স্বামীর শুধুমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করে। কুরআন, নবী রাসুল, জান্নাত জাহান্নাম কিছুই সে বিশ্বাস করে না। এমতাবস্থায় উক্ত স্বামীর সাথে সংসার করা যাবে কি?

Family Life · Hanafi

Questioner: Umma Salma
Question Asked: 20 May 2026, 03:29 AM
Reviewed & Published: 20 May 2026, 05:05 AM
Views: 7
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আ'লাইকুম। আমার বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে ৪ বছর। তার বাবা নেই। এতদিন সে বাংলাদেশে ছিল। তার স্বামী জার্মানিতে চাকরি করে। এই মাসে সে তার স্বামীর সাথে জার্মানিতে থাকা শুরু করে। এমতাবস্থায় সে বুঝতে পারে, তার স্বামীর ঈমান আগের অবস্থায় নেই। সে শুধুমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করে। কুরআন, নবী রাসুল, জান্নাত জাহান্নাম কিছুই সে বিশ্বাস করে না। এমন অবস্থায় আমার বান্ধবী অসহায় হয়ে পড়েছে। সে জার্মানির কিছুই চেনে না। এত বড় সমস্যা কাউকে বলতেও পারছে না। তার মা বলছে মানিয়ে নিতে, সংসার না ভাংতে। আমার প্রশ্ন হল, এমন অবস্থায় তার বৈবাহিক অবস্থা কি অব্যহত আছে? ইসলামের আলোকে তার এখন করনীয় কি?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة

প্রশ্নটির গুরুত্ব অপরিসীম। আপনার বান্ধবীর অবস্থা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং দুঃখজনক। ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিধান স্পষ্ট। নিম্নে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে উত্তর পেশ করা হলো।


১. স্বামীর ঈমানের অবস্থা ও তার পরিণতি

আপনার বান্ধবী যেহেতু নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছেন যে তার স্বামী শুধুমাত্র আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু কুরআন, নবী-রাসূল, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি অস্বীকার করে, তাহলে শরী‘আহর পরিভাষায় এ ব্যক্তি মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে গণ্য হবে। কারণ ঈমানের মৌলিক বিষয়সমূহের যেকোনো একটি অস্বীকার করলেই ব্যক্তি ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। (সূরা বাক্বারাহ: ২৮৫, সূরা নিসা: ১৩৬)

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি দীন পরিবর্তন করবে, তোমরা তাকে হত্যা করো।" (সহীহ বুখারী: ৩০১৭) – এটি মুরতাদের বৈষয়িক শাস্তি, যা প্রতিটি মুসলিম দেশের সাংবিধানিক আইন হওয়া উচিত। তাছাড়া বিয়ের বিধানের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


২. মুরতাদ হওয়ার কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের বিধান

হানাফী মাযহাবের কিতাবসমূহে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে:

  • إمتداد الفتاوى (ইমদাদুল ফাতাওয়া) – ২/৪৮২: "যদি স্বামী মুরতাদ হয়, তাহলে স্ত্রী তার থেকে পৃথক হয়ে যায় (নিকাহ ভেঙে যায়) এবং স্ত্রীর জন্য ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব।"
  • الدر المختار مع رد المحتار (রদ্দুল মুহতার) – ৩/২৪৫: "مَنْ ارْتَدَّ عَنْ الْإِسْلَامِ انْفَسَخَ نِكَاحُهُ مِنْ سَاعَتِهِ، سَوَاءٌ كَانَ الْمُرْتَدُّ الزَّوْجَ أَوِ الزَّوْجَةَ" – অর্থাৎ, "যে ব্যক্তি ইসলাম থেকে মুরতাদ হলো, তার নিকাহ তৎক্ষণাৎ ভেঙে যায়, চাই মুরতাদ স্বামী হোক বা স্ত্রী হোক।"
  • فتاوى عالمگيري (ফাতাওয়া আলমগীরী) – ১/২৮৪: একই বিধান উল্লেখ আছে।

সুতরাং, স্বামী মুরতাদ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাদের বিবাহ ভেঙে গেছে। তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর বৈধ নেই। আপনার বান্ধবী এখন তার (মুরতাদ) স্বামীর জন্য বৈধ স্ত্রী নন; একসঙ্গে থাকা জায়েয নয়। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকার কোনো সুযোগ নেই।


৩. স্ত্রীর করণীয়

পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও ইসলামী নির্দেশনা স্পষ্ট। নিম্নের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:

ক. অবিলম্বে পৃথক থাকা

যেহেতু নিকাহ ভেঙে গেছে, তাই তাদের একই ঘরে থাকা, একত্রে খাওয়া-দাওয়া করা, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা – সবকিছুই সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ। তাকে অবশ্যই তার স্বামীর (মুরতাদ) কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই মানিয়ে নেওয়া বা সংসার টিকিয়ে রাখা জায়েয নয়। মায়ের কথায় কান দিলে তিনি নিজেও ঈমানের বিপদে পড়বেন।

খ. ইদ্দত পালন

যদি তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) পালন করতে হবে। তবে যদি সম্পর্ক না হয়ে থাকে, তাহলে ইদ্দত নেই। ইদ্দতের সময় তিনি স্বামীর বাসায় থাকতে পারবেন না; বরং নিরাপদ অন্য কোনো স্থানে (যেমন কোনো মুসলিম পরিবারের কাছে, বা ইসলামী আশ্রয়কেন্দ্রে) অবস্থান করবেন। ইদ্দত শেষে তিনি অন্যত্র বিয়ে করতে পারবেন।

গ. আইনি সহায়তা নেওয়া

যেহেতু তিনি জার্মানিতে অবস্থান করছেন, সেখানে ইসলামী আইন বলবৎ নেই। তাই তাকে জার্মান আইনে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি তিনি জার্মানির কোনো ইসলামিক সেন্টার, মসজিদ বা মুসলিম সংগঠন (যেমন: Zentralrat der Muslime in Deutschland) এর সাথে যোগাযোগ করে একজন আলিম বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিতে পারেন। তারা তাকে আইনগত ও ধর্মীয় উভয় দিক দিয়ে গাইড করবে।

ঘ. পরিবার ও দেশে ফিরে আসা

তিনি যদি জার্মানিতে থাকা কঠিন মনে করেন, তাহলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা করতে পারেন। তার মা ও আত্মীয়দের বোঝানো উচিত যে এখানে সংসার টিকিয়ে রাখার নামে ঈমান ও দ্বীন নষ্ট করা জায়েয নয়। আব্বু না থাকলেও অন্য মাহরাম পুরুষ (যেমন ভাই, চাচা) থাকলে তাদের মাধ্যমে সাহায্য নিতে পারেন।

ঙ. স্বামীর জন্য দো‘আ

যদিও স্বামী মুরতাদ হয়ে গেছে, তবুও তার হেদায়েতের জন্য দো‘আ করা জায়েয। তবে তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সম্ভব তখনই, যদি তিনি আবার ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইদ্দতের মধ্যে তওবা করেন। ইদ্দতের ভেতরে ইসলাম গ্রহণ করলে নিকাহ পুনরায় জারি হবে (বিবাহ-ভঙ্গকারী কাজ না হলে)। কিন্তু ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে নতুন করে বিয়ে করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৫)


৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • মানিয়ে নেওয়ার উপদেশ সম্পূর্ণ ভুল। মায়ের কথায় রাজি হলে আপনার বান্ধবী নিজেও হারাম কাজে লিপ্ত হবে এবং তার ঈমানও বিপন্ন হতে পারে।
  • আবেগ বা অসহায়ত্বের কারণে দ্বীনের বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর কুফরী করে, তার উপর আল্লাহর গযব এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি।" (সূরা আলে ইমরান: ৯০)

উপসংহার

স্বামী মুরতাদ হওয়ায় তাদের বিবাহ ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। আপনার বান্ধবীর জন্য এখন একমাত্র সঠিক পথ হলো:

  1. স্বামী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া।
  2. ইদ্দত পালন করা (যদি প্রয়োজন হয়)।
  3. স্থানীয় ইসলামী সংস্থার সাহায্য নেওয়া।
  4. নিরাপদে বাংলাদেশে ফিরে আসার চেষ্টা করা।
  5. দ্বীনের উপর অটল থাকা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।

আল্লাহ তাআলা তাকে এ কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ও সঠিক পথপ্রদর্শন দান করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.