প্রথম স্ত্রী রয়েছে তারপরও প্রতারণা করে বিয়ে করলে সংসার করা সম্পর্কে করণীয় কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: Ayesha Nizam — 0472
Question Asked: 06 Jun 2026, 08:45 AM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 09:00 AM
Views: 56
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন ডিভোর্সী মেয়ে
১৪/১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, অনাকাঙ্খিত কারণে ডিভোর্স হয়ে যায়, শুকর আলহামদুলিল্লাহ্।
- ৩/৪ বছর পর আমার নতুন করে বিয়ে হয়, রমাদানের ২৫ তারিখে, ৩ মাসের কাছাকাছি।
বিয়ের সময় তিনি আমাদের বলেছিলেন তার দুনিয়াতে কেউ নেই, তাকে পালক আনা হয়েছিল, সেখানে অত্যাচার নির্যাতন শিখার হয় থেকে তিনি একেবারে সেখান থেকে চলে এসেছেন, ইত্যাদি
• বিয়ের পর তাকে আমার কিছু বিষয়ে সন্দেহ হয়, আমায় ফোন ধরতে দিত না। একদিন অনেক জোড় করাই নিজের মুখে বলেন তার আগে বিবাহ হয়েছে, তার একটা ১৭ মাসের মেয়ে আছে এবং তার স্ত্রী ৭ মাসের গর্ভবতী।
মেয়ে অসুস্থ ছিল তাই হসপিটাল ছিল,, এ কথা শুনার পর মনে হলো আমার মাথায় আকাশ থেকে বাজ পড়েছে, এতোটা ক্ষত বিক্ষত হয়েছে আমার হৃদয় তা বলে বুঝাতে পারবো না, 🥀 এতো বড় আঘাত আমি নিতে পারছিনা, এই বিশ্বাসঘাতকতা, আমি উনাকে বিয়ের আগে বহুবার বলেছি যে আপনি কখনোই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না এটা আমি কখনোই মেনে নিতে পারবো না, জীবিত থাকে মৃতের মতো হয়ে যাবো, আমি আমার স্বামীর পাশে কখনোই কোনো নারীকে সহ্য করতে পারবো না।

এখন আমার কি উচিত?
সে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে, সে আমাকে ও তার আগের স্ত্রী দুজনকেই রাখতে চান (তার আগের স্ত্রী ও জানে না এই বিয়ের কথা) কিন্তু আমার জন্য ওই বোন কষ্ট পাক এবং তার সংসার নষ্ট আমি এটা কখনোই চায় না, আর আমি এটা কখনো মেনে ও নিতে পারবোনা। আমার পরিবার ও জানে না , উনারা কষ্ট পাবেন তাই বলিনি আর পরিস্থিতি ও খুব বাজে হয়ে যাবে,, আমার পরিবার ও তখন অপরিচিতোর মতো আচরণ করবে

আমাকে দয়া করে বলুন আমার কি উচিত, আমি ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি

Answer

উত্তর (Answer)

প্রিয় বোন, প্রথমেই আপনার মনের কষ্ট ও প্রতারণার যন্ত্রণা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। আসলে আপনার প্রশ্নটি দুটি মূল দিকের ওপর ভিত্তি করে: (১) স্বামীর প্রতারণা ও গোপন বিবাহের বিধান, (২) আপনার পূর্বের শর্ত (দ্বিতীয় বিবাহ না করার) এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়।


১. স্বামীর প্রতারণা (ধোঁকা) এবং এর ফিকহি বিধান

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র চুক্তি। এতে কোনো ধরনের প্রতারণা বা মিথ্যা বলা হারাম ও কবিরা গুনাহ। আপনার স্বামী আপনাকে বিয়ের আগে জানিয়েছিলেন যে তার দুনিয়ায় কেউ নেই, অথচ তার অপর স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। এটি স্পষ্ট প্রতারণা।

হানাফি ফিকহের বিধান:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কোনো স্ত্রীকে বিয়ের সময় স্বামী যদি তার আগের বিবাহ গোপন করে, তবে তা প্রতারণা (গিশ) হিসেবে গণ্য হবে। তবে এতে বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না, বরং স্ত্রীর জন্য বিবাহ ভঙ্গের অধিকার (ফাসখ বা খুলা) সৃষ্টি হয়।
  • রদ্দুল মুহতারফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে: যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহের সময় এমন কোনো দোষ বা তথ্য গোপন করে যা জানা থাকলে স্ত্রী কখনোই বিবাহে রাজি হতো না, তাহলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিবাহ ভেঙে দিতে পারে (ফাসখ) (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৩৯)।

আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে তার পূর্বের স্ত্রী ও সন্তানের কথা গোপন রেখেছে এবং আপনি যদি আগে জানতেন তবে তাকে বিয়ে করতেন না, তাহলে আপনি ইসলামি আদালত বা স্থানীয় মুফতির কাছে গিয়ে বিবাহ ভেঙে দেওয়ার আবেদন করতে পারেন। তবে স্বামী এখন চাইছে আপনাকে ও তার প্রথম স্ত্রী উভয়কে রাখতে, কিন্তু আপনি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে থাকতে রাজি নন।


২. আপনার পূর্বের শর্ত: "আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না"

আপনি বিয়ের আগে স্বামীকে স্পষ্ট বলেছিলেন: "আপনি দ্বিতীয় বিবাহ করলে আমি কখনো সহ্য করব না।" হানাফি মাজহাবে বিবাহের সময় স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে দ্বিতীয় বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বৈধ নয় এবং এই শর্ত বলবৎযোগ্য নয়। কারণ এটি স্বামীর একটি বৈধ ইসলামি অধিকার (চারটি বিবাহ) থেকে তাকে বিরত রাখে।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বিবাহ বা অন্য কোনো চুক্তিতে যদি এমন শর্ত থাকে যা কুরআন-সুন্নাহর অনুমোদিত কোনো অধিকার বাধাগ্রস্ত করে, তবে সেই শর্ত বাতিল গণ্য হবে (আল-হেদায়া, ২/২৮৯; রদ্দুল মুহতার, ৩/১২০)।

অর্থাৎ আপনার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে আপনি তাকে এ কারণে বাধা দিতে পারবেন না, যদি তিনি ন্যায়বিচার করেন (প্রথম স্ত্রী ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়সঙ্গত আচরণ)। তবে প্রতারণার প্রশ্নটি আলাদা। সেক্ষেত্রে আপনার জন্য বিবাহ ভাঙার অধিকার রয়েছে।


৩. বর্তমানে আপনার করণীয় (বিকল্পসমূহ)

বিকল্প ১: আপনি যদি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে থাকতে না চান – তাহলে স্বামীর থেকে তালাক বা খুলা নিন।

  • আপনি স্বামীকে বলতে পারেন: আপনার প্রতারণার কারণে আমি আপনার সাথে আর থাকতে চাই না। আমাকে তালাক দিন। যদি তিনি রাজি হন, তাহলে ইদ্দত শেষে আপনি স্বাধীন।
  • যদি তিনি তালাক দিতে অস্বীকার করেন, তাহলে আপনি খুলা নিতে পারেন—অর্থাৎ স্বামীকে কিছু মোহর বা অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করে নিন।
  • অথবা স্থানীয় ইসলামি আদালতে (বা মুফতি সাহেবের কাছে) প্রতারণার ভিত্তিতে ফাসখ (বিবাহ বাতিল) এর আবেদন করুন।

বিকল্প ২: আপনি যদি ধৈর্য ধরে থাকতে চান – তবে আপনার স্বামীর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি ন্যায়বিচার বজায় থাকলে শারিয়াহ আপনাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে থাকতে বাধা দেয় না।

  • তবে আপনি মনে করছেন এটি আপনার জন্য মানসিকভাবে অসম্ভব, এবং আপনি বিশ্বাসঘাতকতা বোধ করছেন। যদি আপনি কোনোভাবে সহ্য করে থাকতে পারেন তবে সওয়াব আছে। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন এটি আপনার ঈমান ও শান্তির জন্য ক্ষতিকর, তাহলে বিচ্ছেদ উত্তম।

বিশেষ নোট: আপনার স্বামী এখন ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু তিনি আপনাকে তার প্রথম স্ত্রীর অজান্তে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে রাখতে চান—এটি সঠিক নয়। দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক না হলেও, গোপন রাখা প্রতারণা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। স্বামীর উচিত উভয় স্ত্রীর কাছে সত্য প্রকাশ করা এবং ন্যায়বিচার করা।


৪. আপনার পরিবারকে জানানো ও পরামর্শ

আপনি লিখেছেন আপনার পরিবার এখনো কিছু জানে না। আপনি তাদের কষ্টের ভয়ে বলছেন না, কিন্তু যদি বিচ্ছেদ বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে সৎ ও সাহসী হওয়া ভালো। পরিবারকে জানালে তারা আপনাকে মানসিক ও ব্যবহারিকভাবে সাহায্য করতে পারে। তবে যদি আপনি মনে করেন এটি জানিয়ে দিলে পরিবার ভেঙে পড়বে বা আপনার নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাহলে ক্ষেত্র বিশেষে গোপন রাখা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু আদর্শ হচ্ছে একজন মুফতি বা আলেমকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা।


৫. উপসংহার ও ফাতাওয়া

  • আপনার স্বামী প্রতারণা করেছেন এবং এটি হারাম কাজ। আপনার জন্য তালাক বা ফাসখের অধিকার আছে।
  • আপনার পূর্ব শর্ত (দ্বিতীয় বিবাহ না করা) হানাফি মতে বলবৎযোগ্য নয়, তবে প্রতারণার কারণে বিবাহ ভাঙা যায়।
  • সর্বোত্তম পথ: আপনি যদি মানসিকভাবে বেঁচে থাকতে চান এবং দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়া মেনে নিতে না পারেন, তাহলে স্বামীর কাছে তালাক চান। অথবা ইসলামি আদালতে বিবাহ ভেঙে দিন।
  • মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়ায় বলেছেন: “যদি কেউ বিবাহে প্রতারণা করে থাকে (যেমন পূর্ব স্ত্রী-সন্তান গোপন করা), তাহলে ধোকাগ্রস্ত স্ত্রী বিবাহ ভেঙে দিতে পারে” (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/২৮)।
  • মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.)–এর মতে, স্বামীর সত্য গোপন রাখা বিবাহের স্থায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৩)।

অতএব, আপনি যদি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে থাকতে সম্পূর্ণ অক্ষম হন এবং স্বামী অন্য স্ত্রী রাখতে বদ্ধপরিকর, তাহলে আপনার জন্য বিচ্ছেদই উত্তম। আল্লাহ আপনাকে সহজ উপায় দান করুন।

দোয়া ও পরামর্শ: আপনি নিজেকে ধ্বংস করছেন বলে মনে হচ্ছে—অনুগ্রহ করে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চান। তাসবিহ, দোয়া ও ইসতিকারা পড়ুন। একজন অভিজ্ঞ মুফতি বা মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শক (কাউন্সেলর) এর সাথে কথা বলুন।


সূত্র:

  • কুরআন (সূরা আন-নিসা ৪:৩)
  • আল-হেদায়া (২/২৮৯) – “শর্ত বাতিল হওয়া”
  • রদ্দুল মুহতার (৩/৬২, ৩/১২০) – প্রতারণায় বিবাহ ভঙ্গ
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৩৯) – মিথ্যা তথ্য প্রদান
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৩) – গোপন বিবাহ
  • ফাতাওয়া উসমানি (৩/২৮) – প্রতারণার বিবাহ ভঙ্গ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.