স্ত্রীকে মেসেজ ও ফোনে একাধিকবার ‘তালাক’ বলার শরয়ি বিধান কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার একটি তালাক-সংক্রান্ত বিষয়ে শরয়ি সমাধান জানতে চাই।
আমার স্বামী কয়েক মাস আগে একটি সামান্য তর্কের সময় আমাকে মেসেজে দুইবার “তালাক” বলেছিলেন। তখন আমাদের মধ্যে মেসেজে কথাবার্তা চলছিল যে তিনি কী চান এবং কেন এমন আচরণ করছেন। তিনি হঠাৎ মেসেজে পরপর দুইবার “তালাক” লিখে ফেলেন। এরপর আমি তাকে থামিয়ে দিই এবং বিষয়টি নিয়ে আর কথা না বাড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আবার ওইসময়ই মেসেজে আমাদের কিছু কথা হয়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম তিনি এমন করছেন কেন এবং তার কী সমস্যা হয়েছে। তখন তিনি বলেন, “আমি তোমার সাথে কথা বলব না। তালাক।” এইখানে তালাক কথাটি তিনি অন্য কথার পরে অর্থাৎ "আমি তোমার সাথে কথা বলবো না" এই কথাটির পরে বলেছিলেন। তখন আমার কাছে মনে হয়নি যে তিনি স্পষ্টভাবে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটি বলেছেন।
এরপর তিনি ফোনেও নতুন করে দুইবার “তালাক” বলেন। একবার বলার কিছু সময় পরে আবার আরেকবার বলেন। তারপর আমাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে।
পরবর্তীতে তিনি আমাকে জানান যে তিনি দুইবারের বেশি তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য রাখেননি। তিনি বলেন, আমাকে ভয় দেখানোর জন্য তিনি এসব কথা বলেছিলেন। তিনি আরও বলেন যে তিনি তিন তালাক দেননি; বরং দুই তালাকই দিয়েছেন এবং তার উদ্দেশ্যও ছিল দুই তালাক দেওয়া, এর বেশি নয়।
এই ঘটনার পর আমি বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং তালাক হয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা করি। আমার স্বামীও বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য বিভিন্ন আলেমের কাছে পরামর্শ নেন। প্রথমে একজন আলেমের কাছে গেলে তিনি বলেন যে তালাক হয়ে গেছে। কিন্তু পরে আরেকজন বড় আলেমের কাছে গেলে তিনি বলেন যে তালাক হয়নি। সেই ফতোয়ার ভিত্তিতে আমাদের মধ্যে আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
আমি আমার বাবার বাড়িতে থাকি। আমাদের বিয়ে প্রায় ৩ বছর আগে হয়েছে। কাবিন সম্পন্ন হয়েছে এবং শুধুমাত্র আমার ও তার পরিবার বিষয়টি জানে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠান করে আমাকে তাদের বাড়িতে তোলা হয়নি। ইনশাআল্লাহ আগামী ২–৩ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠান করে আমাকে তাদের বাড়িতে নেওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি আবার কারও মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে হয়তো তালাক হয়ে গেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
তাই উপরোক্ত ঘটনাগুলো বিবেচনা করে শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে জানালে উপকৃত হব যে, এই ক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে কত তালাক হয়েছে।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী আপনার স্বামী কয়েকটি পর্যায়ে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন বা লিখেছেন। ইসলামী শরিয়তে ‘তালাক’ একটি সুস্পষ্ট (সরীহ) শব্দ, যা উচ্চারণ করলে নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছাড়াই কার্যকর হয়। হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী:
- সরীহ তালাক (যেমন ‘তালাক’ শব্দ) উচ্চারণের জন্য নিয়ত শর্ত নয়। রাগ, হুঁশিয়ারি বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেও বললেও তা তালাক গণ্য হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫১)
- শুধুমাত্র অত্যাধিক রাগের কারণে ব্যক্তি যদি নিজের কথা বুঝতে অক্ষম হয় (যেমন পাগলামি বা জ্ঞান হারানো), তবে তালাক কার্যকর হবে না। আপনার বর্ণনায় স্বামী স্বাভাবিক তর্কের সময় বারবার তালাক বলেছেন, তাই তিনি নিজের কথা বুঝেই বলেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে।
ঘটনাপ্রবাহ ও তালাকের সংখ্যা:
- প্রথমে মেসেজে দুইবার ‘তালাক’ লেখা → ২টি তালাক।
- একই কথোপকথনে তিনি বলেন, “আমি তোমার সাথে কথা বলব না। তালাক” → এটি পৃথক আরেকটি তালাক (মোট ৩টি তালাক)।
- পরে ফোনে তিনি নতুন করে দুইবার ‘তালাক’ বলেন (একবার কিছু সময় পর আরেকবার) → এগুলো আরও ২টি তালাক।
সুতরাং মোট উচ্চারিত তালাকের সংখ্যা ৫টি। কিন্তু হানাফি ফিকহে একসাথে বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিনের অধিক তালাক দিলে শুধু তিন তালাকই কার্যকর হয়; বাড়তি তালাক গণ্য হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৪)
সিদ্ধান্ত: আপনার স্বামী বিভিন্ন সময়ে মোট যতবার ‘তালাক’ বলেছেন, তার মধ্যে অন্তত তিনটি তালাক কার্যকর হয়েছে। আপনার বিবাহ বিযুক্ত (বাইন) তালাকের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ভেঙে গেছে। এখন আপনি পুনরায় আপনার স্বামীর জন্য হালাল হবেন না, যতক্ষণ না তিনি আপনাকে তালাক দেওয়ার পর আপনি অন্য এক ব্যক্তির সাথে বৈধ বিবাহ করে সেই বিবাহ প্রাকৃতিকভাবে শেষ হয় (স্বামীর মৃত্যু বা তালাক) — এটি ‘হালালা’ নামে পরিচিত, যা সাধারণত উৎসাহিত নয়।
পরবর্তী করণীয়:
- আপনার ইদ্দত (তিন মাসিক ঋতু) পালন করুন। ইদ্দতের মধ্যে অন্য কোথাও বিবাহ দিতে পারবেন না।
- বর্তমানে আপনার স্বামীর সাথে কোনো প্রকার বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা জায়েজ নয়। তিনি যদি আপনাকে ফিরিয়ে নিতে চান, তবে উপরে উল্লিখিত ‘হালালা’ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
আল্লাহ তায়ালা আপনার কল্যাণ করুন এবং এই কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য দান করুন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুত তালাক)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৫১-৩৫৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৩০)
- বেহেশতি জেওর (দ্বিতীয় খণ্ড)