অসুস্থ অবস্থায় হজ করার বিধিবিধান সম্পর্কে জানতে চাই
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আমি খুবই অসুস্থ, বসতে পারিনা বেশিক্ষণ, হাঁটতে পারি না তেমন। কিন্তু আমার হজ করার খুব ইচ্ছা ইন শা আল্লাহ। আমার উপর কি হজ ফরজ? এবং আমার কি করা উচিত? জানালে আমি খুব উপকৃত হব ইন শা আল্লাহ। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রথমেই আপনার অসুস্থতার জন্য আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন এবং আপনার হজের ইচ্ছা পূরণের তাওফিক দিন। আমিন।
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্ণিত শারীরিক অবস্থার (বসতে না পারা, হাঁটতে না পারা) কারণে বর্তমানে হজ্বে যাওয়া ফরজ নয়। তবে অতীতে আর্থিক সামর্থ্য এবং শারীরিক সক্ষমতা থাকাবস্থায় হজ্ব না করে থাকলে কারো মাধ্যমে হজ তথা নায়েব (প্রতিনিধি) পাঠিয়ে হজ আদায় করা ফরয।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও ফিকহি দলিল:
১. হজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলী (হানাফি মাযহাব মতে)
হজ ফরজ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হওয়া জরুরি:
- শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য (ইস্তিতাআত): শরীর ও মন সুস্থ থাকা, এবং হজের খরচ বহনের সক্ষমতা থাকা।
- যাতায়াতের সামর্থ্য: নিজে হজে যেতে সক্ষম হওয়া বা প্রতিনিধি পাঠানোর সামর্থ্য থাকা।
কুরআন ও হাদিস থেকে দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا"
"আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ ঘরের হজ করা মানুষের উপর ফরজ, যে সামর্থ্য রাখে সে পথে পৌঁছার।"
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
"হজ ফরজ হওয়ার জন্য শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য উভয়ই শর্ত। যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে অক্ষম (যেমন: বৃদ্ধ, অসুস্থ, পঙ্গু), তার উপর হজ ফরজ নয়। তবে যদি তার কাছে অর্থ থাকে, তবে সে অন্যের মাধ্যমে হজ করাতে পারে।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬২; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/২২৫)
২. আপনার বর্তমান অবস্থার বিধান:
- আপনি বসতে ও হাঁটতে অক্ষম, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী অক্ষমতা (শারীরিক অক্ষমতা)-এর অন্তর্ভুক্ত।
- হানাফি ফিকহে এই ধরনের অবস্থাকে "জায়েদুশ শাইখ" (চরম বৃদ্ধ) বা "মারিদুন লা ইয়ারজু বুরউহু" (আরোগ্য লাভের আশা নেই এমন রোগী)-এর মতো গণ্য করা হয়।
- ফলাফল: আপনার উপর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় হজ ফরজ নয়, কারণ আপনি নিজে হজ করতে সক্ষম নন। তবে অতীতে আর্থিক সামর্থ্য এবং শারীরিক সক্ষমতা থাকাবস্থায় হজ্ব না করে থাকলে, বদলি হজ্জ করানো ফরয।
(সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৪০; ফাতাওয়া ওসমানি, ২/৪৩৫; আল-হিদায়া, ১/২২৪)
৩. আপনার করণীয়:
ক. নায়েব (প্রতিনিধি) পাঠিয়ে হজ আদায়:
- আপনি যদি নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করতে পারেন, তবে অন্যের মাধ্যমে হজ করানো আপনার জন্য ফরয
- আপনার নিকট হজের খরচ (সফর খরচ + পরিবারের ভরণপোষণ) পরিশোধের পর অতিরিক্ত অর্থ আছে।
- আপনি নিজে হজ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং আরোগ্যের আশা নেই।
- প্রক্রিয়া: একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে (যিনি ইতিমধ্যে নিজের হজ আদায় করেছেন) নায়েব (প্রতিনিধি) বানিয়ে হজ করান। তাকে আপনার পক্ষ থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে এবং সমস্ত আমল আপনার নিয়তে করতে হবে।
- সতর্কতা: প্রতিনিধি নির্বাচনে সতর্ক হোন; তিনি যেন হজের নিয়ম-কানুন মানেন এবং ফরজ, ওয়াজিবগুলো যথাযথভাবে পালন করেন।
(সূত্র: ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/২২৮; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৪; বাহিশতি জেওর, ২/৪২-৪৩)
খ. নিজের রোগমুক্তির জন্য দোয়া ও চিকিৎসা:
- আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং চিকিৎসা গ্রহণ করুন। যদি আল্লাহ সুস্থতা দান করেন এবং হজের সামর্থ্য হয়, তবে সেটাই উত্তম।
গ. অসুস্থ অবস্থায় হজে যাওয়া:
- আপনার অবস্থায় (বসতে ও হাঁটতে অক্ষম) নিজে হজে যাওয়া অপছন্দনীয় (মাকরুহ) হতে পারে, কারণ এতে আপনার শারীরিক কষ্ট তো আছেই, বরং হজের আমলগুলো (যেমন: সাঈ, রমি, তাওয়াফ) ঠিকমতো করতে না পারলে হজের কোনো অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে।
- তবে কেউ যদি চরম কষ্ট সহ্য করে হজ করেন, তাহলে তার হজ সহিহ হবে, কিন্তু আপনি যদি আরোগ্যের আশা না থাকেন তাহলে নায়েব পাঠানোই উত্তম।
(সূত্র: ফাতাওয়া ওসমানি, ২/৪৩৭)
ঘ. অর্থ সঞ্চয় ও নিয়ত:
- আপনি যদি আর্থিকভাবে সক্ষম না হন, তাহলে হজ ফরজ নয়। তবে হজের ইচ্ছা রাখা ও সঞ্চয় করা সওয়াবের কাজ।
৪. গুরুত্বপূর্ণ হানাফি রেফারেন্স:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী): ২/৪৪০ ‘মারিদ লা ইয়ারজু বুরউহু’ এর প্রসঙ্গ।
- ফাতাওয়া ওসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ২/৪৩৫ ‘হজের শারীরিক সামর্থ্য’ অধ্যায়।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): ২/৪৬২-৪৬৪ ‘ইস্তিতাআত’ অধ্যায়।
- বাহিশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): ২/৪২-৪৩ ‘নায়েবের মাধ্যমে হজ’ অধ্যায়।
উপসংহার:
- আপনার উপর হজ ফরজ নয় বর্তমানে।
- তবে আপনি অন্যের মাধ্যমে হজ করাতে পারবেন যদি সামর্থ্য থাকে।
- নিজে হজে যাওয়ার চেষ্টা না করে বরং নায়েব পাঠানোই উত্তম।
- আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, সুস্থতা ও হজের সৌভাগ্য লাভের আশা রাখুন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান আপনার সৎ ইচ্ছার জন্য। আল্লাহ আপনাকে শীঘ্র সুস্থতা দান করুন এবং আপনার হজের নিয়ত কবুল করুন। আমিন।