গর্ভাবস্থায় স্বপ্নে সাপ দেখার ইসলামী ব্যাখ্যা ও করণীয় জানুন।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1547
Questioner: Sarwatun Nahar
Question Asked: 12 Jun 2026, 06:54 PM
Reviewed & Published: 12 Jun 2026, 07:37 PM
Views: 6
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহ্।
বিয়ের পর নানান ধরনের পারিবারিক জটিলতা হয়েছে, এখনো চলছে। শারীরিক মানসিকভাবে অনেকসময় অসুস্থ হয়ে পরেছি, সবর করার চেষ্টা করেছি, করছি। বর্তমানে গর্ভাবস্থার শেষদিকে আছি আলহামদুলিল্লাহ্। এই সময়টায় দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক চাপের কারণে অনেক অদ্ভুত ধরনের স্বপ্ন দেখা যায় শুনেছি। আজকেও হয়তো তেমন কিছু ছিল। ভোরে স্বপ্ন দেখেছি, ঘুম ভাঙার পর শুনলাম ফজরের আজান হচ্ছে। আউযুবিল্লাহ পড়ে বামদিকে থুতু দিয়ে পাশ পরিবর্তন করে শুয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।
স্বপ্নের শুরু দিকে আমার দাদাবাড়ির পুকুর দেখতে পাই। সেখানে আমি, আমার মা আর একজন মহিলা (কে ছিল এখন খেয়াল নেই, তবে পরিচিত আত্মীয় ছিল) তিনজন মিলে মাছ ধরছিলাম। এর মাঝেই হঠাত বিশালাকার একটা সাপ পানির মধ্যে নড়াচড়া করতে দেখে আমরা দ্রুত ঘরে চলে আসি। সাপটাও আস্তে আস্তে পানি থেকে উঠে আমাদের পেছন পেছন ঘরে আসছিল। সাপটা মাথা উচু করে সোজা হয়ে আসছিল তবে এমন না যে সে ফনা তুলে আছে বা আঘাত করার চেষ্টা করছে। সর্বশেষ আমি ঘরে ঢুকি, দরজা বন্ধ করে দিই। তবে ওই দরজার নিচে ফাকা থাকায় সাপটা ঘরের ভেতর চলে আসে। এর পরের দরজাটাও বন্ধ করে দ্রুত সামনের দিকে চলে আসি। তখন দেখলাম ঘরে পরিচিত অনেক আত্মীয় স্বজনরা আছেন, আমার বাবা ভাইরাও ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সাপের অবস্থা দেখার জন্য পিছন দিকে যাই। সাপটা আমাকে দেখে আবার ভেতরে চলে আসতে থাকে। আবার আমি সামনের ঘরে চলে যাই। এভাবে ২-৩ বার আমি সাপের অবস্থা দেখতে যাই আর প্রতিবারই সাপটা দরজার নিচ দিয়ে ঢুকে একেকটা রুম পার করে চলে আসছিল। দরজার নিচের ফাকা অনেক ছোট থাকার পরও সে আসছিল অথচ সে অনেক বড় আকারের ছিল। প্রতিবার আমি একাই দেখতে যাচ্ছিলাম আর সাপটা শান্তভাবে দরজার নিচ পার করে আসছিল। স্বপ্নের শেষদিকে দরজা খুলে অবস্থা দেখতে যাচ্ছিলাম ভেবেছিলাম সাপটা নেই। কিন্তু সে ছিল, দরজা খোলার পর সাপটা যখন পিছন পিছন আসছিল তখন আমার ওড়নার একটা প্রান্ত তার মাথার উপর দিয়ে ঢেকে দিই। সাপটা ওড়নায় পেচিয়ে যাচ্ছিল বা এমন কিছু তখন আমার ঘুম ভেঙে যায়।
স্বপ্নটা কি মানসিক চাপের কারণে মনের চিন্তা থেকে তৈরি হয়েছে, নাকি শয়তানের ওয়াসওয়াসা তা আল্লহ্ ভালো জানেন। আল্লহ্ হিফাজত করুন আমাদের, আমাদের অনাগত সন্তানকে। স্বপ্নের যদি কোনো ব্যাখ্যা থাকে জানাবেন ইন শা আল্লহ্।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্নটি মূলত আপনার মানসিক চাপ ও পারিবারিক জটিলতার ফল। গর্ভাবস্থায় দুশ্চিন্তা ও শারীরিক-মানসিক ক্লান্তির কারণে এরূপ অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক। ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী, খারাপ বা ভীতিপ্রদ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয় এবং এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ ধরনের স্বপ্ন দেখলে করণীয় হলো:

  1. ডান দিকে (অথবা বাম দিকে) তিনবার থুথু ফেলা (শুধু ফুঁ দেওয়া, লালা না)
  2. আউযুবিল্লাহ (أعوذ بالله من الشيطان الرجيم) পাঠ করা
  3. যে পাশে শুয়েছিলেন তার বিপরীত দিকে কাত হওয়া
  4. স্বপ্ন কারো কাছে না বলা এবং তা নিয়ে চিন্তা না করা

(সহিহ বুখারী, ৫৭৪৭; সহিহ মুসলিম, ২২৬১; বেহেশতি জেওর, খণ্ড ৮, স্বপ্ন অধ্যায়)

হাদীসে এসেছে:
"যখন তোমাদের কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা অপছন্দ করে, তখন সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং তিনবার শয়তান থেকে আশ্রয় চায়। আর সে যেন সেই পাশ থেকে অন্য পাশে ঘুরে যায়।"
(মুসলিম, ২২৬২; আবু দাউদ, ৫০২২)

আপনি ইতিমধ্যে আউযুবিল্লাহ পড়ে বাম দিকে থুথু দিয়ে পাশ পরিবর্তন করেছেন, এটি সঠিক কাজ। এখন এই স্বপ্নকে গুরুত্ব দেবেন না।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা:
সাধারণত সাপ স্বপ্নে শত্রুর প্রতীক হয়, তবে আপনার বর্ণিত স্বপ্নে সাপটি আক্রমণাত্মক নয় বরং শান্তভাবে আপনাকে অনুসরণ করছে। এটি আপনার মানসিক দুশ্চিন্তা ও গর্ভাবস্থার শারীরিক অবস্থার প্রতিফলন। বিশেষ করে দরজার নিচের ফাঁকা দিয়ে বড় সাপ প্রবেশ করা—এটি আপনার অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা ও পরিবারের জটিলতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেই ইঙ্গিত করে। আলিমগণ বলেন:

  • ইমাম ইবনে সীরীন রহ. বলেন: "সাপ স্বপ্নে গোপন শত্রু কিংবা পরিবারের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে। তবে যদি সাপ আক্রমণ না করে তবে তা নিরাপদ।" (তাফসীরুল আহলাম, ১/২৮১)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানী রহ. বলেন: "গর্ভবতী নারীর স্বপ্ন প্রায়ই তার শারীরিক-মানসিক অবস্থার প্রতিবিম্ব হয়। এসব স্বপ্নের কোনো শর‘ঈ ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয়। বরং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে উপেক্ষা করা কর্তব্য।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৫২৮)

সুতরাং এই স্বপ্ন শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং আপনার মনের চিন্তার মিশ্রণ। এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই এবং এটি আপনার অনাগত সন্তানের জন্য খারাপের ইঙ্গিত নয়। বরং আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার সন্তানকে হিফাযত করবেন—ইনশাআল্লাহ।

করণীয়:

  1. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস এবং সূরা ইখলাস (৩ বার) পড়ে নিজের ও গর্ভের সন্তানের উপর ফুঁ দিন।
  2. প্রতিদিন সূরা ইউসুফসূরা মারিয়াম তেলাওয়াত করুন।
  3. স্বামীর সাথে পরামর্শ করে পারিবারিক জটিলতা সমাধানে ধৈর্য ও দো‘আ অব্যাহত রাখুন।
  4. বেশি বেশি “লা হাওলা ওলা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” এবং “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল” পড়ুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্যকে কবুল করুন, গর্ভস্থ সন্তানকে সুস্থ ও নেককার করুন এবং পরিবারে শান্তি দান করুন।

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৬৪৪ (খারাপ স্বপ্নের বিধান)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকি উসমানী), ২/৪৫০ (স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানবী), স্বপ্ন অধ্যায়
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি শফী), সূরা ইউসুফের তাফসীর
  • আল-হিদায়া (الهداية), ৪/৪৮০ (স্বপ্নের হুকুম)

وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.