বিবাহিত পুরুষের জন্য অন্য নারীর সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক কি যিনা ব্যভিচার হিসাবে গণ্য হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1480
Questioner: Hamida Tasnun
Question Asked: 11 Jun 2026, 01:33 AM
Reviewed & Published: 11 Jun 2026, 02:10 AM
Views: 52
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

কোনো পুরুষ যদি বিবাহিত থাকা স্বত্তেও আরেকটা নারীর সাথে বিয়ের উদ্দেশ্যে দেখিয়ে আড়াই বছর যাবৎ স্ত্রীকে লুকিয়ে ওই মেয়ের সাথে কলে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলা,ম্যাসেজে অযথা নানান ধরনের কথা বলা। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা,ভালো লাগা মন্দ লাগা এবং এই নিয়ে স্ত্রীকে দিনের পর দিন মিথ্যা বলা।ধরা পড়লেই বলে যে আর করবেনা,এবারই শেষ।আর মেয়ের কথা বলে মেয়ে পুরুষদের প্রতি বিশ্বাস করতে পারেনা তাই বিয়ে করবেনা বলে বলে মেয়ের বিশ্বাস অর্জনের জন্য স্ত্রীর পাশে শুয়ে শুয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে মেয়ের সাথে লম্বা লম্বা ম্যাসেজিং এটা কি পরকীয়া ,ধোঁকার আর জেনা ব্যভিচার এর আওতায় পড়ে?

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة

আপনার বর্ণিত ঘটনাটি স্পষ্টতই পরকীয়া ( adultery/fornication)ধোঁকার (deception) অন্তর্ভুক্ত এবং এটি যিনা (ব্যভিচার)-এর দিকে ধাবিতকারী গুরুতর গুনাহের কাজ। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।


১. পরকীয়া ও গোপন সম্পর্কের সংজ্ঞা

ইসলামী পরিভাষায় পরকীয়া বলতে বোঝায়, বিবাহিত বা অবিবাহিত অবস্থায় অমহরম নারী-পুরুষের মধ্যে গোপন সম্পর্ক, আবেগ-অনুরাগের বিনিময়, ভালোবাসার কথা বলা, শারীরিক বা মানসিক আকর্ষণ প্রকাশ করা ইত্যাদি। এটি সরাসরি যিনার দিকে নিয়ে যায় এবং কুরআন-হাদীসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর তোমরা যিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।”
(সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)

হাদীসে এসেছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: "كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكَ لاَ مَحَالَةَ، فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ، وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أَوْ يُكَذِّبُهُ"
“আদম সন্তানের জন্য যিনার একটি অংশ লিখে দেওয়া হয়েছে, যা সে কোনোরূপে করবেই। চোখের যিনা হলো (হারামের দিকে) তাকানো, কানের যিনা হলো (অশ্লীল কথা) শোনা, জিহ্বার যিনা হলো (অশ্লীল) কথা বলা, হাতের যিনা হলো (হারামভাবে) স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো (হারামের দিকে) পদক্ষেপ নেওয়া, আর অন্তর কামনা করে ও চায়। আর লজ্জাস্থান তা সত্য করে অথবা মিথ্যা করে।”
(সহীহ বুখারী: ৬২৪৩, সহীহ মুসলিম: ২৬৫৭)

আপনার বর্ণনায় উল্লিখিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা, ম্যাসেজে মনের ভাব প্রকাশ করা, ভালোলাগা-মন্দলাগা বলা—এসবই জিহ্বা ও অন্তরের যিনার অন্তর্ভুক্ত। এটি সরাসরি শারীরিক সম্পর্কে না গেলেও যিনার পথে পা বাড়ানোর শামিল।


২. স্ত্রীকে লুকিয়ে সম্পর্ক রাখা ও মিথ্যা বলা

স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীর সাথে গোপনে সম্পর্ক রাখা এবং স্ত্রীকে মিথ্যা বলা ধোঁকা (deception)প্রতারণা। ইসলাম ধোঁকা ও প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

হাদীসে এসেছে:

مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে আমাদেরকে ধোঁকা (প্রতারণা) দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
(সহীহ মুসলিম: ১০১)

স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করে, তাকে লুকিয়ে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক রাখা—এটি আমানতের খিয়ানত এবং বিশ্বাস ভঙ্গের চরম উদাহরণ। রাসূল (সা.) বলেছেন:

أَلَا إِنَّ كُلَّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
(সহীহ বুখারী: ৮৯৩)

স্বামী স্ত্রীর দায়িত্বশীল এবং তার সাথে প্রতারণা করা হারাম।


৩. ‘বিয়ে করবেই’ অথবা ‘মেয়ে বিশ্বাস করে না’ ইত্যাদি অজুহাত

  • বিয়ের অজুহাতে সম্পর্ক রাখা: একান্তই বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলেও, বিবাহিত অবস্থায় অন্য নারীর সাথে আবেগময় সম্পর্ক রাখা বৈধ নয়। কারণ বিয়ের পদ্ধতি হলো পাত্রীর অভিভাবকের কাছে প্রস্তাব দেওয়া, আর তা শুদ্ধ উপায়ে সম্পন্ন করা। গোপনে প্রেম-ভালোবাসা করে বিয়ের ব্যবস্থা করা ইসলাম সমর্থন করে না।
  • মেয়ে পুরুষদের প্রতি বিশ্বাস করে না—এই অজুহাতে স্ত্রীকে ঠকিয়ে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া: এটি আরও বড় প্রতারণা। অপর নারীর বিশ্বাস অর্জনের জন্য নিজ স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করা—এটি চরিত্রহীনতার পরিচায়ক।

৪. বারবার তওবা ভঙ্গ করা ও ‘আর করব না’ বলা

বারবার পাপে লিপ্ত হয়ে ‘আর করব না’ বলে মিথ্যা ওয়াদা করা—এটি তওবা ভঙ্গ এবং নিফাক (মুনাফিকির)-এর আলামত। আল্লাহ বলেন:

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
“আর যারা কখনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে বা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ মাফ করবে? আর তারা জেনে শুনে নিজেদের কৃতকর্মে অটল থাকে না।”
(সূরা আলে ইমরান: ১৩৫)

বারবার একই পাপে ফিরে যাওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ চালিয়ে যাওয়া প্রকৃত তওবা নয়। বরং এটি গুনাহের উপর অটল থাকা, যা মাফ পাওয়ার পথে বাধা।


৫. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

  • “অমহরম নারীর সাথে কথাবার্তা ও দৃষ্টি বিনিময় করা হারাম, যদি তা অশ্লীল বা আবেগপূর্ণ হয়। এমনকি যদি বিয়ের উদ্দেশ্যেও হয়, তবুও গোপনে সম্পর্ক রাখা জায়েয নয়।”
    (রদ্দুল মুহতার: ১/৪০৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩২৯)
  • “যে ব্যক্তি বিবাহিত অবস্থায় অন্য নারীর সাথে প্রেম-ভালোবাসা করে এবং স্ত্রীকে ধোঁকা দেয়, সে কবিরা গুনাহগার। তার জন্য ওয়াজিব হলো তওবা করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়া।”
    (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩২৮, ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২১)

৬. পরিশেষে ফতোয়া বা সিদ্ধান্ত

প্রশ্নোক্ত ঘটনাটি স্পষ্টত:

  1. পরকীয়া—বিবাহিত পুরুষের অন্য নারীর সাথে গোপনে আবেগময় সম্পর্ক।
  2. ধোঁকা—স্ত্রীকে লুকিয়ে ও মিথ্যা বলে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া।
  3. যিনা (ব্যভিচার) এর আওতায় পড়ে—যেহেতু চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, অন্তর সবই যিনায় লিপ্ত হয়েছে এবং এটি শারীরিক যিনার পথে ধাবিত করে।

অতএব, সংশ্লিষ্ট পুরুষের জন্য করণীয়:

  • অবিলম্বে ওই নারীর সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন করা।
  • আল্লাহর কাছে খালেস তওবা করা—যাতে আর কখনো এ পাপে ফিরে না যায়।
  • স্ত্রীর কাছে গোপনে করা প্রতারণার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং তার আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা।
  • যদি স্ত্রী ক্ষমা না করে, তাহলে অন্তত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা।
  • বিয়ে করার সৎ ইচ্ছা থাকলে শুদ্ধ পন্থায়—অভিভাবকের মাধ্যমে প্রস্তাব দেওয়া, গোপন সম্পর্ক নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যিনা ও তার পথসমূহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


সংক্ষিপ্ত উত্তর:
এটি পরকীয়া, ধোঁকা ও যিনার অন্তর্ভুক্ত। বিয়ে, মেয়ের বিশ্বাস অর্জন ইত্যাদি অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। খালেস তওবা ও সম্পর্ক ছিন্ন করা আবশ্যক


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.