শুধু তুমি মানে বউ বলে নিজেকে বুঝানো এতেই জিহার হয় কিনা?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
নিজেকে বোঝানোর জন্য বলা কথাটাতে তুমি বলতে বউ কেই বুঝাইছি। তবে বউয়ের জন্য খাস করে কথাটা বলি নাই। উদ্দেশ্য তো ছিলই না জিহারের। ধরো তুমি তোমার ছাত্রকে শেখানোর জন্য, বউকে দেখে প্র্যাকটিক্যালি বললা জিহারের বাক্যটা টা কিন্তু বউএর জন্য তো বলো নাই অভিনয় কিরছো। এখানে তো তার চেয়েও কম।
পয়েন্ট ১। সরীহ কথাটাই তুমি বলতে বউ কেই বুঝাইছি
২৷ কথাটা আসতে বলছি নাকি জোরে না মনে সেটা মনে নাই। ফ্যান ছিলো। মুখ নাড়ছি।
৩। বউয়ের ছবি মনে বাজছে কিনা সেটাও মনে নেই।
৪। যতটুকু মনে করে কথাটা বলার সময় খুব কেয়ারফুলি নিজেকে বলতেছিলাম দ্রুততার সাথে যাতে নিজেকে বুঝাইতে পারি ওয়াসওয়াসাটা চলে যায়
তো সবগুলা কথা আমলে নিয়া তারপরে উত্তরটা দাও জিহার হবে কিনা?
( পরিশিষ্ট : আমি জানি সন্দেহ থাকলে তালাক ধরে না এটাও কি তাই না, শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য যতই বউকে উদ্দেশ্য করুক হওয়ার কি কথা, উপরের কথা বউ এর জন্য খাস ছিলো না তবে বউকে কল্পনা করে প্র্যাকটিক্যালি বুঝাইলে নিজের মাথায় গেঁথে যায় ওয়াসওয়াসা আর আসে না)
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে জিহার হয়নি। আপনি নিজেকে বোঝানোর জন্য যে বাক্যটি বলেছেন, তা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি, বরং ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য একটি মানসিক অনুশীলন ছিল। জিহার হওয়ার জন্য স্ত্রীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট বা ইঙ্গিতবাচক শব্দ বলা জরুরি, যা এখানে অনুপস্থিত।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ (হানাফি ফিকহের আলোকে)
১. জিহারের সংজ্ঞা ও শর্ত
জিহার হলো এমন একটি ঘোষণা যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে নিজের মাহরাম (মা, বোন, মেয়ে ইত্যাদি) এর সাথে তুলনা করে, যেমন: "তুমি আমার কাছে আমার মায়ের মতো।"
হানাফি ফিকহ অনুসারে জিহারের জন্য প্রয়োজন:
- সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ ব্যবহার – যেমন "তুমি আমার মায়ের মতো" বা "তুমি আমার বোনের মতো" ইত্যাদি। সরীহ শব্দে উদ্দেশ্য লাগে না, তবে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা জরুরি। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৯৯; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২২)
- কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ – যেমন "তুমি আমার কাছে হারাম" – এর জন্য জিহারের নিয়ত লাগে।
আপনার বক্তব্য: "তুমি আমার জন্য তেমনি... আমার মেয়ে আমার জন্য..." – এটি সরীহ জিহারের বাক্য (স্ত্রীকে মেয়ের সাথে তুলনা), কিন্তু এটি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি।
২. স্ত্রীকে উদ্দেশ্য না করলে জিহার হয় না
যদি কেউ জিহারের বাক্য নিজের সাথে বা অন্য কাউকে শিক্ষা দিতে বলে, অর্থাৎ স্ত্রীকে উদ্দেশ্য না করে, তাহলে জিহার হয় না। যেমন:
- ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন: "জিহারের বাক্য যদি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে না বলা হয়, তাহলে তা জিহার গণ্য হবে না।" (বাদায়িউস সানায়ি, ৩/৩৬৭)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে আছে: "যদি কেউ স্ত্রীকে উপস্থিত না রেখে শুধু মুখে বলে ‘তুমি আমার মায়ের মতো’, কিন্তু তার উদ্দেশ্য স্ত্রী না হয়, তাহলে জিহার হবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৭৩)
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি নিজেকে বোঝানোর জন্য বাক্যটি বলেছেন, স্ত্রীকে সম্বোধন করে নন।
- সঙ্গে সঙ্গে আপনি স্পষ্ট করে বলেছেন: "যদি এভাবে বল বউকে তাইলে হবে নাইলে হবে না।" – এটি প্রমাণ করে আপনার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা দেওয়া, জিহার করা নয়।
- আপনি ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য তাড়াহুড়ো করে বলেছেন, স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নন।
৩. সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি
হানাফি ফিকহে একটি মূলনীতি হলো: সন্দেহ থাকলে তালাক বা জিহার সংঘটিত হয় না। যেমন ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
"তালাকের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে তা কার্যকর হবে না, কারণ মূল হলো বিবাহ বহাল থাকা।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২)
আপনার অবস্থায়:
- আপনি নিশ্চিত নন যে বাক্যটি জোরে বলেছেন নাকি মুখ নাড়ছেন মাত্র।
- আপনি নিশ্চিত নন যে স্ত্রীর ছবি মনে এসেছিল কিনা।
- আপনি নিজেই বলছেন: "উদ্দেশ্য তো ছিলই না জিহারের।"
এতগুলো সন্দেহের কারণে জিহার হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
৪. ওয়াসওয়াসার প্রভাব
ওয়াসওয়াসা (মনে মনে খেয়াল আসা) ইসলামী আইনে আমলে নেওয়া হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনে মনে উদিত হওয়া খেয়াল বা ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা উচ্চারণ করে বা আমল করে।" (বুখারি, মুসলিম)
আপনি উচ্চারণ করলেও তা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে করেননি, বরং নিজেকে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত করতে বলেছেন। তাই এটি আমলে আসবে না।
৫. শিক্ষামূলক উচ্চারণের বিধান
যদি কেউ অপরকে জিহারের নিয়ম শেখানোর জন্য বাক্যটি বলেন, যেমন: "তুমি যদি স্ত্রীকে বলো ‘তুমি আমার মায়ের মতো’, তাহলে জিহার হবে" – এটি বলার মাধ্যমে বক্তার নিজের জিহার হয় না। কারণ তিনি বাস্তবে স্ত্রীকে সম্বোধন করেননি। (ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ৮/৫৬৫)
আপনার অবস্থা এর মতোই: আপনি নিজেকে শেখাচ্ছিলেন, বাস্তবে স্ত্রীকে বলেননি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত সব কারণের ভিত্তিতে আপনার বর্ণিত ঘটনায় জিহার হয়নি। আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য যা বলা হয়েছে, তা শরীয়তে গণ্য হবে না। প্রয়োজনে আপনি আরও নিশ্চিত হতে একজন আলেমের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।