অমুসলিম নাপিতের দোকানে কি চুল কাটা জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
২।আমার দাড়ি একমুষ্টির বড় করে রাখি সুন্নাতি দাড়ি রাখি যদি কোনো মুসলিম বা অমুসলিম অমুসলিমদের দোকানে চুল দাড়ি কাটি বা সেভ করি তা নিচে পরবে পারা দিবে এমন পরিস্থিতিতে গোনাহ হবে কি ইমানে সমস্যা হবে কি?
৩।কোনো অমুসলিমদের দোকানে চুল কাটি সেখানে মূর্তি বা মূর্তির ছবি থাকে গোনাহ হবে বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
Answer
প্রশ্নোত্তর: দাড়ি, নাপিতের দোকান ও মূর্তি সংক্রান্ত বিধান
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো। প্রতিটি বিষয় হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. দাড়ি এক মুষ্টির কম রাখা এবং নাপিতের দোকানে চুল-দাড়ি কাটা
আপনার প্রথম প্রশ্ন:
“দাড়ি একমুষ্টির কম ছোট করে রাখি (সুন্নাতি দাড়ি রাখি না)। যদি কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দোকানে চুল-দাড়ি কাটি এবং তা নিচে পড়ে যায় বা কেউ নিয়ে যায়, তাহলে কি গোনাহ হবে? ইমানের সমস্যা হবে কি?”
উত্তর:
(ক) দাড়ি এক মুষ্টির কম রাখার বিধান:
হানাফি মতে, দাড়ি এক মুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব (প্রয়োজনীয়) এবং এর কম কাটা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) বা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “দাড়ি লম্বা করো এবং গোঁফ ছোট করো।” (বুখারি, মুসলিম) ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দাড়ি এক মুষ্টির বেশি ছোট করা জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৬১০; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৫২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩০০)
সুতরাং, আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দাড়ি এক মুষ্টির কম রাখেন, তাহলে এটি গোনাহের কাজ। তবে এটি কুফরি নয়, তাই ইমানের সমস্যা হবে না, তবে তাওবা করা আবশ্যক।
(খ) নাপিতের দোকানে চুল-দাড়ি কাটা এবং তা নিচে পড়লে:
- চুল বা দাড়ি কাটা নিজে জায়েজ (যদি দাড়ি সুন্নাতি পরিমাণ রাখা হয়)। তবে নাপিতের দোকানে চুল পড়লে বা কেউ তা নিয়ে গেলে সাধারণত গোনাহ হয় না। কারণ, চুল পবিত্র বস্তু (তাহির), এটি নাপাক নয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৪৫)
- তবে যদি নিশ্চিত জানা যায় যে, ওই চুল জাদু-টোনা বা অন্য কোনো হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে, তাহলে সেখানে চুল কাটা হারাম হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩১২)
- নাপিত মুসলিম বা অমুসলিম হওয়ার কারণে গোনাহ বাড়ে না, তবে অমুসলিম নাপিতের নিকট যাওয়া মাকরুহ হতে পারে যদি সেখানে শির্কি আমল বা অন্য কোনো হারাম কাজ করা হয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৬)
সারাংশ:
- দাড়ি এক মুষ্টির কম রাখা গোনাহ।
- নাপিতের দোকানে চুল পড়া বা কেউ নেওয়া সাধারণত গোনাহ নয়, তবে জাদুর সম্ভাবনা জানা থাকলে গোনাহ।
- ইমানের সমস্যা হবে না, তবে গোনাহের জন্য তাওবা করুন।
২. দাড়ি এক মুষ্টির বেশি (সুন্নাতি) রাখা এবং নাপিতের দোকানে চুল-দাড়ি কাটা
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন:
“দাড়ি একমুষ্টির বড় করে রাখি (সুন্নাতি দাড়ি রাখি)। যদি কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দোকানে চুল-দাড়ি কাটি এবং তা নিচে পড়ে যায় বা কেউ নিয়ে যায়, তাহলে কি গোনাহ হবে? ইমানের সমস্যা হবে কি?”
উত্তর:
(ক) সুন্নাতি দাড়ি রাখা:
দাড়ি এক মুষ্টি বা তার বেশি রাখা সুন্নাতে মুআক্কাদা (জোরালো সুন্নত)। এটি ফরজের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছে: “মুশরিকদের বিপরীত করো, দাড়ি লম্বা করো এবং গোঁফ ছোট করো।” (বুখারি)
আপনি যদি সুন্নাতি দাড়ি রাখেন, তাহলে এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং কুরআন-হাদিসের নির্দেশ পালন। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা আ’রাফ ৩১-এর তাফসির; বেহেশতি জেওর, ৩/১২)
(খ) নাপিতের দোকানে কাটা ও চুল পড়া:
- সুন্নাতি দাড়ি রেখে শুধু প্রান্তভাগ ছাঁটা জায়েজ। এক্ষেত্রে দাড়ি কাটার জন্য নাপিতের কাছে যাওয়া দোষণীয় নয়।
- চুল-দাড়ি নিচে পড়লে বা কেউ নিয়ে গেলে সাধারণত গোনাহ হয় না (যদি না জাদুর আশঙ্কা থাকে)।
- নাপিত মুসলিম বা অমুসলিম হওয়ায় এখানে কোনো গোনাহ নেই, তবে অমুসলিম নাপিতের কাছে যাওয়া অপ্রয়োজনে মাকরুহ হলে।
- ইমানের সমস্যা নেই; বরং সুন্নাত পালনের সওয়াব হবে।
সারাংশ:
- সুন্নাতি দাড়ি রাখা সওয়াব।
- নাপিতের দোকানে চুল কাটা ও পড়া সাধারণত গোনাহ নয়।
- ইমানের সমস্যা হবে না।
৩. অমুসলিম দোকানে মূর্তি বা মূর্তির ছবি থাকা অবস্থায় চুল কাটা
আপনার তৃতীয় প্রশ্ন:
“কোনো অমুসলিমের দোকানে চুল কাটি, সেখানে মূর্তি বা মূর্তির ছবি থাকে। তাহলে কি গোনাহ হবে? ইমানের সমস্যা হবে কি?”
উত্তর:
(ক) মূর্তি বা ছবি থাকা স্থানে যাওয়ার বিধান:
- ইসলামে মূর্তি (আইডল) বা প্রতিমা স্থাপন ও পূজা করা হারাম। এমন স্থানে প্রবেশ করাও হারাম যদি সেখানে প্রকাশ্যে শির্ক বা মূর্তিপূজা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা মূর্তি থেকে দূরে থাকো এবং মিথ্যা কথা পরিত্যাগ করো।” (সূরা হজ, ৩০)
- তবে শুধু ছবি (যেমন প্রাণীর ছবি) ঝুলানো থাকলে তা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হয়। হাদিসে এসেছে: “যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” (বুখারি, মুসলিম)
- যদি দোকানে মূর্তি পূজার জন্য স্থাপিত থাকে, তাহলে সেখানে চুল কাটা হারাম এবং গোনাহ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৩৪)
(খ) ইমানের সমস্যা:
- মূর্তির স্থানে গিয়ে চুল কাটা নিজে কুফর নয়, তবে এটি এমন কাজ যা শির্কের প্রতি উদাসীনতা সৃষ্টি করতে পারে।
- ইমান নষ্ট হবে না, তবে গোনাহ হবে এবং এ কাজ ইমানকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে যদি সেখানে মূর্তির সম্মান করা হয় বা তাদের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া হয়, তাহলে ইমানের ক্ষতি হতে পারে।
- তাই বিজ্ঞ আলেমরা বলেন: যেখানে শির্কের চিহ্ন আছে, সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৩০; উসুলুশ শাশী, অধ্যায়: মাকরুহাত)
সারাংশ:
- মূর্তি বা পূজার ছবি থাকা দোকানে চুল কাটা গোনাহ।
- এতে ইমান নষ্ট হবে না, তবে এটি ইমানের জন্য ক্ষতিকর।
- তাই মুসলিম নাপিতের দোকান বা নির্দোষ ছবিহীন দোকান নির্বাচন করা উত্তম।
পরিশেষে উপদেশ:
১. দাড়ি এক মুষ্টির কম না কেটে সুন্নাতি পরিমাণ (অন্তত এক মুষ্টি) রাখার চেষ্টা করুন।
২. নাপিতের দোকানে চুল কাটার সময় চুলের অপব্যবহার (যেমন জাদু) সম্পর্কে নিশ্চিত হলে সেখানে কাটবেন না। অন্যথায় সাধারণভাবে চুল কাটা জায়েজ।
৩. মূর্তি বা শির্কি অশ্লীল ছবি আছে এমন স্থান থেকে দূরে থাকুন। মুসলিম নাপিতের দোকান বেছে নিন।
৪. ইমানের কোনো সমস্যা এই কাজগুলোর কারণে হয় না, তবে গোনাহের কারণে আখিরাতে শাস্তি হতে পারে। তাই তাওবা ও ইসলাহ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাতের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ:
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৫২, ২/২৩৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩০০, ৪/৩১২, ৫/২৩০)
- রদ্দুল মুহতার (১/৬১০, ১/৩৪৫, ৬/৩৯৪)
- বেহেশতি জেওর (৩/১২)
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা আ’রাফ ৩১)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৫৬)
- উসুলুশ শাশী (অধ্যায়: মাকরুহাত)
- আল-হিদায়া
- শারহু মাআনিল আসার
আল্লাহ তাওফিকদাত।