“ধান চাষ করে খরচ না উঠলে কি ধানের যাকাত (উশর) দিতে হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি মূলনীতি বুঝে নেওয়া জরুরি।
১. শস্যের যাকাত (উশর) কী?
কৃষিজ ফসলের উপর যে যাকাত ফরজ হয়, তাকে উশর বলে। এটি ফসলের পরিমাণের উপর নির্ভর করে, লাভ-ক্ষতির উপর নয়। তবে নিসাব (ন্যূনতম পরিমাণ) পূর্ণ হওয়া শর্ত।
২. নিসাবের পরিমাণ
ধানসহ সকল শস্যের নিসাব হলো ৫ ওসাক (প্রায় ৬৫৩ কেজি আধুনিক মাপে)। তবে এটি ধানের ছোট অবস্থায় নয়; বরং শুকনো ও পরিষ্কার অবস্থায় (চাল বা ধান) গণনা করতে হবে।
3. জমির মালিকানা ও উশরের দায়িত্ব
- ভাড়া নেওয়া জমি: চাষকারী (ভাড়াটিয়া) নিজেই ফসলের মালিক। তাই তার উপরই উশর ফরজ।
- বর্গা (মুযারাআ) নেওয়া জমি: জমির মালিক যদি অতিরিক্ত ফসল নেয়, তাহলে মালিকের উপর উশর ওয়াজিব। তবে সহনীয় পর্যায়ে নিলে বর্গাচাষির উপর উশর ওয়াজিব।
৪. খরচ কর্তনের বিধান (হানাফি মতে)
হানাফি মাজহাবে এ বিষয়ে কয়েকটি মত রয়েছে:
| মতপার্থক্য | ইমাম আবু হানিফা | ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ | |------------|----------------|-------------------------------| | খরচ কর্তন | অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ ফসলের উপর উশর দিতে হবে। | উৎপাদন খরচ (বীজ, সার, শ্রম, সেচ ইত্যাদি) কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট ফসলের উপর উশর দিতে হবে। | | উশরের হার | বৃষ্টির পানিতে ফসল উৎপাদন হলে ১০%, যান্ত্রিক সেচ দিলে ৫%। | সেচের উপর নির্ভর করে একই হার, তবে খরচ কর্তন করার কারণে মোট ফসল কমে গেলে বাস্তবে কম উশর দিতে হবে।
গ্রহণযোগ্য ফতোয়া: সমসাময়িক অধিকাংশ হানাফি আলেম (মুফতি তাকি উসমানি, মুফতি শফি প্রমুখ) ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতকেই সহজ ও বাস্তবসম্মত মনে করেন। বিশেষ করে যখন ফসল উৎপাদনে যথেষ্ট খরচ হয়।
৫. আপনার অবস্থার প্রয়োগ
আপনি লিখেছেন:
“ধান চাষ করতে যে খরচ হয়েছে আর আমার ধান বিক্রি করে সেই টাকা উঠছে না”
অর্থাৎ আপনার খরচ ফসলের বিক্রয় মূল্যের চেয়ে বেশি বা সমান। এর মানে হলো—
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মত অনুযায়ী: খরচ কেটে নেওয়ার পর ফসলের মূল্য শূন্য বা ঋণাত্মক। তাই কোনো উশর দিতে হবে না।
- ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী: সম্পূর্ণ ফসলের উপর উশর দিতে হবে যদি ফসলের পরিমাণ নিসাব পূর্ণ হয়। তবে এ মত গ্রহণ করলেও আপনার ক্ষেত্রে নিসাব পূর্ণ হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে।
অধিকাংশ মুফতির ফতোয়া: যেহেতু আপনি ক্ষতির সম্মুখীন, তাই উশর না দেওয়ার অবকাশ আছে। তবে আপনার দায়িত্ব হলো—
- দুই ধরনের জমি আলাদাভাবে হিসাব করুন:
- ভাড়া নেওয়া জমি থেকে মোট কত ধান (কেজি) পেয়েছেন।
- বর্গা নেওয়া জমি থেকে আপনার অংশ কত ধান (কেজি) পেয়েছেন।
- নিসাব পরীক্ষা করুন: প্রতিটি ভাগের ধানের পরিমাণ ৬৫৩ কেজি (৫ ওসাক) পূর্ণ হলে তার উপর উশর ফরজ হবে।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মত গ্রহণ করে: খরচ (বীজ, সার, সেচ, শ্রম, ভাড়া ইত্যাদি) কেটে নেওয়ার পর যদি অবশিষ্ট ধানের মূল্য নিসাব পূর্ণ না হয়, তাহলে উশর দেওয়া ওয়াজিব নয়।
সতর্কতা: ভাড়া দেওয়ার টাকা (জমি ভাড়া) খরচ হিসেবে গণ্য হবে। তবে বর্গার ক্ষেত্রে জমির মালিককে দেওয়া অংশ আপনার খরচ নয়; এটি মালিকের ফসল, যা থেকে তিনি নিজে উশর দেবেন।
৬. মূল ফতোয়া
উপসংহার: আপনার বিবরণ অনুযায়ী, ফসল বিক্রি করে খরচ ওঠেনি। তাই—
- অধিকাংশ হানাফি ফতোয়া অনুযায়ী আপনার উপর উশর (ধান ও চালের যাকাত) ওয়াজিব নয়।
- তবে আপনার দায়িত্ব হলো নিসাবের পরিমাণ পরীক্ষা করা। যদি আপনার প্রাপ্ত মোট ধানের পরিমাণ (ভাড়া জমি + বর্গার অংশ) ৬৫৩ কেজির বেশি হয় এবং তার মূল্য খরচ কেটে দেওয়ার পরও কিছু থাকে, তাহলে সেই অবশিষ্টের উপর ৫% বা ১০% উশর দিতে হবে (সেচ পদ্ধতি অনুযায়ী)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যাকাত একটি ইবাদত। নিশ্চিত না হলে নিজের এলাকার কোনো আলেম বা মুফতির কাছে সরাসরি ফসল ও খরচের বিবরণ দিয়ে ফতোয়া নেওয়া উত্তম।
তথ্যসূত্র
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/২৯৮-৩০১ (উশর ও খরচ কর্তন সংক্রান্ত)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/১৯১-১৯২
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি): ১/৪৮০-৪৮৫
- বেহেশতি জেওর: যাকাত অধ্যায় (উশরের বিধান)
- আল-হিদায়া: ১/১০৯-১১০