শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যদি অপমান করে ও ফোন ধরতে না চায়, তাহলে মাসের পর মাস তাদের ফোন না দিলে গুনাহ হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রথমত, জানিয়ে রাখছি, আপনার প্রতি আমাদের গভীর সহানুভূতি রয়েছে। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে এমন আচরণ সত্যিই কষ্টদায়ক। আপনি যে অপমান ও অবজ্ঞা সহ্য করছেন, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যারা মুমিনদের সম্মানহানি করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৮)
এখন আপনার প্রশ্ন: “মাসের পর মাস শ্বশুরবাড়ির লোকদের ফোন না দিলে কি গুনাহ হবে?”
ইসলামী দৃষ্টিকোণে সম্পর্ক রক্ষার বিধান
১. সিলাতুর রাহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) ফরজ বা ওয়াজিব। তবে এটি মূলত রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের জন্য প্রযোজ্য, যেমন- পিতা-মাতা, ভাই-বোন, চাচা-ফুফু ইত্যাদি। আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আপনার রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় নন; বরং তারা স্বামীর আত্মীয়। তাই তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ক্ষেত্রে সিলাতুর রাহিমের মতো কঠোর বিধান নেই। তবে ইসলাম সদাচরণ ও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়।
২. যদি আত্মীয়রা (রক্তসম্পর্কীয় হোক বা বৈবাহিক সূত্রে) অত্যাচার, অপমান ও কষ্ট দেয়, তাহলে শরিয়তে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার অনুমতি আছে। যেমন হাদিসে এসেছে:
"কোনো সৃষ্টির আনুগত্য স্রষ্টার নাফরমানিতে বৈধ নয়।" (বুখারি, মুসলিম)
অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নামে যদি আপনার ধর্মীয় বা মানসিক ক্ষতি হয়, তবে আপনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রাহ.) ফতোয়ায় লিখেছেন:
“যদি আত্মীয়রা কষ্ট দেয় এবং সম্পর্ক রক্ষায় গুনাহ বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকা জায়েয।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪২০)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রাহ.) বলেন:
“যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ওয়াজিব নয়; বরং মাকরূহও নয় যদি সম্পর্কচ্ছেদের নিয়ত না থাকে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৬)
আপনার বর্তমান করণীয়
- আপনি স্বামীর সাথে থাকেন এবং শ্বশুরবাড়ির সাথে দেখা-সাক্ষাতে সালাম ও সহজ ব্যবহার করেন—এটাই যথেষ্ট।
- আপনি নিজ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না, বরং তাদের অপমান ও অনীহার কারণে ফোন না দিচ্ছেন। এটি গুনাহ নয়।
- তারা আপনার ফোন ধরতে চায় না এবং আপনার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে—এই অবস্থায় ফোন না দেওয়ার কোনো গুনাহ নেই। বরং আপনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে নিজের মানসিক শান্তি রক্ষা করছেন, যা শরিয়ত-সম্মত।
ইমাম তহাবী (রাহ.) শারহু মাআনিল আসারে উল্লেখ করেছেন:
“কষ্টদায়ক আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা ফরজ নয়; বরং সহনীয় পর্যায়ে রেখে চলা উত্তম।”
গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
- ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুন। তিনি বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)
- প্রতিশোধ বা খারাপ ব্যবহার না করে নিজের ভালো আচরণ বজায় রাখুন।
- তাবিজ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন—শুধু কুরআনের আয়াত ও ইসলামি দুআ সম্বলিত তাবিজই জায়েয। শিরকি বা অপবিত্র কিছু ব্যবহার করবেন না।
- স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক রাখুন। যদি তিনি তাঁর পরিবারের সমালোচনা না করেন, তবে আপনার অবস্থান বুঝে তিনি সাপোর্ট করবেন।
চূড়ান্ত ফতোয়া
আপনার পক্ষ থেকে মাসের পর মাস শ্বশুরবাড়ির লোকদের ফোন না দেওয়ায় কোনো গুনাহ হবে না। কারণ তারা আপনাকে অপমান করে এবং আপনার ফোন গ্রহণ করে না। ইসলাম কষ্টদায়ক ও অসম্মানজনক সম্পর্ক জোরপূর্বক বজায় রাখতে বাধ্য করে না। তবে আপনার নিয়ত থাকা উচিত—যদি তারা সদাচরণ করে, তাহলে আপনিও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে প্রস্তুত।
আল্লাহ তাআলা আপনার терпение ও ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার শ্বশুরবাড়ির অন্তর নরম করুন। আমিন।
وَٱللَّهُ أَعْلَمُ بِٱلصَّوَابِ