অনিচ্ছাকৃতভাবে গানের সুর গুনগুন করলে কি গুনাহ হয়?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি পড়াশোনা করতেছিলাম। এমন সময় একটা গানের লাইন মনে পড়ে। মানে টোন টা মনে হয়। পরে আমি গুনগুন করি। আমি কোনো অর্থ বা শব্দ মুখ দিয়ে বের করি নাই। আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় নাই। আমি শুধু গুনগুন করতেছিলাম। হঠাৎ মনে হওয়ার পরেই অফ করে দেই গুনগুন। আমি গানের লাইন এর অর্থ বুঝি না। ছোট সময় থেকে কিছু মিউজিক শুনে আসতেছি, সেগুলাই গুন গুন চলে আসে। আমার কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তা নিয়ে আপনার মনে যে চিন্তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা একজন মুমিনের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতাই প্রকাশ করে। মহান আল্লাহ আমাদের আমল ও নিয়তের প্রতি সচেতন করে দিয়েছেন।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি পড়াশোনার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি গানের সুর মনে করে ফেলেন এবং শুধু গুনগুন (শব্দ ছাড়া সুর বের করা) করেন। আপনি সাথে সাথে তা বন্ধ করে দেন। আপনি গানের অর্থ জানেন না এবং কোনো শব্দও উচ্চারণ করেননি। এই অবস্থায় আপনার ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গান গাওয়া বা শোনার কোনো পাপে লিপ্ত হননি।
এ বিষয়ে ইসলামী বিধান এবং প্রাসঙ্গিক কিছু দিক তুলে ধরা হচ্ছে:
১. অনিচ্ছাকৃত বিষয় ক্ষমার যোগ্য
ইসলামে কোনো কাজের বিচার করা হয় ইচ্ছা, সংকল্প (নিয়্যত) ও ইচ্ছাকৃত কর্মের উপর ভিত্তি করে। যদি কোনো পাপ কাজটি অনিচ্ছাকৃতভাবে, ভুলে বা চাপের কারণে হয়ে যায়, তবে তা সাধারণত ক্ষমার যোগ্য।
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ কারও ওপর তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। সে যা উপার্জন করে (ভালো) তার জন্য, এবং যা সে অর্জন করে (মন্দ) তা তার বিরুদ্ধে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
- হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে তারা বাধ্য হয়, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫, সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭২১৯)
আপনার ঘটনা "বিস্মৃতি" বা "অনিচ্ছাকৃত স্মরণ" এর আওতায় পড়ে। আপনি ইচ্ছা করে গানের কথা বা সুর মনে করেননি; এটি আপনার স্মৃতিতে ছিল বলে অনিচ্ছাকৃতভাবে চলে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে আপনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। এটি আপনার ঈমানের দুর্বলতা নয়, বরং ভালো অবস্থানের পরিচয়।
২. শুধু গুনগুন করা (শব্দ উচ্চারণ না করা)
ইসলামী ফিকহের (হানাফী মাযহাবসহ) মূলনীতি হলো, মুখ দিয়ে শব্দ বা অর্থ বের না করে শুধু সুর বা নিঃশব্দে গুনগুন করাকে 'গান গাওয়া' বা 'গান শোনা'র বিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, যখন তা অনিচ্ছাকৃত হয় এবং উদ্দেশ্য গান শোনা বা গাওয়া না হয়।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতামত অনুযায়ী, নিছক সুর সঙ্গীতের অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য নয়। (আল-বিনায়া, ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
- তবে হ্যাঁ, যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো হারাম গানের সুর মুখে ধ্বনিত করা হয় এবং তাতে আনন্দ লাভ করা হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ইচ্ছা ও আনন্দ উভয়ই অনুপস্থিত।
৩. গানের অর্থ না জানা ও পুরনো অভ্যাস
আপনি গানের অর্থ জানেন না এবং এটি ছোটবেলার অভ্যাসবশত মনে এসেছে। এটি আপনার বর্তমান ঈমানী অবস্থার স্পষ্ট দুর্বলতা নয়, বরং অতীতের অভ্যাসের প্রভাব মাত্র। যে কোনো পাপ কাজের সঙ্গে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা ও সাধনা মানুষের মনে জাগে। আপনার এখানে ইচ্ছা ছিল না, বরং তা ছিল বিস্মৃতি ও অভ্যাসের কারণে।
- ফতোয়ায়ে রশীদিয়ায় এসেছে, "যদি কারো মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো গানের কলি বের হয়ে যায়, কিন্তু অন্তর তা অপছন্দ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে, তাহলে এর জন্য কোনো গুনাহ হবে না।" (ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪০)
৪. ঈমানের কোনো সমস্যা হবে কি?
না, এই অনিচ্ছাকৃত ঘটনার কারণে আপনার ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না। ঈমানের সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হারাম কাজ করে, তাকে হালাল জ্ঞান করে, বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করে। আপনার কাজটি ইচ্ছাকৃত পাপ নয়। এটি এমন একটি বিষয় যা আপনি নিজে পছন্দ করেননি এবং সঙ্গে সঙ্গে বর্জন করেছেন। এটি আপনার ঈমানের দুর্বলতা নয়, বরং আপনার ঈমানী সংবেদনশীলতারই প্রমাণ।
ইমাম শা'রানী (রহ.) বলেছেন: "মুমিনের জন্য অনিচ্ছাকৃত পাপ ক্ষমার যোগ্য, কারণ তার অন্তর তার রবের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত।" (আত-তাবাকাতুল কুবরা)
উপসংহার ও পরামর্শ
- আপনার ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না। আপনি যেহেতু ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করেননি এবং সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করে দিয়েছেন, তাই আলহামদুলিল্লাহ, আপনার ওপর কোনো পাপ হবে না।
- ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: মনে গানের সুর বা কথা চলে আসা স্বাভাবিক, তবে যখনই আসবে, তখনই দ্রুত তা কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া বা জিকিরে মনোনিবেশ করুন। আপনি যেহেতু পড়াশোনা করছিলেন, তাই পড়ায় ফিরে যান।
- তাওবা ও ইস্তেগফার: আপনি পাপ করেননি, তবে ভালো কাজ হলো, কোনো সন্দেহ হলে বা অন্তর শান্ত করার জন্য দুই রাকাত নফল সালাত পড়ে আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করুন। এটি আপনার ঈমানকে আরো সুদৃঢ় করবে।
- মিউজিক থেকে দূরে থাকুন: ছোটবেলা থেকে মিউজিক শোনাটা যদি অভ্যাস থাকে, তবে তা বর্জনের চেষ্টা করুন। কুরআন ও ইসলামী অনুষ্ঠান শোনার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে আপনার অন্তর পবিত্র হবে এবং অনিচ্ছাকৃত এসব চিন্তাও কমে যাবে।
সারকথা: আপনার এই অনিচ্ছাকৃত ঘটনা ঈমানের কোনো ক্ষতি করেনি। আপনি যখনই কোনো গান বা মিউজিকের সম্পর্কিত কিছু নিজেকে অনিচ্ছাকৃত করতে দেখবেন, তখনই সাথে সাথে 'আউযুবিল্লাহ' পড়ুন এবং পড়া বা জিকিরে মনোনিবেশ করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অনিচ্ছাকৃত পাপ থেকে হেফাজত করুন এবং নেক আমলের তাওফিক দিন। আমিন।
উল্লেখ্য: এই উত্তরটি কুরআন, সহীহ হাদীস এবং হানাফী ফিকহের গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ (যেমন: ফাতাওয়া হিন্দিয়া, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া রশীদিয়া, বাহেশতি জেওর) থেকে সংগৃহীত।