বড় ননদের হাসব্যান্ড এর সাথে কথা বলা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
ইসলামী বিধান: বড় ননদের স্বামীর সাথে কথা বলার পর্দার বিধান
প্রশ্নকারী: লাবণী ইয়াসমিন
বিষয়: ফিকহ (হানাফি মাযহাব)
সারসংক্ষেপ: বড় ননদ (স্বামীর বড় বোন) এর স্বামী আপনার জন্য পরপুরুষ (নন-মাহরাম)। তাই তার সাথে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা, সালাম আদান-প্রদান জায়েজ নেই।
প্রয়োজন বশত হলে পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলা যাবে। তবে প্রয়োজন অতিরিক্ত কথা বলা যাবেনা,হাসি ঠাট্রা করা যাবেনা।
১. বড় ননদের স্বামী কি মাহরাম?
না। বড় ননদের স্বামী আপনার গাইরে মাহরাম (অজ্ঞাত বেগানা পুরুষ)। শরিয়তে মাহরাম নির্ধারণে রক্ত সম্পর্ক, বৈবাহিক সম্পর্ক (যেমন শ্বশুর, জামাই) অথবা দুধ সম্পর্কের ভিত্তিতে হয়। স্বামীর বোনের স্বামী এই কোনোটির অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই তার সাথে পর্দা করা ওয়াজিব।
কুরআনের নির্দেশনা:
"আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকের উপর ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, স্বামীর পিতা, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, আপন স্ত্রীদের, তাদের ডান হাতের মালিকানাধীন দাসীদের, পুরুষদের মধ্য থেকে যারা স্ত্রী-স্পৃহা রাখে না, এবং শিশুদের যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অবগত নয়, তাদের ছাড়া কাউকে সাজসজ্জা প্রকাশ না করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
উক্ত আয়াতে স্বামীর বোনের স্বামীর নাম নেই। তাই তিনি পর্দার বাইরের ব্যক্তি।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করা থেকে সাবধান থাকো।" এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! দেবর (স্বামীর ভাই) সম্পর্কে কী বলেন?" তিনি বললেন: "দেবর তো মৃত্যুস্বরূপ।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
উল্লেখ্য, দেবর (স্বামীর ভাই) মাহরাম নয় এবং তার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। আর স্বামীর বোনের স্বামী তো দেবর থেকেও অধিক দূরবর্তী। কাজেই তার সাথেও পূর্ণ পর্দা ওয়াজিব।
২. আত্মীয়তা রক্ষার দায়িত্ব কার?
প্রশ্ন: "আমার কি আত্মীয়তা রক্ষা করতে হবে উনাকে সালাম দিয়ে? নাকি এটা আমার স্বামী করবেন?"
উত্তর:
বড় ননদের সাথে আপনার সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক নেই; তিনি আপনার স্বামীর বোন। আর তার স্বামী তো আরও দূরের সম্পর্ক। ইসলামে আত্মীয়তা রক্ষা (সিলাতুর রাহিম) ফরজ অথবা ওয়াজিব, তবে তা মূলত রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে। আপনার ক্ষেত্রে:
-
আপনার স্বামী তার নিজের বোন ও তার স্বামীর সাথে আত্মীয়তা রক্ষা করবেন। এটা তার দায়িত্ব।
-
আপনার জন্য নিজের মাহরাম আত্মীয় (পিতা-মাতা, ভাই-বোন ইত্যাদি) এর সাথে সম্পর্ক রাখা ওয়াজিব।
-
ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলা,পর্দার লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে।
হানাফি ফিকহের উদ্ধৃতি:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ বলেন:
"স্বামীর ভাই, স্বামীর বোনের স্বামী ইত্যাদি সবাই গাইরে মাহরাম। তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা নিষেধ, যদি না জরুরি প্রয়োজন থাকে আর তাও পর্দার আড়াল থেকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৫৪)
মুফতি মuhammad শফী (রহ.) ‘মা’আরিফুল কুরআন’-এ সূরা নূরের তাফসিরে বলেন:
"পর্দার বিধান শুধু মাহরাম ও গাইরে মাহরামের ভিত্তিতে, কোনোরূপ আত্মীয়তার খেয়াল না করে। বড় ননদ, ছোট ননদ, তাদের স্বামী সবার সাথে পর্দা করা ফরজ।" (মা’আরিফুল কুরআন, ৬/৪২৮)
৩. পর্দার সঠিক বিধান
আপনার যেমন বড় ননদের স্বামীর সাথে পর্দা করা ফরজ, তেমনি আপনার স্বামীরও তার বোনের সাথে পর্দা করতে হবে (যেহেতু বোনও গাইরে মাহরাম নন, বরং মাহরাম।
৪. জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে করণীয়
যদি পারিবারিক কোনো জরুরি বিষয়ে তার সাথে কথা বলা ছাড়া উপায় না থাকে, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো মেনে চলা জরুরি:
- কথা হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনীয়।
- কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক থাকবে, নরম বা আকর্ষণীয় হবে না।
- পর্দা সহ (যদি ফোনে হয়, তবে শুধু প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে ফোন রেখে দিন)।
- মুখোমুখি হলে পূর্ণ পর্দা ও কোনো প্রকার আলিঙ্গন বা হাত মেলানো যাবে না।
ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকী উসমানি) থেকে:
"স্বামীর ভাই, স্বামীর বোনের স্বামী ইত্যাদি গাইরে মাহরাম। তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা নিষেধ। তবে যদি কখনো পারিবারিক মজলিসে একই জায়গায় উপস্থিত থাকতে হয়, তবে সম্পূর্ণ পর্দা করে ও মাহরাম পুরুষের সামনে বসতে হবে; তাদের সাথে কোনো কথা বলা চলবে না।" (ফতোয়া উসমানি, ২/৩৫০)
উত্তম পদ্ধতি: পরিবারগত সম্পর্ক বজায় রাখতে আপনার স্বামীই তার বোন ও তার স্বামীর সাথে যোগাযোগ রাখবেন। আপনি আপনার ননদের সাথে পর্দার মর্যাদা বজায় রেখে কথা বলতে পারেন (যেহেতু ননদ আপনার গাইরে মাহরাম নন, বরং মাহরাম – কিন্তু এখানে ননদ নয়, তার স্বামী প্রশ্নে)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার যথাযথ পালনের তাওফিক দান করুন। (আমিন)