স্ত্রী যদি বলে আমাকে ছেড়ে দিতে চাও বলে দিও চলে যাব এরপর স্বামী যদি বলে আচ্ছা / আচ্ছা বলবো, তাহলে কি তালাক হবে?
Family Life · Hanafi
Question
২.কোন স্ত্রী যদি বলে আমাকে ভালো না লাগলে বলে দিও চলে যাব তুমার জীবন থেকে এমনিতে অভিমান করে বললে কি তালাক হয়?
Answer
উত্তর প্রদানে হানাফি ফিকহের মূলনীতি ও প্রামাণ্য কিতাবাদির ভিত্তিতে নিম্নরূপ বিশ্লেষণ ও ফতোয়া পেশ করা হলো:
প্রশ্ন ১
স্ত্রী বলল: "যদি আমাকে ছেড়ে দিতে চাও, বলে দিও, আমি চলে যাব।" স্বামী উত্তরে বলল: "আচ্ছা" বা "আচ্ছা বলব।"
-
তালাকের মূলনীতি: তালাক শুধুমাত্র স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও নির্দিষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "তুমি তালাক", "আমি তালাক দিলাম") ব্যবহারের মাধ্যমে পতিত হয়। অথবা স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফউইজ) প্রদান করা হলে স্ত্রীর নিজের পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার মাধ্যমেও তালাক পতিত হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫০)
-
স্বামীর "আচ্ছা" বা "আচ্ছা বলব" বলা: এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। এটি শুধুমাত্র স্ত্রীর কথার প্রতি সম্মতি বা উত্তর মাত্র। তাই এতে কোনো তালাক পতিত হবে না। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২০৬; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৮৫)
-
স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (পাওয়ার) দেওয়া থাকলে: যদি স্বামী আগেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে থাকে (যেমন: "তোমার ইচ্ছা হলে তালাক দিতে পারো"), তাহলে স্ত্রী যদি নিজেই তালাক প্রদান করে, তবে তালাক পতিত হবে। কিন্তু এখানে স্ত্রী তালাক দিচ্ছে না; বরং সে শর্ত আরোপ করছে ("যদি বলে দাও, আমি চলে যাব")। শর্ত পূরণ (স্বামী বলা) হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক নয়; বরং তালাকের জন্য স্বতন্ত্র ঘোষণা প্রয়োজন। (আল-হিদায়া, ২/৩৩৫; বাহেশতি জেওর, ৮/২২)
-
পরবর্তীতে স্বামী ছেড়ে দেওয়ার (তালাক দেওয়ার) ইচ্ছা করলেও স্ত্রী চলে না গেলে: যদি স্বামী মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় "আমি স্ত্রীকে ছেড়ে দেব" কিন্তু মৌখিকভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ না করে, অথবা স্ত্রীকে না জানিয়ে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না। তালাক পতিত হওয়ার জন্য অবশ্যই স্বামীর জবানে বা লিখিতভাবে স্পষ্ট তালাকের শব্দ ব্যবহার করতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৭০; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮০)
-
অভিমান বা রাগ করে বলা: যদি স্বামী বা স্ত্রী রাগান্বিত অবস্থায় এমন কথা বলে, কিন্তু রাগ এমন পর্যায়ের না হয় যে নিজের কথার নিয়ন্ত্রণ নেই (যেমন: মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যায়), তাহলে সাধারণ রাগ বা অভিমানের কারণে তালাক পতিত হলে তা কার্যকর হয়। তবে এখানে স্ত্রীর কথায় তালাকের ঘোষণা নেই, তাই তালাক পতিত হবে না। (শারহু মাআনি আল-আসার, ৩/২৭০; উসুলুশ শাশি, পৃ. ৫১)
প্রশ্ন ২
স্ত্রী বলল: "আমাকে ভালো না লাগলে বলে দিও, আমি তোমার জীবন থেকে চলে যাব।" (অভিমান করে)
-
এ ধরনের বাক্যে তালাক পতিত হবে কি? না, এতে কোনো তালাক পতিত হয় না। কারণ এটি একটি সাধারণ অভিমানপূর্ণ কথা, যা তালাকের ইচ্ছা বা ঘোষণা নয়। তালাকের জন্য স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শব্দ প্রয়োজন। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২১০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৯০)
-
শর্তযুক্ত তালাকের নিয়ম: যদি স্বামী বা স্ত্রী কোনো শর্তের সাথে তালাক যুক্ত করে, যেমন: "যদি আমি তোমাকে বলি চলে যাও, তাহলে তালাক" - তবে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। কিন্তু এখানে স্ত্রী শর্ত দিচ্ছে যে, "যদি তুমি বল, তাহলে আমি চলে যাব" - এটি তালাকের শর্ত নয়, বরং পৃথক হওয়ার শর্ত। তাই স্বামী "বলে দিলে"ও তালাক পতিত হবে না, যতক্ষণ না স্বামী নিজে তালাকের ভাষা ব্যবহার করে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৬২; আল-হিদায়া, ২/৩৪০)
সারসংক্ষেপ:
- প্রশ্ন ১: স্বামীর "আচ্ছা" বা "আচ্ছা বলব" বলায় তালাক হয় না। স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা থাকলেও তার কথায় তালাক পতিত হয়নি। স্বামী ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও স্ত্রী চলে না গেলে তালাক হয় না, কারণ তালাকের স্পষ্ট উচ্চারণ বা ইংগিত দরকার। অভিমান বা রাগ করে বললেও তালাক হয় না, কারণ তালাকের শব্দ ব্যবহার না।
- প্রশ্ন ২: অভিমান করে "ভালো না লাগলে বলে দিও চলে যাব" - এতেও তালাক পতিত হয় না।
সতর্কতা ও পরামর্শ:
- তালাক সংক্রান্ত বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করা উচিত। কোনো প্রকার দ্বিধা বা সন্দেহ থাকলে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের কাছে গিয়ে পরিষ্কার ফতোয়া গ্রহণ করা জরুরি।
- তালাকের শর্তযুক্ত আলোচনা বা ক্ষমতা প্রদান করলে তা স্পষ্টভাবে লিখে বা উক্ত মুখে নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি না হয়।
- রাগ বা অভিমানের সময় তালাকের কথা বলা থেকে বিরত থাকা সর্বোত্তম। কারণ হাদিসে এসেছে, "রাগের সময় তালাক দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়" (তবে তা নির্দিষ্ট শর্তাধীন)। (আবু দাউদ, ২১৯৪; ইবনে মাজাহ, ২০৪৭)
প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মাদ শফি)
- বাহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- আল-হিদায়া (মারগিনানি)
- শারহু মাআনি আল-আসার (ইমাম তাহাবি)
- উসুলুশ শাশি
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।