সে বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস না করলে কি কোন সমস্যা হবে??
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
হুবহু এমন কিনা মনে নেই। এ ধরনের কয়েকটা প্রশ্ন কয়েকবছর আগে করা হয়েছিল ওলি উল্লাহ হুজুর বলেছিল তালাক হবে না।এখন আবার চিন্তা আসতেছে ঠিক ভাবে প্রশ্ন করা হয়েছিল কিনা আর প্রশ্ন এমন ছিল কিনা নাকি কিছু বাদ গেছে। তখন হয়ত সব করা হয়েছিল ও।
আবার ধরেন স্বামী যদি মাঝে মাঝে বলে পাওয়ার দিয়ে আসবে যাতে স্বামীকে তালাক দিতে পারে স্ত্রী বা যাতে স্ত্রী তালাক দিলেও তালাক হয় মানে তালাকে তওফীজের পাওয়ার ওটা বুঝাত হয়ত শর্ত যুক্ত তালাকের না,মানে এভাবে কাবিননামায় গিয়ে ওটা করে দিয়ে আসবে আসলে মেয়েরাও তালাক দিতে পারে আর দিলে হয়।কিন্তু শর্ত যুক্ত করে এসব বলত না মানে যদি তুমি তালাক দাও তুমি তালাক হয়ে যাবে এমন কিছু না হয়ত।তাহলে কি কোন সমস্যা হয়?মানে এরপর কোন সময় স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে স্ত্রী তালাক বললে কি তালাক হবে? মানে মোটেও নিজেকে না দিয়ে?
আবার এভাবে যদি বলে ঠিকি সেম কথাকে আমি গিয়ে ওটা দিয়ে আসব তখন তুমি দিলেও হবে মানে সেম কথাকে এভাবে বললেও কি কোন সমস্যা হয়?
আর অনেক আগের কথা তহ এ বিষয়ে যদি সে মহিলা স্বামীকে আর জিজ্ঞেস না করে তাহলে কি কোন গুণাহ হবে? মানে স্বামীও যদি ভুল উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা বা কি বলতে হবে না জেনে খারাপ কিছু বলে ফেলতে পারে মনে হলে স্ত্রীর? আর স্ত্রীর যদি মনে হও ওসব শর্ত যুক্ত তালাকের মত করে বলে নি। তাহলে কি আর জিজ্ঞেস না করলে কোন সমস্যা হবে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার প্রশ্নটি একাধিক স্তরে বিভক্ত। আমি ক্রমান্বয়ে প্রতিটি বিষয়ের জবাব কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে দিচ্ছি।
প্রশ্ন ১: স্বামী যদি বলে "তুমি তালাক দিলেও তালাক হবে" (শর্ত ছাড়া, শুধু স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা বোঝাতে) এবং স্ত্রী পরে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে "তালাক" বলে—তাহলে কি তালাক হবে?
উত্তর: না, তালাক হবে না। কারণ ইসলামী শরীয়তে তালাক দেওয়ার মূল অধিকার স্বামীর হাতে। স্ত্রী নিজে থেকে তালাক দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামী তাকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তালাক-ই-তওফীজ) না করে। স্বামীর উক্ত বক্তব্য "তুমি তালাক দিলেও তালাক হবে" যদি কেবল তথ্যবোধক হয় এবং তাতে স্পষ্টভাবে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ না পায়, তাহলে তা তালাক-ই-তওফীজ গণ্য হবে না। ফলে স্ত্রীর মুখ থেকে "তালাক" শব্দ বের হলেও তা বৈধ তালাক হবে না।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার): "তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার জন্য স্বামীকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে যে, 'তুমি নিজের তালাকের মালিক' বা 'তোমার ইচ্ছায় তালাক হবে'। শুধু 'তালাক দিলেও হবে' বললে ক্ষমতা অর্পণ হয় না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: "যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে, 'তুমি তালাক দিলেও তালাক হবে' এবং এটা ক্ষমতা দেওয়ার নিয়তে না হয়, তাহলে তালাক কার্যকর হবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৫২)
সারমর্ম: আপনার পূর্বে করা প্রশ্নে ওলি উল্লাহ হুজুরের উত্তর সঠিক ছিল। তালাক হয়নি।
প্রশ্ন ২: স্বামী যদি বলে, "পাওয়ার দিয়ে আসব যাতে স্ত্রী তালাক দিতে পারে" (কাবিননামার মতো পদ্ধতিতে), কিন্তু শর্ত যুক্ত করে না—তাহলে পরে স্ত্রী স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তালাক বললে কি হবে?
উত্তর: যদি স্বামী কেবল ভবিষ্যতে ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে, কিন্তু বর্তমানে স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে তালাকের মালিকানা প্রদান না করে, তাহলে স্ত্রীর "তালাক" বলার কোনো প্রভাব নেই। হানাফী ফিকহে তালাক-ই-তওফীজ কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীকে বর্তমান সময়ে "তোমাকে তালাকের মালিক করলাম" বা এর সমার্থক বাক্য বলতে হবে। ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দ্বারা ক্ষমতা প্রদান হয় না।
উদাহরণ: স্বামী বলে, "আমি গিয়ে কাবিননামায় লিখিয়ে দেব" বা "ঠিক আছে, সেম কথাকে আমি গিয়ে দিয়ে আসব"—এগুলো বর্তমান মালিকানা প্রদান নয়, বরং ভবিষ্যতের ওয়াদা। তাই স্ত্রী পরে তালাক বললে তা কার্যকর হবে না।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- শরহু মা'আনিল আসার (ইমাম তাহাবী): "তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার জন্য স্বামীকে 'তুমি নিজের তালাকের মালিক' বা 'তোমার ইচ্ছায় তালাক' বলতে হবে। ভবিষ্যতের ওয়াদা দ্বারা তা সম্পন্ন হয় না।" (শরহু মা'আনিল আসার, ২/১০৫)
প্রশ্ন ৩: অনেক আগের ঘটনার জন্য স্ত্রী যদি স্বামীকে আর জিজ্ঞেস না করে, তাহলে কি গুনাহ হবে? বিশেষ করে যদি স্বামী ভুল উত্তর দিতে পারে বা না জেনে খারাপ কিছু বলতে পারে এই ভয়ে?
উত্তর: যদি স্ত্রীর নিশ্চিত ধারণা হয় যে তালাক হয়নি (যেমন: শর্তযুক্ত তালাক বা ক্ষমতা অর্পণ ছিল না), তাহলে তাকে আবার জিজ্ঞেস করতে হবে না। বরং অতিরিক্ত মাথাব্যথা করা অনর্থক। তবে যদি তার মনে সন্দেহ থাকে যে হয়তো কোথাও তালাকের ঘটনা ঘটে গেছে, তাহলে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে (স্বামী বা অন্য কেউ) জিজ্ঞেস করা জরুরি। স্বামী ভুল উত্তর দিতে পারে এই ভয়ে স্ত্রী যদি প্রশ্ন না করে, তাহলে তা গুনাহ নয়, তবে সতর্কতা হিসেবে আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।
কুরআনের নির্দেশ:
"وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ"
"যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৬)
ফিকহী কিতাবের আলোচনা:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): "যদি কোনো ব্যক্তি নিজের ইজতেহাদে নিশ্চিত হয় যে তালাক হয়নি, তাহলে তাকে নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে না। তবে কল্পনা ও সন্দেহ দূর করতে একজন মুফতির কাছে জিজ্ঞেস করা ভাল।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৪৫)
সারসংক্ষেপ:
- প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব: কোনো অবস্থাতেই স্ত্রীর মুখে "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক হবে না, যেহেতু স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করেননি।
- তৃতীয় প্রশ্নের জবাব: স্ত্রী যদি নিশ্চিত হয় যে তালাক হয়নি, তাহলে স্বামীকে জিজ্ঞেস না করা গুনাহ নয়। তবে যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে জিজ্ঞেস করা উচিত—তবে স্বামীর পরিবর্তে কোনো আলেমের কাছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)