রাসূল (সা.) মসজিদে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন—এই দলিল দিয়ে বর্তমানে মসজিদে রাজনৈতিক মিটিং করা কতটুকু জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1505
Questioner: Shihab Hossain
Question Asked: 11 Jun 2026, 05:13 PM
Reviewed & Published: 11 Jun 2026, 05:41 PM
Views: 72
Tokens: 3,796
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

অনেকে বলে থাকেন যে রাসুল (সঃ) মসজিদে বসে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন এবং সমস্থ বিচার আচার, আইন রাষ্ট পরিচালনা করেছেন, সেই যুক্তি দিয়ে তারা বঝাতে চাই বর্তমানে মসজিদেও রাজনৈতিক মিটিং বা এই সম্পকিত কাজ করা যাবে এটা কতটুকু সঠিক এবং বিস্তারিত জানাবেন।

Answer

উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ

প্রশ্নে উল্লেখিত দাবিটি সঠিক যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর মসজিদে বসে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য এবং প্রশাসনিক কাজ করতেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বর্তমান যুগের মসজিদগুলোতে রাজনৈতিক মিটিং, স্লোগান, বিতর্ক বা দলীয় রাজনীতির কাজ করা জায়েয। কারণ রাসূল (সা.)-এর মসজিদ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু—সেখানে ইবাদত, শিক্ষা, বিচার, সেনা পরিকল্পনা, দূত আদান-প্রদান, এমনকি যুদ্ধের সিদ্ধান্তও নেওয়া হত। কিন্তু সে সময় মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো প্রশাসনিক ভবন ছিল না। বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান (সংসদ, আদালত, প্রশাসনিক ভবন) রয়েছে। তাই মসজিদের মূল উদ্দেশ্য—ইবাদত, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি শিক্ষা—সুরক্ষিত রাখা জরুরি।

হানাফী ফিকহের মূলনীতি:

হানাফী মাযহাবের কিতাবাদিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মসজিদ মূলত ইবাদত ও ধর্মীয় কাজের জন্য। দুনিয়াবি আলোচনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক বিতর্ক ও উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ (নাজায়েয নয়, তবে অপছন্দনীয়) যদি তা মসজিদের আদবের পরিপন্থী হয়। (রদ্দুল মুহতার: ১/৬৬২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩২১)

রাসূল (সা.)-এর আমল ও বর্তমান প্রেক্ষাপটের পার্থক্য:

১. সময় ও স্থানের ভিন্নতা: রাসূল (সা.)-এর মসজিদ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র। আজ মসজিদের জন্য আলাদা কোনো রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নেই; বরং মসজিদের দায়িত্ব মুসল্লিদের ইবাদত ও দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া।
২. আদব ও শর্ত: রাসূল (সা.) মসজিদে যে কাজ করতেন, তা ছিল পরিপূর্ণ আদব ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। অথচ আজকের রাজনৈতিক মিটিংয়ে প্রায়ই উত্তপ্ত বিতর্ক, চিৎকার, দলীয় কোন্দল ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার হয়—এসব মসজিদের পবিত্রতার পরিপন্থী।
৩. ইজমা ও ফাতাওয়া: হানাফী ফকীহগণ স্পষ্ট বলেছেন, মসজিদে দুনিয়াবি কাজ করা মাকরূহ। বিশেষ করে রাজনৈতিক মিটিং যদি সেখানে ইবাদত-বিমুখতা সৃষ্টি করে বা বিবাদে রূপ নেয়, তবে তা নাজায়েয। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/২৫৫; ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪৫৫)

হানাফী উলামায়ে কেরামের বক্তব্য:

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: মসজিদ শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য। অন্য কোনো কাজ সেখানে করা মাকরূহ। (শরহু মাআনিল আসার: ১/২২৫)
  • মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন: রাসূল (সা.) মসজিদে রাষ্ট্রীয় কাজ করলেও তা ছিল ওহীর নির্দেশে এবং সে সময় মসজিদের বিকল্প ছিল না। বর্তমানে মসজিদকে রাজনৈতিক মঞ্চ বানানো বিদআত ও গুনাহ। (মাআরিফুল কুরআন: ২/৫২২)
  • মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: মসজিদে রাজনৈতিক সভা করা জায়েয নয়, কারণ তা মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট করে। (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪৫৬)

ব্যতিক্রম সময়:

যদি কোনো রাজনৈতিক সভা সম্পূর্ণ দ্বীনি উদ্দেশ্যে—যেমন ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য, নির্বাচনে ভালো প্রার্থীকে সমর্থন বা মসজিদের কল্যাণে—অত্যন্ত শালীন পরিবেশে, নামাজের সময় বাদ দিয়ে এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়, তবে কিছু হানাফী আলেম একে মাকরূহ তানজিহি (অপছন্দনীয়) বলেছেন; তবে অধিকাংশের মতে তা-ও জায়েয নয়। সর্বোত্তম হলো মসজিদের বাইরে আলাদা জায়গায় এসব কাজ করা।

সারসংক্ষেপ:

রাসূল (সা.)-এর মসজিদে রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টান্ত বর্তমান যুগে মসজিদে রাজনৈতিক মিটিংয়ের জন্য সরাসরি দলিল নয়। বর্তমান মসজিদের মূল উদ্দেশ্য ইবাদত সংরক্ষণ করা। তাই রাজনৈতিক কাজ মসজিদের ভেতরে না করে বাইরে করা উচিত। হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা অপছন্দনীয়তার কথা এসেছে। (ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/১৫০; বাহিশ্তি জেওর: ১/১২২)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মসজিদের আদব রক্ষা করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.