য
- এরপর দ্বিতীয় হায়য আসার পর তা শেষ হলে = দ্বিতীয় হায়য
- তৃতীয় হায়য আসার পর তা শেষ হলে = ইদ্দত সম্পন্ন
২. যদি অনিয়মিত কারণে হায়য আসা বন্ধ থাকে (অর্থাৎ দীর্ঘ সময় রক্ত না আসে):
হানাফী ফিকহের বিশিষ্ট গ্রন্থ ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৫২৮) এবং রদ্দুল মুহতার (৩/৫০৬) এ বলা হয়েছে—
“যদি তালাকপ্রাপ্তা নারীর হায়য অনিয়মিত হয়, তাহলে সে তিন মাস (৯০ দিন) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যদি এই তিন মাসের মধ্যে হায়য শুরু হয়, তাহলে সে তিনটি হায়য পূর্ণ করবে। আর যদি হায়য না হয়, তাহলে তিন মাস শেষে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে।”
আপনার ক্ষেত্রে:
- তালাকের পর ২৬ এপ্রিল হায়য এসেছে → তাই আপনি তিন-হায়যের ইদ্দতের আওতায় চলে গেছেন।
- এখন দ্বিতীয় হায়য আসার অপেক্ষায় থাকবেন। যদি দ্বিতীয় হায়য আসতে বিলম্ব হয় (যেমন: এক-দুই মাস পর আসে), তাহলে সেটি পূর্ণ হওয়ার পর ইদ্দত গণনা হবে।
- তবে যদি আপনার হায়য একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় (যেমন: বার্ধক্য বা রোগের কারণে), তাহলে তালাকের তারিখ থেকে তিন মাস (৯০ দিন) ইদ্দত পালন করবেন। কিন্তু যেহেতু ইতিমধ্যে একটি হায়য হয়েছে, তাই তিন মাসের এই সুযোগ শুধু তখনই প্রযোজ্য যদি আর কোনো হায়য না আসে।
আপনার বর্তমান অবস্থার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
১. তালাকের তারিখ মনে রাখুন: ধরি, ১ এপ্রিল তালাক হয়েছিল।
২. প্রথম হায়যের তারিখ: ২৬ এপ্রিল (এটি ইদ্দতের প্রথম হায়য গণ্য)
৩. এখন দ্বিতীয় হায়য আসার জন্য অপেক্ষা করুন।
- যদি এই মাসে (জুন মাসে) হায়য আসে, তাহলে তা শেষ হলে দ্বিতীয় হায়য গণ্য হবে।
- এরপর তৃতীয় হায়য আসার পর ইদ্দত শেষ হবে।
৪. যদি হায়য আসতে দেরি হয় (যেমন: দুই মাস না হয়), তাহলে আপনি প্রথম হায়যের পর থেকে ৯০ দিন গণনা করতে পারেন?—এটি হানাফী ফিকহে সরাসরি সমর্থিত নয়, বরং আপনি তিনটি হায়যের অপেক্ষায় থাকবেন। তবে প্রয়োজনে একজন আলেম বা মুফতির সাথে যোগাযোগ করে নির্দেশনা নিতে পারেন।
কিতাব ও আলেমদের রেফারেন্স
- ইমাম কাসানী, বাদায়েউস সানায়ে’ (৩/১৮৮): “মুত্তালাকার ইদ্দত তিন কুরূ’ (হায়য) দ্বারা পূর্ণ হয়।”
- ইবনে আবেদীন, রদ্দুল মুহতার (৩/৫০৬): “যদি মেয়েলোকের হায়য অনিয়মিত হয়, তাহলে সে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যদি হায়য আসে, তাহলে তিন হায়য পূর্ণ করবে।”
- মুফতি মুহাম্মাদ শফী, মা‘আরিফুল কুরআন (১/৫৭৪): “যে নারীর হায়য অনিয়মিত, সে ইদ্দতে তিন হায়যের অপেক্ষা করবে। তবে হায়য না আসলে তিন মাস শেষে ইদ্দত পূর্ণ হবে।”
- মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১২): “অনিয়মিত হায়যের ক্ষেত্রে ইদ্দতের হিসাব করার জন্য কোনো নারী যদি একবার হায়য দেখে, তাহলে সে তিন হায়য পূর্ণ করবে। দ্বিতীয় হায়য আসতে বিলম্ব হলেও অপেক্ষা করতে হবে।”
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- আপনার ইদ্দত তিনটি পূর্ণ মাসিক (হায়য) দ্বারা গণ্য হবে।
- ২৬ এপ্রিলের হায়য প্রথম হায়য হিসেবে গণ্য।
- এখন দ্বিতীয় হায়য আসার জন্য অপেক্ষা করুন। তা আসলে ইদ্দতের দ্বিতীয় ধাপ শেষ হবে।
- তৃতীয় হায়য আসার পর ইদ্দত সম্পন্ন হবে।
★★যদি হায়য একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় বা কয়েক মাস না হয় তাহলে তালাকের তারিখ থেকে তিন মাস (৯০ দিন) পর ইদ্দত পূর্ণ হবে।
তবে শর্ত হলো গর্ভে কোনো সন্তান না থাকা। যদি গর্ভে সন্তান থাকে,সেক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পরেই ইদ্দতকাল খতম হবে।
اللہ أعلم بالصواب