অতিরিক্ত ঘুম দূর করার ইসলামিক উপায় কি?

Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi

Questioner: Al Aisha
Question Asked: 05 Jun 2026, 11:43 PM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 12:07 AM
Views: 53
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

অতিরিক্ত ঘুম দূর করার উপায়, কিভবে ফজর এর পরে কোনো ঘুম ঘুম ভাব ছাড়া সজাগ থাকতে পারি,আর নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতে পারি।
সহিহ হাদিস দারা এর কোনো আমল এবং উপায় আছে কি?

Answer

উত্তর: অতিরিক্ত ঘুম দূর করার উপায় ও তাহাজ্জুদ ও ফজরের পর সজাগ থাকা

প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার: ফজরের পর ঘুম দূর করে সজাগ থাকা এবং নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার জন্য সহিহ হাদিস ভিত্তিক আমল ও উপায় কী?


▎ভূমিকা

ঘুম আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নেয়ামত, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম, বিশেষ করে ফজরের পর ঘুমানো, বরকত ও ইবাদত বিনষ্ট করে। ফজরের সময় ফেরেশতাদের উপস্থিতি ও রিজিক বণ্টনের সময়, তাই এই সময় ঘুমিয়ে থাকা মুমিনের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে তাহাজ্জুদ সালাত নবী (ﷺ)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও মুমিনের সম্মান। সহিহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে নিচে কিছু কার্যকরী উপায় বর্ণনা করা হলো।


১. রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো এবং ইবাদতের নিয়ত করা

নবী (ﷺ) বলেন:

«كَانَ يَنَامُ أَوَّلَ اللَّيْلِ وَيُصَلِّي آخِرَ اللَّيْلِ» "তিনি (ﷺ) রাতের প্রথম অংশে ঘুমাতেন এবং শেষ অংশে সালাত আদায় করতেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৬; সহিহ মুসলিম)

উপায়: ইশার পর অপ্রয়োজনীয় কাজ না করে তাড়াতাড়ি ঘুমানো। ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদে জাগার নিয়ত করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে জাগার ইচ্ছা করে ঘুমায়, কিন্তু ঘুম তাকে জাগাতে বাধা দেয়, তবে তার নিয়তের সওয়াব পূর্ণ হবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৯)


২. ফজরের পূর্বে জাগার জন্য ব্যবহারিক ব্যবস্থা

  • আলার্ম ঘড়ি বা মুবাইল সেট করুন ফজরের ৩০-৪০ মিনিট আগে, যাতে তাহাজ্জুদের জন্য সময় থাকে।
  • পরিবার বা বন্ধুদের সাথে চুক্তি করুন যাতে তারা ফোন করে ডেকে দেয়।
  • ওযু করে ঘুমান – নবী (ﷺ) বলেন: "তোমরা যখন ঘুমাতে যাও, তখন নামাজের ওজুর মতো ওজু করে নাও।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭) ওযু অবস্থায় ঘুমালে জাগরণ সহজ হয় এবং শয়তান কম প্রভাব ফেলে।

৩. ফজরের পর ঘুম না দেওয়ার জন্য করণীয়

ফজরের পর ঘুম মাকরুহ (অপছন্দনীয়) এবং বরকত নষ্ট করে। নবী (ﷺ) ফজরের পর সূর্যোদয়ের আগে ইবাদতে মশগুল থাকতেন। সাহাবায়ে কেরাম এই সময় ঘুমাতেন না।

উপায়:

  1. ফজরের নামাজের পর সূর্যদয় পর্যন্ত জিকির-আযকার করা – নবী (ﷺ) ফজরের পর সূর্যোদয়কালীন সময় বসে বসে তাসবীহ, তাহলীল ও দরূদ পড়তেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০)
  2. কুরআন তিলাওয়াত করা – বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন, ওয়াক্বিয়া বা অন্যান্য সূরা।
  3. সূর্যোদয়ের ১৫-২০ মিনিট পর ইশরাকের (চাশতের) নামাজ পড়া – এটি নফল সালাত, যা দুটি রাকাত পড়লে হজ ও উমরার সওয়াব পাওয়া যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪৯)
  4. হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করা – শরীর সতেজ রাখে।
  5. ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধৌত করা

শায়খ ইবনু বায (রহ.) বলেন: "ফজরের পর ঘুমানো জায়েয নয়, কারণ এ সময় ফেরেশতারা রিজিক বণ্টন করেন এবং দোয়া কবুল হয়। সাহাবারা এই সময় কখনো ঘুমাতেন না।"


৪. দিনের বেলা ‘কায়লুলা’ (দুপুরের সংক্ষিপ্ত ঘুম) গ্রহণ করা

কায়লুলা (দুপুরের ঘুম) তাহাজ্জুদ ও ফজরের পর সজাগ থাকতে সাহায্য করে। নবী (ﷺ) বলেন:

«تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً» (সহিহ বুখারি) – এবং সাহুরের মতো কায়লুলাও নফল ইবাদতের জন্য শক্তি যোগায়।

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "কায়লুলা মুমিনের জন্য সাহুরের মতো; এটি রাতের ইবাদতে শক্তি দেয়।"

নিয়ম: যুহরের আগে ১৫-৩০ মিনিটের ঘুম (অত্যাবশ্যক না হলে বেশি নয়)। এটি মস্তিষ্ককে সতেজ করে এবং রাতে সহজে জাগতে সাহায্য করে।


৫. তাহাজ্জুদ সহজ করার জন্য আমল

  • গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা – গুনাহ ইবাদতের তাওফিক কমিয়ে দেয়। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন: "গুনাহ মানুষকে তাহাজ্জুদ থেকে বঞ্চিত করে।"
  • দিনের বেলা পাপাচার থেকে দূরে থাকা – বিশেষ করে চোখ, কান ও জিহ্বার গুনাহ।
  • ইখলাস (একনিষ্ঠতা) – শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জাগার অভ্যাস গড়ে তোলা।
  • দু‘আ করা – নবী (ﷺ) শিখিয়েছেন: اللَّهُمَّ بِكَ أَصْبَحْنَا وَبِكَ أَمْسَيْنَا... এছাড়া رَبِّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ – "হে আল্লাহ, আমাকে আপনার স্মরণ, শোকর ও উত্তম ইবাদতের তাওফিক দিন।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২২, সহিহ)
  • মাহে রমজানের অভ্যাস ধরে রাখা – রমজানে তাহাজ্জুদ সহজ হয়, পরে তা ধরে রাখা জরুরি।

৬. হাদিসে বর্ণিত বিশেষ আমল

  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়া – শয়তান থেকে সুরক্ষা দেয় এবং জাগরণ সহজ হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
  • ঘুম থেকে জেগে বলবেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ – "সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি মৃত্যুর পর আমাদের পুনরায় জীবিত করলেন, আর তার কাছেই পুনরুত্থান।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)
  • জাগার পর নাক পরিষ্কার করে ৩ বার কুলি করা – এটি ঘুম দূর করে। (সহিহ সিরাত)
  • শেষ রাতে উঠে প্রথমে নবী (ﷺ)-এর মত ২ রাকাত হালকা সালাত পড়া (তাহাজ্জুদের শুরুতে) – সহিহ বুখারি।

৭. শায়খগণের পরামর্শ

  • শায়খ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদে জাগতে চায়, সে যেন ফজরের পর কায়লুলা করে এবং রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমায়।"
  • শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: "ফজরের পর ঘুম শয়তানের অভ্যাস; বরং এ সময় জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত।"

উপসংহার

সহিহ হাদিস ও সালাফের আমল মোতাবেক অতিরিক্ত ঘুম দূর করার এবং তাহাজ্জুদ ও ফজরের পর সজাগ থাকার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো: ১. রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো ও সঠিক নিয়ত, ২. কায়লুলা করা, ৩. ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত ইবাদতে মগ্ন থাকা, ৪. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও ইখলাসের সাথে দু‘আ করা।

আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাই তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ – "আমার তাওফিক শুধু আল্লাহর কাছ থেকে।" (সূরা হুদ: ৮৮)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.