রঙিন আবায়া বা বোরখা পরিধান করলে রঙ কেমন হওয়া উচিত শরীয়ত এর আহকাম অনুসারে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: samiha ferdous
Question Asked: 28 May 2026, 01:49 AM
Reviewed & Published: 28 May 2026, 05:32 AM
Views: 41
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রঙিন আবায়া বা বোরখা পরিধান করলে রঙ কেমন হওয়া উচিত শরীয়ত এর আহকাম অনুসারে?

Answer

রঙিন আবায়া বা বোরখা পরিধানের বিধান (Hanafi মতে)

ইসলামী শরীয়তে নারীর পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো সতর ঢাকা, ফিতনা থেকে বাঁচা এবং বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা। তাই আবায়া বা বোরখার রঙ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত:

১. উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙ পরিহার করা

যে রঙ অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বা ফিতনার কারণ হয়, তা পরা মাকরূহ (তাহরিমি বা তানযিহি)। যেমন:

  • উজ্জ্বল লাল, গোলাপি, কমলা, হলুদ, নীল প্রভৃতি।
  • চিকচিক বা ঝকঝকে রঙ (যাতে পুরুষের দৃষ্টি পড়ে)।

কুরআন ও হাদীসের দলিল:

আল্লাহ বলেন: "আর তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়; এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা উত্যক্ত হবে না।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পোশাক এমন হতে হবে যা নারীকে চিহ্নিত করে সতী-সাধ্বী হিসেবে, ফিতনায় না ফেলে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: "দুই শ্রেণির লোক জাহান্নামী... (এক) সেই নারী যারা পোশাক পরিহিত কিন্তু উলঙ্গ (অর্থাৎ স্বচ্ছ বা আঁটসাঁট পোশাক), আর তারা অন্যদের আকর্ষণ করে ও নিজেও আকর্ষিত হয়। তাদের মাথার চুল উটের কুঁজের মতো (উঁচু করে বাঁধা)। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তার ঘ্রাণও পাবে না।" (মুসলিম, ২১২৮)

২. পছন্দনীয় রঙের বিবরণ (Hanafi উসুলে)

Hanafi ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: রদ্দুল মুহতার, বাহিশতী জেওর, ফাতাওয়া উসমানী) নিম্নোক্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:

  • কালো রঙ: সর্বাপেক্ষা উত্তম ও অধিক সতর। সাহাবিয়াগণ কালো বোরকা পরতেন (আবু দাউদ, ৪১০১)। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে কালো পোশাকই উত্তম।
  • গাঢ় খাকি, গাঢ় নীল, গাঢ় সবুজ, বাদামি ইত্যাদি: এগুলোও উত্তম, কারণ এগুলো সাধারণত ফিতনা সৃষ্টি করে না।
  • সাদা: সাদা পোশাকও জায়েয, তবে এটি যদি স্বচ্ছ না হয় এবং নারীর শরীর ফুটে না ওঠে। অনেক আলিম এটিকে মাকরূহ বলেন নি, বরং সাদা সাধারণত পবিত্রতার প্রতীক।
  • হালকা রঙ (যেমন: পেস্ট, ফিকাহ ইত্যাদি): এগুলো যদি খুব আকর্ষণীয় না হয় এবং বাইরে বের হওয়ার সময় পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে, তাহলে জায়েয। তবে সাবধানতা অবলম্বন করাই উত্তম।

৩. বাড়ির ভেতর ও বাইরের পার্থক্য

  • মাহরাম পুরুষ ও নারীদের সামনে: যে কোনো রঙ জায়েয, তবে অশালীন বা স্বচ্ছ নয়।
  • বাইরে (অমাহরামের সামনে): এমন রঙ পরা উচিত যা সাধারণত সমাজে নারীর সতর ও শালীনতা রক্ষার জন্য নির্ধারিত হয়। সাধারণত কালো বা গাঢ় রঙই বেশি নিরাপদ।

৪. ফতোয়া ও আলিমদের বক্তব্য

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ উল্লেখ আছে: "নারীর জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় এমন পোশাক পরা জরুরি যা শরীর ঢাকে এবং ফিতনার কারণ না হয়। উজ্জ্বল রঙ পরিধান করা মাকরূহ।"
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা. বা.)-এ বলা হয়েছে: "নারীর জন্য এমন রঙের আবায়া পরা উচিত যা সাধারণত লজ্জা ও শালীনতার পরিচায়ক হয়। বাজারের সাধারণ নারীদের মতো উজ্জ্বল রঙ পরিধান করা ওরফাতের (প্রচলিত রীতি) বিপরীত।"
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) বলে: "নারীর পোশাকের রঙ কালো বা নিকটবর্তী হওয়াই সুন্নতের অনুসরণ, কারণ সাহাবিয়াগণ এরূপই করতেন।"

সারসংক্ষেপ (শেষ মতামত)

| রঙের ধরন | হুকুম (Hanafi) | কারণ | |-----------|----------------|------| | কালো, গাঢ় নীল, গাঢ় সবুজ, খাকি, বাদামি | অত্যন্ত উত্তম ও সুন্নত সম্মত | ফিতনা থেকে দূর, সতর উত্তমভাবে ঢাকে, বিনয় প্রকাশ করে | | সাদা, হালকা ধূসর | জায়েয (যদি স্বচ্ছ বা আকর্ষণীয় না হয়) | স্বচ্ছ না হলে ও ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে বৈধ | | উজ্জ্বল লাল, গোলাপি, হলুদ, কমলা, চিকচিক রঙ | মাকরূহ (তাহরিমি বা তানযিহি) | দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ফিতনার কারণ হয়, শালীনতার পরিপন্থী | | পেস্ট ও মৃদু প্যাস্টেল রঙ | মাকরূহ তানযিহি (নিকটতম উত্তম হলো বর্জন) | সামান্য আকর্ষণীয়; জরুরি অবস্থায় জায়েয, তবে পরিহার করাই ভালো |

শিক্ষা ও পরামর্শ

  1. সর্বোত্তম হলো কালো বা গাঢ় রঙের আবায়া পরিধান করা, যা সুন্নত ও সাহাবিয়াদের আমলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  2. রঙ নির্বাচনের সময় বিনয়, শালীনতা ও আত্মগোপনকে প্রাধান্য দিন।
  3. মনে রাখবেন, পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ফিতনা থেকে বাঁচা, তাই ফ্যাশন নয়, বরং ইসলামী আদর্শকে প্রাধান্য দিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। (আমিন)

সূত্র: কুরআন (সূরা আহযাব: ৫৯, সূরা নূর: ৩১), সহীহ মুসলিম (২১২৮), আবু দাউদ (৪১০১), রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী), ইমদাদুল ফাতাওয়া


আল্লাহ-ই ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.