যদি কোনো নিকটাত্মীয়া গায়রে মাহরাম হয়, তাহলে তার সাথে পর্দা ফরজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: Mukta Aktar
Question Asked: 01 Jun 2026, 03:06 PM
Reviewed & Published: 01 Jun 2026, 03:18 PM
Views: 49
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তাদ।মানসিকভাবে অশান্তিতে আছি উস্তাদ।দয়া করে শরীয়ত অনুসারে কী করনীয় সেটা নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিবেন। জাযাকাল্লাহ খয়রন।
আমার স্বামীর নিজের কোনো বোন নাই।উনার এক খালাতো বোন আছে,উনার থেকে ১০-১১ বছরের বড়।ছোট থেকে এই বোনের অনেক আদর পাইছেন উনি,আর এই খালার বাসাতেই আমার স্বামী ছোট থেকে বড় হয়েছে।আমাদের বিয়ের ক্ষেত্রেও অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন এই বোন।অর্থাৎ উনার এই বোন অনেক কিছু করছেন উনার জন্য নিজের ছোট ভাই হিসেবে।কিন্তু উনার বোন এর দ্বীন এর বুঝ নাই,বেপর্দা(সামাজিকভাবে শালীন) চলাফেরা করে।আমার স্বামী মাহরাম-গায়রে মাহরাম মানার চেষ্টা করে।কিন্তু উনার এই বোনের ক্ষেত্রে কীভাবে আত্মীয়তা বজায় রেখে,বোনের এতো ঋণের প্রতি কৃতজ্ঞতা রেখে কীভাবে পর্দা রক্ষা করবে?উনার এই বোনের বাসায় না গেলে,দাওয়াত গ্রহণ না করলে উনারা কষ্ট পায়,রাগ করে।মনে করে ছোট থেকে এই ভাইয়ের জন্য এতো কিছু করার পরও তাদের ভুলে গেছে।
এক্ষেত্রে আমার স্বামী কি উনাদের মন রক্ষার জন্য উনাদের বাসায় যাওয়া আসা দেখা সাক্ষাৎ করতে পারবে?এটা কি জায়েজ হবে এভাবে যে যতটুকু সম্ভব উনার বোন এর সাথে কম কথা বলে,কম তাকিয়ে উনার বাসায় দাওয়াত গ্রহণ করা?
(২)আমার খুব রাগ হয় আমার স্বামী উনার বোনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলে,কথা বললে।এটা নিয়ে আমি আমার স্বামীর সাথে অভিমান করলে আমার গুনাহ হবে?যদি গুনাহ হয় তাহলে আমার আসলে কী করা উচিত?কারণ আমি নিজে মাহরাম মানার চেষ্টা করি,কিন্তু আমার স্বামী এক্ষেত্রে কঠোরভাবে মেইনটেইন করেনা দেখে আমার কষ্ট লাগে,গায়রতে লাগে....দ্বীনের প্রতি ছাড় দিচ্ছে এমন খারাপ লাগা কাজ করে।এই ব্যাপারগুলোর সাথে কীভাবে ডিল করা উচিত?
এগুলো নিয়ে সংসারি অশান্তি, দিনের পর দিন কথা বলাও অফ থাকে মাঝে মাঝে।

বিদ্র:আমরা দুজনেই দ্বীনের বুঝ রাখি।কিন্তু সব মেনে চলতে পারিনা সিচুয়েশনের দিকে তাকিয়ে।উক্ত বিষয়ের জন্য আমি আল্লাহর কাছেও দোয়াও করি নিয়মিত..

Answer

উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি, শরীয়তের দৃষ্টিতে খালাতো বোন (মামাতো/ফুফাতো/খালাতো সকলেই) আপনার স্বামীর জন্য গায়রে মাহরাম। অর্থাৎ, পূর্ণ পর্দা ও আলাদা অবস্থান ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ (সূরা আন-নূর: ৩১)
আরও বলেন: قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ (সূরা আন-নূর: ৩০)

এ কারণে আপনার স্বামীর জন্য ওই বোনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, একান্তে মিলিত হওয়া, বা তার বাড়িতে যাওয়া হারাম যদি পর্দার পূর্ণ বিধান পালন না করা হয়।


(১) স্বামী কীভাবে আত্মীয়তা ও কৃতজ্ঞতা রক্ষা করবে?

মূলনীতি: আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) ও কৃতজ্ঞতা আদায় করতে গিয়ে হারাম কাজ জায়েজ হয় না। আপনি যেমন উল্লেখ করেছেন, আপনার স্বামী শুধু "কম কথা বলে, কম তাকিয়ে" দেখা করলেও—যেহেতু বোনটি বেপর্দা চলাফেরা করেন এবং তার সাথে একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে (এমনকি বাড়িতে গেলেও, যদি ড্রয়িংরুমে একসাথে বসা হয়), তাহলে তা হারাম। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
لا يحل للرجل أن ينظر إلى الأجنبية، ولا أن يخلو بها، ولا أن يمسها (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭২)

তবে, সিলাতুর রাহিম ও কৃতজ্ঞতা শরীয়তসম্মত পন্থায় আদায় করা যায়, যেমন:

  • ফোনে (প্রয়োজনে) অতি প্রয়োজনীয় কথাবার্তা, এবং যাতে অশ্লীলতা না থাকে।
  • উপহার পাঠানো (স্বামীর নিজে না গিয়ে) অথবা অন্যের মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া।
  • যদি বাড়িতে দাওয়াত দেয়, তাহলে আপনাকে সাথে নিয়ে যাওয়া—এবং কোনো অবস্থাতেই স্বামী ও ওই বোনের মাঝে পর্দা বা আড়াল থাকতে হবে (যেমন পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা, বা আলাদা কক্ষে বসা)।

হাদীসে এসেছে:
لا يخلون رجل بامرأة إلا مع ذي محرم (বুখারী, ৩০০৬)
অর্থ: কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে মিলিত হবে না, মাহরাম ছাড়া।

তাই আপনার স্বামী যদি পর্দার বিধান পুরোপুরি মেনে ওই বোনের সাথে সাক্ষাৎ করেন (যেমন আপনার উপস্থিতি ও পর্দার আড়াল), তাহলে তা জায়েজ হবে। কিন্তু বর্তমানে বোনটি বেপর্দা, তাই তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ থেকে বিরত থাকাই উত্তম। এবং পরিবারের লোকদের বুঝিয়ে বলতে হবে যে, শরীয়তের হুকুম মানতেই এড়িয়ে চলা হচ্ছে—এতে কেউ রাগ করলে, তা তাদের নিজেদের দোষ, আপনার স্বামীর নয়।

ফাতাওয়া উসমানী (১/২৭২)-এ এসেছে:
যদি কোনো নিকটাত্মীয়া গায়রে মাহরাম হয়, তাহলে তার সাথে পর্দা ফরজ। বাধ্যতা ও কৃতজ্ঞতা কোনো অবস্থায় হারামকে হালাল করতে পারে না।


(২) স্ত্রীর রাগ ও অভিমান কি গুনাহ? কী করণীয়?

স্ত্রীর গায়রাত (ধর্মীয় আগ্রহ ও স্বামীকে হারাম থেকে রক্ষা করার চেষ্টা) মহৎ ও প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই গায়রাত যদি অভিমান, কথা বন্ধ রাখা, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাহলে তা গুনাহ হতে পারে। কারণ:

  • স্বামীর সাথে কথা বন্ধ রাখা বা রাগ করে থাকা সম্পর্কচ্ছেদের পর্যায়ে না গেলেও অসন্তোষ ও ঝগড়া নিষিদ্ধ।
  • হাদীসে এসেছে: لا يحل لمسلم أن يهجر أخاه فوق ثلاث ليال (বুখারী, ৬০৭৭) অর্থ: কোনো মুসলিমের জন্য তিন দিনের বেশি ভাইকে পরিত্যাগ করা জায়েজ নয়। (এখানে স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য, তবে স্ত্রীর কিছু অধিকার ভিন্ন)

তবে স্বামীকে সংশোধন ও নসীহত করার পদ্ধতি হলো:

১. নরম ও হিকমতের সাথে স্বামীকে বুঝানো যে—ওই বোনের সাথে পর্দার বিধান মানা আবশ্যক। আপনি কুরআন-হাদীসের প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে পারেন।
২. নিজে ধৈর্য ধরে দোয়া করতে থাকুন।
৩. রাগ বা অভিমান না করে গায়রাতকেও শারঈ পন্থায় প্রকাশ করুন—যেমন বলুন: "আমার গায়রাত হচ্ছে দ্বীনের প্রতি, আপনার প্রতি নয়। আমি চাই আপনি আল্লাহর হুকুম মেনে চলুন।"
৪. মনে রাখবেন, স্বামীকে জোর করা বা তার উপর চাপ সৃষ্টি করা অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আদর-স্নেহ ও নরম ভাষায় বোঝান।

সারকথা:

  • আপনার স্বামী গায়রে মাহরাম বোনের সাথে পর্দা মানতেই বাধ্য। যদি তিনি নম্রভাবে বুঝিয়ে দেন, তাহলে আত্মীয়স্বজনরা যদি রাগও করে, সেটা তাদের ব্যর্থতা, আপনার স্বামীর কোনো গুনাহ নয়।
  • আপনার নিজের উচিত সহনশীলতানরম নসীহত। অভিমান করা, কথা বন্ধ রাখা—এগুলো সংসারকে আরও বিপর্যস্ত করবে। বরং আপনি স্বামীকে দ্বীনের পথে সাহায্য করার জন্য সহযোগী হোন।

আল্লাহর কাছে দোয়া করুন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا (সূরা ফুরকান: ৭৪)

আল্লাহ তাআলা আপনাদের উভয়কে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সংসারে শান্তি দান করুন। (আমিন)

তথ্যসূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭২)
  • ফাতাওয়া উসমানী (১/২৭২)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৬২)
  • আল-হিদায়া (৪/৪৫৮)
  • সহীহ বুখারী (৩০০৬, ৬০৭৭)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.