পার্সেন্টেজের চুক্তিতে কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ
Business and Job · Hanafi
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হলো নিম্নরূপ:
আমার একটা মোবাইল এক্সেসোরিজ এবং মোবাইল সার্ভিসিং এর দোকান আছে। দোকানে মোবাইল সার্ভিসিং করার সকল টুলস সেটাপও আছে। আমি এখন আমার দোকানে একজন মোবাইল টেকনেশিয়ান নিয়োগ দিতে চাই এই চুক্তিতে যে, সে মোবাইল সার্ভিসিং করে যেই পরিমাণ টাকা ইনকাম করবে সেই ইনকামের ৫০% আমাকে দিবে আর ৫০% সে নিজে রাখবে। এই ধরনের চুক্তিতে টেকনেশিয়ান নিয়োগ দেয়া জায়েজ হবে কিনা এবং কোন লোকসান হলে সেটার দায়ভার কাকে নিতে হবে?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
আপনার প্রস্তাবিত চুক্তিটি ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে মুদারাবা (অর্থ-শ্রমের অংশীদারিত্ব) বা শিরকাতুল আমল (শ্রমের অংশীদারিত্ব)-এর পর্যায়ভুক্ত। যেখানে আপনার দোকানের সকল সরঞ্জাম (পুঁজি ও সরঞ্জাম) আপনার পক্ষ থেকে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, এবং টেকনিশিয়ান তার দক্ষতা ও সময় দিয়ে কাজ করবে। লাভ একটি নির্ধারিত অনুপাতে (৫০:৫০) ভাগ হবে। এটি বৈধ এবং জায়েজ, যদিও কিছু ফকীহ একে মুদারাবা বলে গণ্য করেন না যেহেতু পুঁজি টাকা নয়, বরং সরঞ্জাম ও স্থান। তবে হানাফী ফিকহের বিশিষ্ট উস্তায ইবনে আবেদীন (রহ.) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া অনুযায়ী, এরূপ চুক্তি জায়েজ।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. চুক্তির বৈধতা:
- মুদারাবা ইসলামে বৈধ। মুদারাবা হচ্ছে এমন এক চুক্তি যেখানে এক পক্ষ অর্থ সরবরাহ করে (রাব্বুল মাল) এবং অপর পক্ষ শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে (মুদারিব), লাভ পূর্ব নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়। (সূরা বাকারা ২:২৭৫ এর ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম এ চুক্তি জায়েজ বলেছেন)
- হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব "আল-হিদায়া" তে বর্ণিত: ‘মুদারাবা জায়েজ, এতে একপক্ষের পুঁজি ও অন্যপক্ষের শ্রম এক করে লাভ ভাগ করে নেয়া হয়।’ (বাবুল কিরাদ)
- রদ্দুল মুহতার (৪/৫০৫) এ বলা হয়েছে: যদি কোনো মালিক নিজের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মী রাখেন যে প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি নির্ধারিত অংশ পাবে, তবে তা মুদারাবা বলে গণ্য হবে এবং জায়েজ হবে।
- আপনার দোকানে মোবাইল সার্ভিসিং এর সমস্ত টুলস ও সরঞ্জাম ইতিমধ্যে বিদ্যমান। তাই টেকনেশিয়ানকে নতুন টাকা দিয়ে ইনভেস্ট করতে হবে না, বরং তার দক্ষতা ও সময় প্রদান করবে। লাভ ৫০-৫০ ভাগে বণ্টনের শর্তটি উভয়ের সম্মতিতে হলে এটি জায়েজ ও বৈধ।
2. লোকসানের দায়ভার:
- মুদারার মূল নীতি: লোকসান শুধুমাত্র পুঁজির মালিক (আপনি) কে বহন করতে হবে। কেননা শ্রমদাতা (টেকনেশিয়ান) তার সময় ও শ্রম দিয়ে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে, তার উপর আর্থিক ক্ষতির বোঝা চাপানো যাবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫১০)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর মতে, মুদারাবায় লোকসান শুধু পুঁজির মালিকের ওপর বর্তায়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৪/৩৭১)
- তবে, টেকনেশিয়ানের ইচ্ছাকৃত অসতর্কতা, গাফলতি বা অমার্জিত আচরণের কারণে কোনো ক্লায়েন্টের মোবাইল নষ্ট হলে বা আর্থিক ক্ষতি হলে, সেক্ষেত্রে টেকনেশিয়ানকে জিম্মাদার (উত্তরদায়ী) হতে হবে। কারণ এটি খেয়ানত বা আমানতে খিয়ানতের পর্যায়ে পড়ে। (বাহিষ্ঠি জেওর, ২য় খণ্ড, মুদারার অধ্যায়)
- স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লোকসান (যেমন: ক্লায়েন্টের অভাব, মালামাল চুরি ইত্যাদি) সম্পূর্ণ আপনার পুঁজির উপরই বর্তাবে। টেকনেশিয়ানকে তা বহন করতে বাধ্য করা যাবে না।
সারসংক্ষেপ:
- জায়েজ: হ্যাঁ, চুক্তিটি সম্পূর্ণ জায়েজ, যদি উভয় পক্ষ সন্তুষ্ট থাকে এবং লভ্যাংশের অনুপাত নির্ধারিত হয়।
- লোকসানের দায়: স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লোকসানের দায়ভার মালিকের (আপনার)। টেকনেশিয়ানের ভুল-ত্রুটির কারণে লোকসান হলে তা টেকনেশিয়ানের উপর বর্তাবে।
পরামর্শ:
১. একটি লিখিত চুক্তি করা ভালো, যাতে স্পষ্টভাবে লাভ-লোকসানের শর্তাবলী উল্লেখ থাকবে। ২. টেকনেশিয়ানের দায়িত্ব ও কর্তব্য (যেমন: সেবার মান বজায় রাখা, ক্লায়েন্টের মালামালের নিরাপত্তা ইত্যাদি) উল্লেখ থাকা জরুরি। ৩. যদি সম্ভব হয়, লাভের অংশ নির্ধারণের পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি বা ভাতা নিয়ে আলোচনা করে নেয়া (যাতে টেকনেশিয়ানের হক আদায় হয় এবং দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ হয়)।
আল্লাহ তাআলা আপনার ব্যবসায় বারাকাহ দান করুন। (আমিন)
সোর্স ও রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (বাবুল কিরাদ)
- রদ্দুল মুহতার (৪/৫০৫-৫১০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৪/৩৭১)
- বাহিষ্ঠি জেওর (২য় খণ্ড, মুদারার অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানী (২য় খণ্ড, আধুনিক চুক্তি)