ঈমান বাড়ানো ও তাকওয়া অর্জনের উপায় সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি (নারী) নিজের উপর দিন কে দিন হতাশ হয়ে যাচ্ছি। হাল ছেড়ে দিচ্ছি, ভালো করেই বুঝতে পারছি কলবটা প্রচুর কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ঘুরে ফিরে গুনাহ গুলো বার বার হয়ে যাচ্ছে। অনেক ভালো নেক আমলের নিয়ত করি, দেখা যায় হয়তো কিছু দিন বা সপ্তাহ খানেক করছি পরে আর কন্টিনিউ করা হয়ে উঠে না। কেমন জানো ভীষণ বিশৃঙ্খল জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। ফিতনা দায়ক সকল বিষয় সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে চলা হয় না, মাঝের মধ্যে চেষ্টা করি কিন্তু জোরালো চেষ্টা চালাতে ব্যার্থ হচ্ছি। আমি জেনারেল লাইনে পড়া ছাত্রী হঠাৎ করেই অনেক দিক থেকেই পরিবর্তন হই, দ্বীন সম্পর্কে জানার ও বুঝার চেষ্টা করি, আমার নিজের পরিবার তেমন দ্বীনদার না (৫ ওয়াক্ত সালাত পড়ে এমন আরকি)। পরিবার থেকে নানান বিষয় বাঁধা গ্রস্থ হয়েছি বিগত, এমন ও হতো আমাকে ইসলামিক প্ল্যাটফর্ম গুলো অনলাইন ক্লাস করতে দিবে না, ইসলামিক বই কিনতে দিবে না, শুধু হিজাব পড়তে বলতো কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আগের তুলনায় আসতে আসতে কিছু দিক থেকে পরিস্থিতি সহজ হয়ে এসেছে। কিন্তু তেমন কোনো সুশৃংখল দ্বীনি পরিবেশ নেই। নিজের জন্য উত্তম দ্বীনি পরিবেশ ও নিজের দ্বীনি ইলমের প্রচুর ঘাটতি অনুভব করি। পরিবর্তনের শুরুর দিকে(২১ সাল) এলোমেলো ভাবে দ্বীন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলাম, যেই ইসলামিক বই এর হাইপ হতো সেটাই কিনে ফেলতাম, নানান ইসলামিক বক্তাদের আলোচনা শুনতাম। (যেহুতু তেমন কোনো বুঝ ছিলো না) পরবর্তীতে বই কেনা বন্ধ রাখি (শুধু কোর্স রিলেটেড বই গুলোই এখন কিনি), নির্দিষ্ট একজন নির্ভরশীল শাইখ এর আলোচনা শুনি (ফিক্বহী বিষয়ে), আইওএম এর ফারজে আইন কোর্সটা করেছি।
কিভাবে ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করা যায়? কিভাবে ধারাবাহিক ইমল অর্জন ও আমল করবো?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার দ্বীন সম্পর্কে আগ্রহ ও পরিবর্তনের প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনি যে হতাশা ও অসঙ্গতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তা অনেক মুমিনের জন্যই স্বাভাবিক। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: “ঈমান কমে-বাড়ে; কমে গুনাহ ও অলসতায়, বাড়ে ইবাদত ও তাকওয়ায়।” (মাজমু’ ফাতাওয়া, ৭/২৪৮)
নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এবং উল্লিখিত সালাফি উলামাদের মতামত অনুসারে কিছু ব্যবহারিক নির্দেশনা দেওয়া হলো:
১. তাওবা ও ইস্তিগফার: গুনাহ থেকে ফেরার একমাত্র পথ
আল্লাহ বলেন:
“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সুরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)
শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন: “তাওবার শর্ত হলো: গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা এবং কারো হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।” (মাজমু’ ফাতাওয়া ইবন বায, ২৪/৩৬২)
আপনি বারবার গুনাহের মধ্যে পড়ছেন—এটি স্বাভাবিক, কারণ শয়তান মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। কিন্তু হতাশ হবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সকল আদম সন্তান গুনাহগার, আর সর্বোত্তম গুনাহগার তারা যারা তাওবা করে।” (তিরমিযী, হাদিস ২৪৯৯; সহিহ)
প্রতিকার:
- প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলার অভ্যাস করুন।
- প্রতিবার গুনাহ হওয়ার পর সাথে সাথে তাওবা করুন এবং দু’রাকাত সালাতুল তাওবা আদায় করুন।
- মনে রাখবেন, আল্লাহর রহমত আপনার গুনাহের চেয়েও বড়।
২. সালাত: ঈমান ও তাকওয়ার মূল ভিত্তি
সালাতই মুমিনকে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে (সুরা আল-আনকাবুত ২৯:৪৫)। শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: “সালাত সময়মতো আদায় করা ঈমানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।” (শারহুল মুমতি’, ২/২০)
আপনার পরিবার সালাত পড়লেও, আপনার নিজের সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হোন।
প্রতিকার:
- ফরজ সালাত জামাতের সাথে (মহিলারা ঘরে) আদায় করুন এবং সুন্নাত ও নফল সালাত (যেমন তাহাজ্জুদ) ধীরে ধীরে যোগ করুন।
- সালাতের পর নির্দিষ্ট দু‘আ পড়ুন: “আল্লাহুম্মা আ‘ইন্নী ‘আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবাদাতিক” (হে আল্লাহ, আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার শোকর ও তোমার উত্তম ইবাদাতে সাহায্য করো) – আবু দাউদ, হাদিস ১৫২২; সহিহ।
৩. কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝা: হৃদয়ের জ্বালানি
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “কুরআন না পড়লে হৃদয় মরে যায়।” (মাজমু’ ফাতাওয়া, ১৫/২১)
প্রতিকার:
- প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করুন, সাথে অর্থ বুঝার চেষ্টা করুন। অনুবাদ ও তাফসীর পড়ুন (যেমন শাইখ সা‘দীর তাফসীর বা ইবন কাসীরের সংক্ষিপ্ত তাফসীর)।
- নির্দিষ্ট কিছু আয়াত যেমন সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস বেশি পড়ুন।
৪. দ্বীনি ইলম অর্জন: সঠিক পথে থাকার চাবিকাঠি
আপনি ইতিমধ্যে আইওএম-এর ফারজে আইন কোর্সটি করেছেন—এটি খুব ভালো। এখন ধারাবাহিকভাবে শিখতে থাকুন।
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “ইলম অর্জনের জন্য কয়েকজন নির্ভরযোগ্য আলিমের কাছে পড়া বা তাদের বইপত্র পড়া জরুরি। এলোমেলোভাবে বিভিন্ন বক্তা শুনলে বিভ্রান্তি আসে।” (আল-ইরশাদ ইলা মাসাইলিল ‘ইলম, পৃ. ২৮)
প্রতিকার:
- বর্তমানে আপনি যাকে নির্ভরযোগ্য মনে করছেন (যেমন সালাফি শাইখগণ—ইবন বায, আলবানী, উসাইমীন, ফাওযান, রাবি‘ মাদখালী), তার থেকে ফিক্বহ ও আকীদা শিখুন। তাদের বই ও লেকচার থেকে নিয়মিত শিখুন।
- অনলাইনে “islamqa.info” বা “alifta.net” এর মতো সালাফি সাইট ব্যবহার করুন।
৫. ধারাবাহিক আমলের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় আমল হল যা নিয়মিত করা হয়, এমনকি পরিমাণে কম হলেও।” (বুখারি, হাদিস ৬৪৬৫)
প্রতিকার:
- একটি ছোট আমল বাছাই করুন যা আপনি প্রতিদিন করতে পারবেন। যেমন:
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার দু‘আ পড়া।
- প্রতিদিন কুরআনের ১ পৃষ্ঠা।
- প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট করে ইলম চর্চা।
- একবারে সব আমল চাপিয়ে না নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ান।
৬. সুসংগঠিত দ্বীনি পরিবেশ তৈরি
আপনার পরিবার দ্বীনদার না হলেও, আপনি নিজের জন্য একটি ছোট রুটিন তৈরি করতে পারেন। শাইখ ইবন কাইয়িম (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজের সময় সাজায়, আল্লাহ তার জন্য বরকত দেন।” (মাদারিজুস সালিকিন, ২/৩৮৫)
প্রতিকার:
- একটি ডায়েরি রাখুন যেখানে আপনার ফরজ আমল, কুরআন তিলাওয়াত, দৈনিক দু‘আ ইত্যাদি লিখুন।
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় (যেমন ফজরের পর) ইলম বা দু‘আর জন্য আলাদা করুন।
- অনলাইনে সালাফি বোনদের গ্রুপে যুক্ত হন, যেখানে একে অপরকে উৎসাহিত করা হয়।
৭. ধৈর্য ও দু‘আ: শক্তির উৎস
আপনার পরিবারের বাধা ও নিজের দুর্বলতা—এগুলো পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দেওয়া হবে।” (সুরা আয-যুমার ৩৯:১০)
প্রতিকার:
- প্রতিদিন দু‘আ করুন: “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ ওয়া কিনা ‘আযাবান নার”
- হতাশা দূর করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই দু‘আ পড়ুন: “আল্লাহুম্মা লা তাকিলনি ইলা নাফসি তরফাতা ‘আইনিন” (হে আল্লাহ, আমাকে চোখের পলকের জন্যও আমার নিজের উপর ছেড়ে দিও না) – আবু দাউদ, হাদিস ২৯৯৯; সহিহ।
৮. ফিতনা থেকে দূরে থাকা
আপনি লিখেছেন, ফিতনাময় বিষয় সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: “ফিতনার সময় মুমিনের কর্তব্য হলো নিজেকে রক্ষা করা, এমনকি পরিবার থেকেও দূরে থাকা যদি প্রয়োজন হয়।” (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ৭২)
প্রতিকার:
- সোশ্যাল মিডিয়া বা যেসব প্ল্যাটফর্ম ফিতনা ছড়ায়, সেগুলো থেকে দূরে থাকুন।
- বাড়িতে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে উটেন্সিল পড়া বা ইলম চর্চা করুন।
সংক্ষিপ্ত কর্মপরিকল্পনা:
- প্রতিদিন: ১০০ বার ইস্তিগফার + ১০ মিনিট কুরআন + ফরজ সালাত সময়মতো + কোনো একটি ছোট আমল (যেমন ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ ১০০ বার)।
- সাপ্তাহিক: একটি সালাফি শাইখের বই বা লেকচার থেকে ২-৩ টি বিষয় শিখুন।
- মাসিক: একটি নির্দিষ্ট আমলের অগ্রগতি মূল্যায়ন করুন (যেমন হিজাবের ব্যাপারে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা বা ইলমি কোর্স সম্পন্ন করা)।
- পরিবারের সাথে: মৃদু ভাষায় দ্বীনি বিষয়ে কথা বলুন, কিন্তু জোরাজুরি করবেন না। তাদের জন্য দু‘আ করুন।
সবশেষ:
আপনি যেভাবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এনেছেন, আলহামদুলিল্লাহ, এটাই সঠিক পদ্ধতি। মনে রাখবেন, জান্নাতের পথ কখনোই সহজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “জান্নাত কষ্ট ও পরিশ্রমে পরিবেষ্টিত, আর জাহান্নাম প্রবৃত্তির কামনায় পরিবেষ্টিত।” (বুখারি, হাদিস ৬৪৮৭)
আল্লাহ আপনার ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করুন, আমল ধারাবাহিক রাখার তাওফিক দিন এবং উত্তম পরিবেশ দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সুরা আয-যুমার ৩৯:৫৩, সুরা আল-আনকাবুত ২৯:৪৫, সুরা আয-যুমার ৩৯:১০
- হাদিস: তিরমিযী (২৪৯৯), বুখারি (৬৪৬৫, ৬৪৮৭), আবু দাউদ (১৫২২, ২৯৯৯)
- উলামাদের মতামত: ইবন তাইমিয়্যাহ (মাজমু’ ফাতাওয়া, ৭/২৪৮), ইবন বায (মাজমু’ ফাতাওয়া, ২৪/৩৬২), ইবন উসাইমীন (শারহুল মুমতি’, ২/২০), সালিহ আল-ফাওযান (আল-ইরশাদ, পৃ. ২৮), ইবন কাইয়িম (মাদারিজুস সালিকিন, ২/৩৮৫)