হায়েজ অবস্থায় মহিমান্বিত কুরআন পড়া সম্পর্কে
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
মহিমান্বিত কুরআন (আরবি ও বাংলা মুসহাফ) এবং কুরআনের তাফসীর—এই দুটির ক্ষেত্রে হায়েজ অবস্থায় পড়ার বিধান ভিন্ন। নিম্নে হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত ও প্রমাণাদি পেশ করা হলো।
১. মহিমান্বিত কুরআন মুসহাফ অর্থাৎ মূল আরবী আয়াত) হায়েজ অবস্থায় পড়া
হানাফি মাযহাবে হায়েজ অবস্থায় মহিলাদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা এবং মুসহাফ স্পর্শ করা উভয়ই নিষিদ্ধ। এটি নাপাকির বিশেষ অবস্থার (হায়েজ ও জানাবাত) জন্য নির্ধারিত শরয়ি বিধান।
- তিলাওয়াতের বিধান: হায়েজ অবস্থায় মুখে কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ নেই। এমনকি স্মৃতি থেকে আয়াত পড়াও নিষেধ। তবে দোয়া বা সুরক্ষার নিয়তে (যেমন আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস) পড়লে কোনো দোষ নেই—কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তিলাওয়াতের নিয়ত না করে শুধু দোয়া ও যিকরের নিয়ত করতে হবে।
- স্পর্শের বিধান: পবিত্র কুরআনের মুসহাফ সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করা নিষেধ। প্রয়োজনে কাপড় বা লাঠি ইত্যাদি দিয়ে পাতা উল্টানো যায়। তবে তিলাওয়াত না করে শুধু দেখা বা চিন্তা করা জায়েজ।
দলিল (হানাফি কিতাব):
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত নিষিদ্ধ, জানাবাতের মতোই। (১/২৯২)
- ফতোয়া হিন্দিয়া: হায়েজ অবস্থায় মহিলা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারবে না এবং মুসহাফ স্পর্শ করতে পারবে না। (১/৩১)
- বেহেশতি জেওর (হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী): "হায়েজ অবস্থায় কুরআন শরীফ স্পর্শ করা এবং তিলাওয়াত করা জায়েজ নেই।" (৮ম অধ্যায়, পবিত্রতা)
- ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফী): হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। (১/১৭৮)
সারমর্ম: তাই "মহিমান্বিত কুরআন" বলতে যদি শুধু আরবি মূল (মুসহাফ) বোঝানো হয়, তবে তা হায়েজ অবস্থায় পড়া, স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা জায়েজ নয়। তবে বাংলা অনুবাদ অংশটুকু পড়া যাবে।
২. কুরআনের তাফসীর হায়েজ অবস্থায় পড়া
হানাফি ফতোয়ায় তাফসীর পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদি বইটিতে মূল কুরআনের আয়াত সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয় এবং তা স্পর্শ করার সময় সরাসরি আয়াতের অক্ষর স্পর্শ না করা হয়।
বিধান:
- হায়েজ অবস্থায় তাফসীরের বই পড়া জায়েজ আছে, তবে শর্ত হলো—আরবি আয়াতের অক্ষরগুলো সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন না। আবার আয়াত তেলাওয়াতও করতে পারবেন না। পাতা উল্টানোর জন্য কাপড় বা লাঠি ব্যবহার করুন।
হানাফি মাশায়েখের মত:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "যেসব কিতাবে কুরআনের আয়াতের চেয়ে তাফসীরের অংশ বেশি, সেগুলো স্পর্শ করা জায়েজ, যদি আয়াত স্পর্শ করার ইচ্ছে না থাকে।" (১/১৭২)
- ফতোয়া হিন্দিয়া: "হায়েজ অবস্থায় তাফসীর ও হাদিসের কিতাব পড়া জায়েজ, কিন্তু কুরআনের আয়াত স্পর্শ থেকে বিরত থাকতে হবে।" (১/৩১)
- আহসানুল ফতোয়া (মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানভী): "তাফসীরে জালালাইন, মাআরিফুল কুরআন—এগুলো পড়া যায়, তবে আরবি আয়াত স্পর্শ না করা।" (২/৫৮৩)
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) এর ফতোয়া: "হায়েজ অবস্থায় তাফসীর পড়া জায়েজ, কারণ এটি কুরআন তিলাওয়াত নয়, বরং জ্ঞান অর্জন। তবে সতর্কতা হিসেবে হাত পবিত্র না থাকলে কাপড় বা টিস্যু দিয়ে পাতা উল্টানো উচিত।" (ফতোয়া উসমানি, ১/৪১৯)
সারমর্ম: কুরআনের তাফসীর (বিশেষত বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যাসম্বলিত বই যেমন মারেফুল কুরআন, ইমদাদুল কুরআন ইত্যাদি) হায়েজ অবস্থায় পড়া জায়েজ, তবে আরবি আয়াত সরাসরি স্পর্শ না করার শর্তে। মুখে পড়ার সময় তিলাওয়াতের নিয়ত না করা।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে দ্বীনের সহজ ও সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমীন।