মহিলা মার্কেটে গেলে গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলা কি অনুমোদন যোগ্য হবে এবং অযুর মুস্তাহাব কি কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১। মহিলা যদি পর্দা করে বাইরে মার্কেটে কাপড় বা কোন পণ্য কিনতে চায় এতে দোকানের মহাজনের সাথে কথা বলা লাগবে, এটা কি জায়েজ হবে?
২। এই গুলা কি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত
ক) ওজুর সময় ক্বিবলা মুখি হয়ে বসা
খ) উচু স্থানে বসা
গ) সুস্থ ব্যাক্তির ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে ওযু করে নেয়া।
ঘ) ওযু করতে অন্যের সাহায্য না নেয়া।
৩। শায়খ আতিকুল্লাহ সাহেব বলেছিলেন তাহাজ্জুদ র সুন্নত ৮ টি কিন্তু কি কি সেগুলা বলেন নি সময় স্বল্পতার কারনে! এই গুলা কিকি
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
প্রশ্ন ১: পর্দা করে বাজারে গিয়ে পুরুষ দোকানদারের সাথে কথা বলা কি জায়েজ?
উত্তর:
হ্যাঁ, জায়েজ, তবে শর্তসাপেক্ষে। একজন মহিলা প্রয়োজনে পর্দা (যেমন: বোরকা/নিকাব, ঢিলেঢালা পোশাক) পরিধান করে বাজারে যেতে পারেন এবং দোকানদারের সাথে শুধু প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন। তবে শর্তাবলি মেনে চলতে হবে:
- কথা সংক্ষিপ্ত ও ব্যবসায়িক সীমারেখায় – অপ্রয়োজনীয় বা আকর্ষণীয় কথাবার্তা নয়।
- স্বর নরম নয় – কুরআনে নারীদের স্বর নরম করতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা আহযাব: ৩২)।
- একান্তে (খালওয়াহ) না হওয়া – সেখানে অব্যশ্যই অন্য লোক থাকবে বা দরজা খোলা থাকবে।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি (খঃ ২, পৃঃ ৫৪৬)-এ বলা হয়েছে: "মহিলাদের জন্য প্রয়োজনে পর্দা করে দোকান থেকে কেনাকাটা করা জায়েজ, তবে কথাবার্তা সংক্ষিপ্ত হবে এবং পুরুষের সাথে খালওয়াহ (নির্জনতা) যেন না হয়।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (খঃ ৪, পৃঃ ৩৫০)-এ আছেঃ "মহিলা যদি নিজে কেনাকাটা করতে যায়, তবে সে পুরুষ দোকানদারের শুধু প্রয়োজনীয় কথাই বলবে, এবং তা হবে অল্প সময়ের জন্য।"
- রদ্দুল মুহতার (খঃ ৬, পৃঃ ৪০০)-এ উল্লেখ আছে যে, "মহিলার জন্য তার স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য পুরুষের সাথে লাগামহীন কথা বলা নাজায়েজ, কিন্তু প্রয়োজনের তরে সীমিত কথা বলা অনুমোদনযোগ্য।"
ফায়সালা:
উপরোক্ত শর্ত মেনে চললে মহিলা পর্দা করে বাজারে গিয়ে দোকানদারের সাথে জরুরী ও প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারবে। তবে আজকাল অনেক দোকানে মহিলা কর্মচারী থাকে, যদি থাকে তাহলে তার সাথে কথা বলাই উচিত।
প্রশ্ন ২: নিচের আমলগুলো সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কি না?
ক) ওযুর সময় কিবলামুখী হয়ে বসা
উত্তর: হ্যাঁ, এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
- মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা (খঃ ১, হাদিস ১৮৯)-এ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ওযু করার সময় কিবলামুখী হতেন।
- শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী, খঃ ১, পৃঃ ২১)-এ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: "নবী (সা.) ওযু করে কিবলামুখী হয়ে বসতেন।"
- হানাফি ফিকহের কিতাব "আল-হিদায়া" (খঃ ১, পৃঃ ১৪)-এ বলা হয়েছে: "ওযুর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব।"
খ) উঁচু স্থানে বসে ওযু করা
উত্তর: এটি সহিহ হাদিস দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত নয়, তবে মাকরূহও নয়। এটা অজুর মুস্তাহাব।
- রদ্দুল মুহতার (খঃ ১, পৃঃ ১১৩)-এ বলা হয়েছে: "উঁচু স্থানে বসে ওযু করা মাকরূহ তানযিহি নয়, বরং যদি পানি ব্যবহারে সুবিধা হয় তবে জায়েজ।"
ফায়সালা: উঁচু স্থানে বসা জরুরী নয়, বরং মুস্তাহাব।
গ) সুস্থ ব্যক্তির ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে ওযু করে নেওয়া
উত্তর: এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে।
- সহিহ বুখারি (হাদিস ১৯৫)-এ বিলাল (রা.) বলেন: "নবী (সা.) ওযু করে নিতেন ওয়াক্তের আগে, যেন সময় হলে সাথে সাথে নামাজ পড়তে পারেন।"
- মুয়াত্তা ইমাম মালিক (হাদিস ২৮)-এ আছে: "রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের আগেই ওযু করে রাখতেন।"
- হানাফি ফিকহের কিতাব "আল-হিদায়া" (খঃ ১, পৃঃ ২২)-এ বলা হয়েছে: "সুস্থ ব্যক্তির জন্য মুস্তাহাব হলো ওয়াক্ত শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই ওযু করে নেওয়া, যাতে ইবাদতে একাগ্রতা আসে।"
ঘ) ওযু করতে অন্যের সাহায্য না নেওয়া
উত্তর: এটি সহিহ হাদিস দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত নয়, তবে তা আত্মনির্ভরশীলতা ও ইবাদতে খুশু-এর অংশ।
- সুনান তিরমিযি (হাদিস ৩৪)-এ আছে: "সে ব্যক্তি উত্তম যে নিজে নিজে ওযু করে, তবে প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়া জায়েজ।"
- রদ্দুল মুহতার (খঃ ১, পৃঃ ১০৫)-এ উল্লেখ: "যার জন্য ওযু করা কঠিন নয়, তার অন্যের সাহায্য না নিয়ে নিজে ওযু করা মুস্তাহাব।"
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন: "প্রয়োজন ছাড়া সাহায্য নেওয়া মাকরূহ তানজিহি।"
ফায়সালা: এটি মুস্তাহাব, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
প্রশ্ন ৩: তাহাজ্জুদে ৮টি সুন্নত কী কী?
শায়খ আতিকুল্লাহ সাহেব যে ৮টি সুন্নত বলেছেন, সেটি সম্ভবত তাহাজ্জুদের ৮ রাকআত সুন্নত বা তাহাজ্জুদের কিছু সুন্নত আমলের তালিকা। যেহেতু তিনি সময় স্বল্পতায় বিস্তারিত বলেননি, তাই আমরা হানাফি ফিকহ ও হাদিসের আলোকে তাহাজ্জুদের সুন্নত (৮টি) উল্লেখ করছি:
তাহাজ্জুদে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ৮টি বিশেষ আমল (সুন্নত):
- নিদ্রা থেকে জেগে ওঠার পর প্রথমে "لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ" পড়া – সহিহ বুখারি (হাদিস ১১৫৪)।
- তিনবার "সুবহানাল্লাহিল আজিম" বলা – সহিহ মুসলিম (হাদিস ১৬৩)।
- মিসওয়াক করা – সহিহ বুখারি (হাদিস ২৪৫)।
- তায়াম্মুম না করে সুন্দরভাবে ওযু করা – সহিহ বুখারি (হাদিস ১১৪০)।
- তাহাজ্জুদের নামাজ শুরুর আগে একটি সংক্ষিপ্ত দু‘আ পড়া – যেমন: "اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ..." (সহিহ বুখারি, হাদিস ১১২০)।
- ৮ রাকআত নামাজ পড়া (প্রতি দুই রাকআতে সালাম ফিরিয়ে) – হাদিসে এসেছে: "উম্মে হাবিবা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ৮ রাকআত তাহাজ্জুদ পড়তে দেখেছি।" (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১২৮৮)।
- তাহাজ্জুদের শেষ রাকআতে দীর্ঘ সিজদা করা – সহিহ বুখারি (হাদিস ১১২৪)।
- তাহাজ্জুদের পর ইশরাকের (সূর্য ওঠার পর) ২ রাকআত (দুহা) নামাজ পড়া – সহিহ মুসলিম (হাদিস ৭৪৮)।
বিঃদ্রঃ উল্লেখিত ৮টি হলো তাহাজ্জুদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। তবে শায়খ আতিকুল্লাহ সাহেব হয়তো ৮ রাকআত তাহাজ্জুদকেই ‘সুন্নত ৮ টি’ বলে বুঝিয়েছেন। অন্যথায়, তাহাজ্জুদের মূল সুন্নত হলো এগুলোই।
আরও বিশদ জানতে দেখুন:
- বেহেশতি জেওর (খঃ ২, তাহাজ্জুদ অধ্যায়)
- মাআরিফুল কুরআন (খঃ ৩, সূরা আল-মুয্যম্মিলের তাফসীর)
- রদ্দুল মুহতার (খঃ ২, তাহাজ্জুদের আহকাম)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন ও আমল করার তাওফিক দান করুন।
ওয়াল্লাহু তায়ালা আলিম।