পিতার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া দলিল-পত্রে নাপাকি থাকলে করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ক)এগুলো মানুষের দলিল পত্র দুইলে তো নষ্ট হয়ে যেতে পারে এখন যদি নাপাকি লেগে শুকিয়ে যায় হালকা করে ঝেড়ে বস্তায় রেখে দিলে হবে পাক কাগজের সাথে ?
খ)সব কাগজে তো আর নাপাকি লাগে না আবার শিওর না যদি সব পাক নাপাক একসাথে রাখি গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
গ)বস্তায় ভড়ে আলমারি বা কোনো কিছুর উপরে রাখলাম নিচে বলতে আলমারির ভিতরে বা ওয়ারড্রপ এর ভিতরে আবরন থাকবে উপরে খালি যায়গায় কোরআন হাদিসে কিতাব আল্লাহ পাক রাসুল সাঃ এর নাম থাকে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
ঘ)ঘরের ভিতরে যেখানেই রাখি না কেনো নাপাকি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বস্তায় রেখে উপরে কাপড় দিয়ে রাখলে কোনো সমস্যা হবে কি?
Answer
উত্তর: বাবা'র দলিল-পত্র সংরক্ষণ ও নাপাকি-সম্পর্কিত হানাফি ফিকহি নির্দেশনা
প্রশ্নটি ক, খ, গ, ঘ – চারটি অংশে বিভক্ত। নিচে প্রতিটির জন্য দলিল-ভিত্তিক নির্দেশনা দেওয়া হলো।
ক) নাপাকি লেগে শুকিয়ে গেলে হালকা ঝেড়ে বস্তায় রাখা কি যথেষ্ট?
উত্তর: হ্যাঁ, শুকনো নাপাকি (যেমন ইঁদুর, টিকটিকির শুকনো বিষ্ঠা) কাগজ থেকে হালকা ঝেড়ে বা ঘষে ফেললে কাগজ পাক হয়ে যায়। তবে শর্ত হলো, নাপাকির স্থানীয় অস্তিত্ব (যেমন দাগ) না থাকা। হানাফি ফিকহে নাপাকি জিনিস (যেমন পেশাব, পায়খানা) শুকিয়ে গেলে তা খুশকি হিসেবে গণ্য হয় এবং তা সরিয়ে ফেললে নিচের বস্তু পাক হয়।
- রদ্দুল মুহতার: যদি কাগজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকে এবং তাতে নাপাকি লাগে, তাহলে ধোয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা ওয়াজিব। কিন্তু ধুলে যদি অক্ষর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে শুকনো কাপড় দিয়ে ঘষে বা ঝেড়ে নাপাকি দূর করলে তা যথেষ্ট। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৫৪, باب إزالة النجاسة)
- ফাতাওয়া উসমানী: শুকনো নাপাকি সরিয়ে ফেলার পর বস্তুটি পাক বলে গণ্য হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৪৬)
তাই কাগজে নাপাকি শুকিয়ে গেলে ঝেড়ে ফেলুন, তারপর বস্তায় রাখা বৈধ। তবে যদি ভিজা নাপাকি বা তরল কিছু লেগে থাকে, তবে তা ধুতে হবে; আর ধুতে গিয়ে কাগজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেই অংশ কেটে ফেলা অথবা সম্পূর্ণ কাগজটি কাপড়ে মুড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। কিন্তু যেহেতু এগুলো অন্যের প্রয়োজনীয় দলিল, তাই সম্ভব হলে শুধু নাপাকি স্থানটি কেটে আলাদা করে রাখুন।
খ) পাক ও নাপাক কাগজ একসাথে রাখলে গোনাহ বা ঈমানে সমস্যা হবে কি?
উত্তর: যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে কোন কাগজটি নাপাক আর কোনটি পাক, তাহলে সবগুলো একসাথে রাখলে গোনাহ হয় না এবং ঈমানের কোনো সমস্যা হয় না। তবে শর্ত হলো, আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে নাপাকিকে পাক হিসেবে ব্যবহার করছেন না, বরং অজ্ঞতা বা অসুবিধার কারণে রাখছেন।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): যদি কোনো বস্তুতে নাপাকি লাগার সন্দেহ থাকে, কিন্তু নিশ্চিত না হন, তাহলে তা পাকই গণ্য হবে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে জানা যায়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৬৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত কাগজ-পত্রের মধ্যে নাপাকি থাকা সন্দেহ হলেও তা ফেলে দেওয়া জরুরি নয়; বরং সম্ভব হলে পরিষ্কার করে রাখা উচিত। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৮০)
তবে উত্তম হলো – যদি সময় থাকে, তাহলে কাগজগুলো আলাদা করে দেখে নিন। অন্তত যে কাগজগুলোতে আল্লাহ বা রাসূল (সা.)-এর নাম আছে, সেগুলোকে অন্যদের থেকে পৃথক করে পরিষ্কার অবস্থায় রাখুন। তা না পারলে সব একসাথে রেখে দেওয়াতে কোনো গোনাহ নেই।
গ) বস্তায় করে আলমারির ভিতরে বা ওয়ারড্রপের নিচে রাখলে, আর তার উপরে কুরআন-হাদিসের কিতাব থাকলে কী হবে?
উত্তর: যদি বস্তায় কাগজগুলো থাকে এবং তার উপরে কুরআন বা আল্লাহর নাম লেখা কিতাব রাখা হয়, তাহলে তা অসম্মানজনক নয়। বরং উল্টো – নিচে দলিল-পত্র (যদিও তাতে আল্লাহর নাম থাকে) এবং উপরে কুরআন রাখা মানে কুরআনের সম্মান রক্ষা করা। তবে শর্ত হলো, বস্তাটি যেন নাপাক না হয় এবং যেখানে রাখছেন সেটি যেন অপবিত্র স্থান (যেমন টয়লেটের কাছে) না হয়।
- আল-হিদায়া: কুরআন শরিফকে সর্বদা উঁচু স্থানে রাখা মুস্তাহাব। অন্য কোনো কিতাব বা কাগজ তার নিচে রাখলে কোনো অসুবিধা নেই। (আল-হিদায়া, ১/৩৪, كتاب الصلاة)
- ফাতাওয়া উসমানী: যদি কোনো কাগজে আল্লাহর নাম থাকে, তবে তা মাটিতে বা নিচু স্থানে রাখা মাকরুহ; কিন্তু তা যদি কোনো বস্তা বা কাপড়ের ভেতরে আবৃত থাকে, তাহলে তা জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৩২)
আপনার বর্ণনায় – বস্তায় ভরে আলমারির নিচে রাখা, এবং উপরে কুরআন-হাদিসের কিতাব থাকা – এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে কোনো গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা নেই।
ঘ) ঘরের ভেতরে বস্তায় রেখে উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে নাপাকির সম্ভাবনা থেকে বাঁচা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা একটি ভালো ব্যবস্থা। তবে নাপাকির সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর করতে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
১. বস্তাটি যেন মোটা ও মজবুত হয়, যাতে ভেতরে পোকামাকড় বা ইঁদুর সহজে প্রবেশ করতে না পারে।
২. বস্তার মুখ শক্ত করে বেঁধে দিন।
৩. কাপড়টি পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। যদি কাপড়ে নাপাকি লাগে, তবে তা বস্তার ভেতরে পৌঁছাবে না, যতক্ষণ না তা ভিজে যায়। তাই বস্তাটিকে ভেজা স্থান থেকে দূরে রাখুন।
৪. সম্ভব হলে বস্তাটি একটি তাকে বা উঁচু স্থানে রাখুন, যাতে নিচ থেকে কোনো পানি বা নাপাকি না লাগে।
- রদ্দুল মুহতার: নাপাকি থেকে বাঁচার জন্য কোনো বস্তুকে ঢেকে রাখা বা উচ্চস্থানে রাখা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩১৬)
- বেহেশতি জেওর: পবিত্র জিনিসকে নাপাকি থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব; সেজন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। (বেহেশতি জেওর, তৃতীয় ভাগ, পবিত্রতা অধ্যায়)
উপসংহার:
- কাগজে নাপাকি শুকিয়ে গেলে ঝেড়ে ফেলুন, তারপর বস্তায় রাখুন।
- পাক-নাপাক নিশ্চিত না থাকলে একসাথে রাখায় গোনাহ নেই।
- বস্তায় রেখে কুরআনের নিচে রাখা বৈধ, বরং এটি সম্মানের প্রতীক।
- উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা উত্তম, কিন্তু নাপাকির স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যান।
- সর্বোত্তম পন্থা: কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাহায্যে দলিলগুলো বাছাই করে ফেলে দিন; যাতে আল্লাহ ও রাসূলের নামসম্বলিত কাগজগুলো যথাযথ সম্মানের সাথে সংরক্ষিত হয়। তবে সময় ও সামর্থ্যের অভাবে এখনই তা সম্ভব না হলে, বর্তমান ব্যবস্থায় গুনাহ নেই।
সংশ্লিষ্ট হানাফি গ্রন্থ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)
- আল-হিদায়া (মারগিনানী)
- বেহেশতি জেওর (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)