মৃত ব্যক্তির ঋণ রয়েছে, বাড়ী ব্যতিত কিছুই নাই, ওয়ারিছদের করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এই মূহুর্তে আমাদের উপর হুকুম এবং দায়িত্ব কি?
Answer
উত্তর
আপনার পিতা যে ব্যাংক ঋণ (মর্টগেজ) করে মারা গেছেন, তা সুদভিত্তিক লেনদেন, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম। তবে মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা ওয়ারিশদের উপর আবশ্যক, যদি সম্পত্তি থাকে। যেহেতু আপনাদের কাছে একমাত্র বসতভিটা (মর্টগেজকৃত) ছাড়া অন্য কোনো সম্পত্তি নেই, তাই এই বিষয়ে শরিয়তের নির্দেশনা নিম্নরূপ:
১. ঋণের প্রকৃতি ও ওয়ারিশদের দায়িত্ব
- আপনার পিতা ব্যাংক থেকে সুদভিত্তিক ঋণ নিয়েছেন, যা শরিয়তে নাজায়েজ। তবে ঋণ পরিশোধ না করা আরও বড় গুনাহ।
- মৃত ব্যক্তির ঋণ তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে। সম্পত্তি না থাকলে ওয়ারিশদের উপর ঋণ পরিশোধ বাধ্যতামূলক নয়, তবে উত্তমরূপে আদায় করা উচিত।
২. বসতভিটার অবস্থা ও করণীয়
-
বাড়িটি বিক্রি করা: আপনারা চাইলে বাড়িটি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। বাড়ির দাম (১ কোটি) ঋণের পরিমাণ (৩০ লাখ) থেকে অনেক বেশি, তাই বিক্রি করলে ঋণ শোধ করে অবশিষ্ট টাকা আপনাদের মধ্যে বণ্টন হবে।
- কিন্তু: বাড়িটি যদি আপনাদের একমাত্র বসতভিটা হয় এবং বিক্রি করলে গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অন্য যেকোনোভাবে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে করবেন।
-
ব্যাংকের সাথে আপস: ঋণের আসল টাকা (সুদ বাদে) পরিশোধের জন্য ব্যাংকের সাথে আলোচনা করতে পারেন। যেহেতু সুদের আদান প্রদান হারাম, তাই শুধু আসল টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করবেন। সম্ভব না হলে সুদসহও দিতে পারবেন।
-
বাড়ি না বিক্রি করলে: যদি বাড়ি বিক্রি না করেন, তাহলেও উত্তম হলো, উভয় পক্ষের সম্মতিতে কোনো সমাধান বের করা।
৩. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
হানাফি মাজহাব অনুসারে, মৃত ব্যক্তির ঋণ তার সম্পত্তি থেকে আদায় করতে হবে। সম্পত্তি না থাকলে ওয়ারিশরা চাইলে নিজেদের পক্ষ থেকে আদায় করতে পারেন, কিন্তু বাধ্য করা যায় না।
- ইবনে আবেদিন (রহ.) লিখেছেন: “ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা ওয়ারিশদের জন্য জায়েজ, এমনকি তা বসতভিটা হলেও।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫৯)
- তবে যদি ওয়ারিশরা বসবাসের জন্য অন্য কোনো স্থান না পান, তাহলে বাড়িটি বিক্রি করা জরুরি নয়। এই ক্ষেত্রে তারা ঋণ দাতার সাথে আলোচনা করে কিস্তিতে বা অন্য উপায়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন।
৪. সুদভিত্তিক ঋণ সম্পর্কে সতর্কতা
যেহেতু ব্যাংক ঋণটি সুদভিত্তিক, তাই এটি পরিশোধ করা ওয়ারিশদের জন্য জায়েজ নয়। তবে আপনারা যদি শুধু আসল টাকা পরিশোধ করেন এবং সুদের অংশ না দেন, তাহলে তা বৈধ হবে। ব্যাংক যদি সুদ নিতে বাধ্য করে, তাহলে আপনারা ব্যাংকের সাথে আইনি ও নৈতিকভাবে আপসের চেষ্টা করবেন।
৫. ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন
যদি বাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা হয়, তাহলে অবশিষ্ট টাকা (১ কোটি - ৩০ লাখ = ৭০ লাখ) আপনাদের ৪ জনের মধ্যে শরিয়তের নিয়মে বণ্টন হবে। আপনাদের পরিচয় স্পষ্ট না দেওয়ায় সাধারণ বণ্টন নিয়ম:
- ছেলে ও মেয়ে থাকলে: ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণ পাবে। (সূরা নিসা: ১১)
- শুধু ছেলে থাকলে: সমান ভাগে ভাগ হবে।
- শুধু মেয়ে থাকলে: মেয়েরা সমান ভাগে পাবে এবং আরও আত্মীয় থাকলে তাদের অংশ থাকবে।
৬. চূড়ান্ত পরামর্শ
- বাড়ি বিক্রি করুন: এটি সবচেয়ে সহজ ও শরিয়তসম্মত পথ। ঋণ শোধ করে অবশিষ্ট টাকা ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করলে পিতার ঋণমুক্ত হবে এবং আপনারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।
- বিকল্প ব্যবস্থা: যদি বাড়ি বিক্রি করতে না চান, তাহলে ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে কিস্তিতে শুধু আসল টাকা পরিশোধের চেষ্টা করুন।
- ইস্তিগফার করুন: আপনার পিতার সুদি লেনদেনের জন্য তাওবা-ইস্তিগফার করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
সূত্র:
- কুরআন: সূরা বাকারা (২:২৭৮-২৭৯) — সুদ হারাম ও ঋণ আদায়ের নির্দেশ।
- হাদিস: “মৃত ব্যক্তির ঋণ তার সম্পত্তি থেকে আদায় করতে হবে।” (বুখারি, ২২৯৮)
- রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫৯ — ইবনে আবেদিন (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৬৫ — মুফতি মুহাম্মদ উসমানি
- বাহিশতি জেওর, ৩/২৫ — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
উপসংহার: আপনারা যদি বাড়ি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেন, তাহলে এটি পিতার জন্য গুনাহমুক্তির উপায় হবে। যদি না পারেন, তাহলে বৈধ উপায়ে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা সহায় হোন।
(আল্লাহই সর্বজ্ঞ)