প্রথম বিয়ে গোপন থাকলে দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার একজন বোন প্রেম করে পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের সময় তাদের সাক্ষী ছিলো ২ জন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ এবং একজন নারী । বিয়েতে মেয়ের কোনো অভিভাবক ছিলোনা ( অভিভাবক নিয়ে অনেক মতভেদ শুনেছি তাই এই বিষয়টি একটু ক্লিয়ার করে দিলে ভালো হবে) এরপর তারা কিছুমাস পরে পরিবারকে জানায় পরিবারের কাছে বিয়ের কথা গোপন রেখে শুধু একে অপরকে পছন্দ করার বিষয়টি জানায়। উভয় পরিবার রাজী ছিলো কিন্তু তখন আরোও সময় নেয়, এর মধ্যে মেয়ের দ্বীনের বুঝ আসে এবং সে ছেলের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তারপর একজন দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করে নেয়। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে ওই মেয়ের আগের বিয়ে টা কি সহিহ হয়েছিলো? যদি হয়ে থাকে তাহলে সে অন্য একজনের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আবার বিয়ে কি জায়েজ হয়েছে? এখনকার স্বামী এসব কিছুই জানেনা। গোপন বিয়েটি জায়েজ হয়ে থাকলে এখন ওর করণীয় কি? রেফারেন্স সহ জানালে উপকার হবে।
Answer
উত্তর:
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আপনার বোনের প্রথম বিয়েটি হানাফী মাযহাব অনুসারে সহীহ হয়েছে। দ্বিতীয় বিয়েটি বাতিল (অবৈধ) বলে গণ্য হবে। নিচে বিস্তারিত দলিল ও পরামর্শ দেওয়া হলো।
প্রথম বিয়ের বৈধতা (হানাফী মাযহাব)
হানাফী ফিকহে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারীর নিজের বিয়ে পড়ানোর অধিকার আছে। তবে অভিভাবকের (ওয়ালী) অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মাকরূহ হলেও বিয়ে সহীহ হয়। শর্ত হলো বিয়ের সময় দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী থাকতে হবে।
- সাক্ষীর শর্ত পূর্ণ: আপনার বোনের বিয়েতে দুইজন পুরুষ ও একজন নারী সাক্ষী ছিলেন। হানাফী মতে, দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী যথেষ্ট। (সূত্র: আল হিদায়া, ২/২৯৭; রদ্দুল মুহতার, ৩/২০)
- অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা: হানাফী মতে, অভিভাবক বিয়ের শর্ত নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, “প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজেই নিজের বিয়ে পড়াতে পারে।” (সূত্র: ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৪৭)
- গোপন বিয়ে: বিয়ে গোপন করা মাকরূহ হলেও বিয়ে সহীহ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “বিয়ে ঘোষণা করো।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৮৯৪) তবে ঘোষণা না করলে বিয়ে নষ্ট হয় না। (সূত্র: ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫)
সুতরাং প্রথম বিয়ে সহীহ। এটি ভেঙে যায়নি, কারণ তারা শুধু যোগাযোগ বন্ধ করেছিলেন, তালাক বা ফাসখ (বিচ্ছেদ) কিছুই হয়নি।
দ্বিতীয় বিয়ের অবৈধতা
প্রথম বিয়ে সহীহ থাকায় আপনার বোন তখন অন্য পুরুষের স্ত্রী। তাই দ্বিতীয় বিয়ে হারাম ও বাতিল। আল্লাহ বলেন, “আর বিবাহিতা নারীদেরকে (বিয়ে করা হারাম)” (সূরা আন-নিসা: ২৪)। দ্বিতীয় বিয়ে কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়, যদিও স্বামী অজ্ঞ থাকে।
করণীয়
- তওবা ও ইস্তিগফার: আপনার বোনকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং দ্বিতীয় বিয়ের পাপ থেকে ফিরে আসতে হবে।
- দ্বিতীয় স্বামী থেকে পৃথক হওয়া: দ্বিতীয় বিয়ে বাতিল বলে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথক হতে হবে। কোনো প্রকার দৈহিক সম্পর্ক রাখা জায়েজ নেই। যদি সম্পর্ক থেকে সন্তান হয়, তবে তা নাজায়েজ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে।
- প্রথম স্বামীর সাথে সম্পর্ক:
- যদি প্রথম স্বামী দ্বীনদার ও সৎ হয়, তবে তার সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা উচিত।
- যদি প্রথম স্বামী দ্বীনদার না হয় অথবা সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সম্ভব না হয়, তাহলে খুলা বা তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। যেহেতু তারা আলাদা হয়ে গেছে, তাই উভয় পক্ষের সম্মতিতে কিংবা ইসলামী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ সম্পন্ন করা জরুরি।
- দ্বিতীয় স্বামীকে সত্য জানানো: এখনকার স্বামীকে বিষয়টি জানানো আবশ্যক। কারণ তিনি ধোঁকায় আছেন এবং তার সাথে সম্পর্ক রাখা চরম অন্যায়।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- প্রথম বিয়ে যদি কারো জানা না থাকে, তবুও তা আল্লাহর কাছে গণ্য। দ্বিতীয় বিয়ে করলে জিনার (ব্যভিচার) গুনাহ হবে।
- হানাফী মাযহাবের বাইরে (যেমন শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী) অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সহীহ নয়। কিন্তু প্রশ্নকারী হানাফী মাজহাব মানলে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ৩/২০, ৪/১২০
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া), ১/২৪৭
- আল হিদায়া (মারগীনানী), ২/২৯৭
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী), ২/৩৪৫
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী), খণ্ড ১–২ (বিবাহ অধ্যায়)